বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১০ October ২০২১

কোভিড ১৯ : প্রেক্ষিত মানবিক সম্পর্ক


করোনাভাইরাসের যে তাণ্ডব সেটা আসলে একটি বিশ্বযুদ্ধের মতোই ভয়াবহ। মানুষ মারা যাচ্ছে হাজারে হাজারে নয়, লক্ষে লক্ষে। কেবল মানুষ নয়, মানবিক সম্পর্কগুলোও আক্রান্ত হয়েছে, ভেঙেও যাচ্ছে এবং গেছে। মহামারিতে মানুষ মরে ঠিকই; কিন্তু তবু মনুষ্যত্ব সাধারণত টিকে থাকে, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা বরং বৃদ্ধিই পায়। কিন্তু এবারকার এই মহামারি শুধু মানুষের ওপর নয়, মানুষের মনুষ্যত্বের ওপরেও প্রচণ্ড আঘাত হেনেছে। সে ক্ষতি পূরণ করা কঠিন হবে নিশ্চয়ই।

মহামারি এলো, এসে রাষ্ট্রীয় সীমান্তগুলোকে হাস্যকর করে ছাড়ল, হানা দিল সবখানে; কিন্তু কাজটা করল সে মানুষের সাহায্যেই। মানুষই তার বাহন। করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শুরু হয়েছে। প্রতিরোধের বেলাতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে টিকা। টিকা আবিষ্কার হবে, হাতে আসবে, এলে করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে; আশা ছিল এমনটাই। টিকার জন্য তাই অপেক্ষাটা ছিল সর্বজনীন। তা টিকা এসেছে। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এমনই দুর্দান্ত ও দক্ষ যে সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদের নতুন একটি রূপ এসে গেছে; নাম নিয়েছে টিকা জাতীয়তাবাদ। হ্যাঁ, টিকা যেসব দেশে আবিষ্কৃত হয়েছে তারা আগে তাদের মানুষকে টিকা দেবে, তারপরে পাঠাবে অন্যত্র, নিজে বেঁচে তবে না দাতব্য—এই নীতি অগ্রাহ্য নয়। কিন্তু যা ঘটল তাহলো প্রয়োজনের বেশি মজুত করে রাখা এবং পরে রপ্তানি করে মুনাফা আদায়। টিকা উৎপাদন করছে বিশাল বিশাল মাপের সব কোম্পানি এবং তারা ইচ্ছামতো দাম ঠিক করে মুনাফা কামিয়ে নিচ্ছে। তাদের জন্য জোয়ার এসেছে ব্যবসা-উন্নয়নের। মানবতাবাদীরা অবশ্যই বসে নেই, তারা দাবি করছেন টিকার উৎপাদন ফর্মুলা উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক, উৎপাদন চলুক অবাধে এবং বিশ্বব্যাপী, মানুষ বাঁচুক করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে। না, সেটা হবে না। উৎপাদকরা রাজি নয়। তারা অত কষ্টে ফর্মুলা আবিষ্কার করেছে, বিনিয়োগ করেছে, এখন তাদের মুনাফা লাভের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়াটা অমার্জনীয় নৈতিক অপরাধ হবে, তারা বলতে চাইছে এমনটাই।

