বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৮ February ২০২২

প্রয়োজন মেটাতে চুরি ছিনতাইয়ে টিকটকাররা


গত ১৫ জানুয়ারি রাত সোয়া ৩টার দিকে রাজধানীর বনানীর এইচ-ব্লক ৭ নম্বর রোডের ‘শিখবে সবাই সলিউশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওই প্রতিষ্ঠানের গ্রিল কেটে ৩ জন ভেতরে প্রবেশ করেন। আর একজন ছিলেন অফিসের বাইরের রাস্তায়। অফিসের বিভিন্ন রুম ঘুরে ল্যাপটপ এবং নগদ অর্থ চুরি করেন তারা। পরে ৩টা ৩৬ মিনিটে এ মালামাল নিয়ে বের হয়ে যায় এই চোর চক্র। এর মধ্যে একজনকে দেখা যায়, খুশিতে নাচতে নাচতে বের হয়ে যাচ্ছেন। এই ভিডিও দেখে ওই চার কিশোর-তরুণকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা সবাই টিকটক করে। টিকটকের সাজ-পোশাক ভ্রমণে যেতে টাকার প্রয়োজন হয়। আর এ প্রয়োজন মেটাতেই তারা চুরি ছিনতাই করে থাকে।

শুধু বনানীর এই ঘটনায় নয়, রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সক্রিয় টিকটকার কিশোর গ্যাং ‘গাঙচিল’। টিকটকাররা চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িত তারা। সম্প্রতি এ টিকটকার গ্যাংয়ের ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয় দেশি-বিদেশি অস্ত্র, গুলি ও মাদক। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় চুরি ছিনতাইয়ে জড়িতদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করবে ডিবি ও র্যাব। টিকটকের এই গ্রুপটা প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে ভিডিও তৈরি করে। নাচে-গানে নিজেদের কর্তৃত্ব জাহির করে। এভাবেই টিকটক ভিডিওর মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা চালায় তারা।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান জানান, বনানীর ঘটনায় আটক কিশোর- তরুণরা অনেকদিন ধরেই চুরি, ছিনতাই এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এই কাজগুলো করে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (লাইকি ও টিকটক) নাটক-সিনেমা বানিয়ে থাকেন। এখানে যে টাকা প্রয়োজন তা মেটানোর জন্যই বিভিন্ন অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রিল ভেঙে মূল্যবান সামগ্রী (মোবাইল, লেপটপ, কম্পিউটার, টাকা) নিয়ে যায় এবং সেগুলো খুবই অল্প দামে বিক্রি করে দেয় তারা।

তিনি বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় লাইকি- টিকটকের মোহে পড়ে কিছু কিশোর তরুণ নানা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এসব করতেও টাকার প্রয়োজন। অনেকের পরিবার এসবের জন্য টাকা পয়সা দেয় না। তখন তারা এ অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। চুরি, ছিনতাই এমনকি ডাকাতিতেও জড়িয়ে পড়ছে।

গ্রেপ্তাররা পুলিশকে জানিয়েছে, চুরি যাওয়া অফিসের পাশেই ছিল শহীদের দোকান। সেখান থেকেই চুরির পরিকল্পনা করেন তারা। পুলিশ বলেছে, যেসব বাসাবাড়ি কিংবা অফিসে নিরাপত্তা ঘাটতি আছে, সেগুলোকে অপরাধীরা বেছে নিচ্ছেন চুরি কিংবা ডাকাতির জন্য।

সূত্র জানায়, যেসব জায়গায় মূলবান জিনিস থাকে কিন্তু রাতে কোনো গার্ড থাকে না; সেসব জায়গায় সিসিটিভির পাশাপাশি নিজেদের নজরদারি থাকা উচিত।

গোয়েন্দা পুলিশের সূত্র জানায়, রাজধানীর হাতিরঝিল সংলগ্ন সকল এলাকা, মিরপুর, উত্তরা, পুরান ঢাকা, শেরে বাংলানগর, ডেমরাসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত অর্ধশত গ্রুপ গড়ে উঠেছে। টিকটক লাইকিতে স্টার হওয়ার আশায় এক শ্রেণির কিশোর-তরুণরা চুরি ছিনতাই করা টাকাতে দামি মোবাইল ও পোশাক কেনে। এছাড়াও বিভিন্ন পার্টির আয়োজন করে সেখানে খরচ করে।

সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃতদের নিকট থেকে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। এরা শুধু যে বনানী কেন্দ্রিক ছিল তা না। এদের সঙ্গে অনেক গ্রুপের যোগাযোগ ছিল। সে বিষয়েও গোয়েন্দা পুলিশের কাছে তথ্য দিয়েছে। তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য যাছাই-বাছাই করা হচ্ছে। 

সূত্র জানায়, শিগগিরই এ বিষয়ে অভিযানে নামবে গোয়েন্দা পুলিশ। ইতোমধ্যে তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে।

র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম পরিচালক খন্দকার আল মঈন জানান, মোহাম্মদপুরের গ্রুপটি গাংচিল গ্রুপ নামে পরিচিত ছিল। এই গ্রুপের সদস্যরা টিকটক লাইকিতে আসক্ত। এরা নিজেদের জাহির করতে অস্ত্র উঁচিয়েও টিকটক ভিডিও বানাতো। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।

তিনি বলেন, গ্রুপের নেতা কবির। বরগুনা থেকে ঢাকায় এসে রাজমিস্ত্রি ও ড্রাইভার হিসেবে কাজ করার পর ২০১০ এ গাঙচিল বাহিনীতে যোগ দেয় কবির। তুরাগ ও বুড়িগঙ্গায় জলদস্যুতা করায় তিনি পরিচিত হন জলদস্যু কবির নামে। ২০১৬ সালে কবির গঠন করে গাঙচিল বাহিনী। হত্যা ও ধর্ষণসহ একাধিক মামলা রয়েছে কবিরের বিরুদ্ধে। আত্মগোপনে থাকা কবিরের বাকি সহযোগীদের ধরতে তৎপরতা চলছে বলেও জানান র্যাবের এ কর্মকর্তা।

র্যাবের একটি সূত্র জানায়, রাজধানী কেন্দ্রিক এ ধরনের গ্রুপের বিরুদ্ধে তারাও অভিযানে নামছে। এ ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে। জোরদার অভিযান চালানো হবে।

দেশে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী এখনো লাইকি ও টিকটকে আসক্ত। নানা ধরনের যৌন উত্তেজক কথা বলে অনেকে টিকটক বানায়। আবার অনেকে বাংলা-হিন্দি গানের সঙ্গে নাচ করে টিকটক, লাইকি বানায়। আবার অনেকে লাইকিতে লাইভে আসে। আর লাইভে কেউ ভালো কথা বলে, কেউ যৌনতা নিয়ে কথা বলে। অনেক সময় তরুণীদের পোশাকও নগ্নতায় ভরা থাকে। তাদের নিকট এটি একটি রঙিন দুনিয়া। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও লাখ লাখ ভিউ হয়ে যায়। এতে করে তারা নিজেদের স্টার মনে করে। আর স্টার হওয়ার নেশায় নিজের অজান্তেই সুযোগ-সন্ধানীদের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলে। অনেকে এটিকে কাজে লাগিয়ে ফাঁদ পাতে। আর এ পাতা ফাঁদে পা দিয়েই নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনছে। পার্টির আড়ালেও টিকটকারদের বিরুদ্ধে তরুণীদের দিয়ে দেহ ব্যবসা করানোরও অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, টিকটকের কথিত মডেল দেওয়ান রসুল হূদয়কে চার ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে সম্প্রতি রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, সে বিভিন্ন ভিডিও তৈরি করে তা টিকটক ও লাইকিতে আপলোড করত। সেখানে অভিনয়ের ফাঁদে ফেলে একে একে চারছাত্রীকে নিজের বাসায় আটকে রেখে ধর্ষণ করে। পাশবিকতার শিকার তিনজন কলেজ এবং একজন স্কুলের ছাত্রী। তাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। তারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় থাকে। পুলিশ জানায়, হূদয় নিজের বন্ধুদের নিয়ে গাজীপুরের একটি রিসোর্টে পার্টির আয়োজন করে। সেখানে পরিচয়ের সূত্রে দুই কলেজ শিক্ষার্থী মডেল হওয়ার আগ্রহ দেখায়। এর দুদিন পর হূদয়ের এক বান্ধবীর মাধ্যমে তারা কুড়িলে হূদয়ের বাসায় আসে। টিকটকের শুটিং শুরু হওয়ার কথা বলে তাদের ওই বাসার নিচতলার একটি কক্ষে থাকতে দেওয়া হয়। এরপর ওই ছাত্রীদের ওপর পাশবিকতা চালায় সে।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১