তাদের পক্ষে বলবার জন্য জ্ঞানী ও বিজ্ঞ লোক যে পাওয়া যাচ্ছে না এমনও নয়। যেমন বিল গেটস। তিনি একজন জ্ঞানী ব্যক্তি। সফটওয়্যারের উচ্চ বিকাশে ও মিনি-কম্পিউটারের জগতে বিশ্ববিপ্লব সম্ভবকরণে তার অবদান অস্বীকার করবে কে? কিন্তু তিনি যে আবার বিশ্বের শীর্ষ ধনীদেরও একজন সেটাও তো মিথ্যা নয়। একটানা তেরো বছর নাকি শীর্ষস্থানেই ছিলেন। ধনী হওয়ার দরুনই হয়তো তিনি বলেছেন টিকার ফর্মুলা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দিয়ে দেওয়াটা ঠিক হবে না। তেমন কোনো যুক্তি দিয়েছেন বলে প্রকাশ পায়নি। কিন্তু মোক্ষম যুক্তি তো আছে। ধনী দেশগুলো টাকা খরচ করে টিকা আবিষ্কার করেছে, সেই জ্ঞান তারা গরিব দেশকে কেন দেবে? তারা নিক, কিনে নিক, যদি পারে। অথচ বিল গেটস নিজে বদান্যতার জন্য বিশ্বনন্দিত। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, স্বাস্থ্য, নর-নারীর সমতা, শিক্ষা ইত্যাদি বহু ক্ষেত্রে উন্নয়নে সাহায্য করবার লক্ষ্যে তিনি যে পারিবারিক ফাউন্ডেশনটি গঠন করেছিলেন যেটি আমেরিকাতে সর্ববৃহৎ এবং সারা বিশ্বের বৃহৎগুলোর শীর্ষস্থানীয়। কিন্তু ওই যে মৌলিক সত্য, একচেটিয়া ব্যবসা করে মুনাফা বাড়ানো; যেটি ঘটার কারণেই তার বদান্যতা সম্ভব হয়েছে, সে সত্যের তো বিনাশ নেই; সেজন্যই গরিব দেশের ওষুধ কোম্পানি করোনার টিকা প্রস্তুত করুক, করে ধনী দেশের ধনীদের মুনাফা লাভে বিঘ্ন সৃষ্ট করুক, এই নীতির তিনি বিপক্ষে। রক্তের বন্ধন পানির বন্ধনের চেয়ে শক্তিশালী বটে। ধনীরা রক্তের বন্ধনেই আবদ্ধ। ওই বন্ধনের কারণেই মহাবিপর্যয়ের সময়েও ধনীরা আরো ধনী হওয়ার কাজটি মিলেমিশে অব্যাহত রাখতে পেরেছে। মানুষ মরছে; কিন্তু ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির বিরাম নেই। আর যে ব্যবস্থায় এই বৃদ্ধিটা স্বাভাবিক থাকে সেটিকে টিকিয়ে রাখতে তারা সচেষ্ট থাকবে বইকি। থাকছেও।

কেবল যে টিকা উৎপাদনকারীরা তা তো নয়, চিকিৎসা ব্যবসায়ীরাও ফুলেফেঁপে উঠছে। বাদবাকিদের সর্বনাশে তাদের পৌষ মাস। মারণাস্ত্র উৎপাদনও থেমে নেই। সমানে চলছে। মানবিক হতো যদি তা কমত। কমেনি, উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের এই মহাবিপদের সময়ে বিশ্বে মারণাস্ত্র উৎপাদন গত বছরের তুলনায় এ বছর দুই দশমিক ত্রিশ শতাংশ পরিমাণ বেড়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি মারণাস্ত্র উৎপাদন করেছে চীন, তার পরেই আমেরিকা। চীন কেবল যে করোনাভাইরাস উৎপাদনে আগ্রহী তা-ই নয়, মারণাস্ত্র উৎপাদনেও অসামান্য সামর্থ্য প্রদর্শন করে চলেছে। নব্য পুঁজিবাদীর নবীন উৎসাহ। কিন্তু কাকে মারবার জন্য এই আয়োজন? মানুষকে মারার জন্যই তো। বলা হয়ে থাকে, ধনী দেশগুলো অস্ত্র উৎপাদনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে তার অর্ধেকও যদি তারা শিশুদের জন্য ব্যয় করত তাহলে পৃথিবীর কোনো শিশু অভুক্ত থাকত না। কিন্তু সেটা তো হওয়ার নয়। হবেও না। বিদ্যমান ব্যবস্থাই তা হতে দেবে না। এই ব্যবস্থা কেবল মানুষের নয়, মনুষ্যত্বেরও শত্রু।

মারণাস্ত্রের উৎপাদন বৃদ্ধি জানাচ্ছে এ কথা যে হিংস্রতা বাড়ছেই, কমছে না। বর্ণবাদী ট্রাম্পের সমর্থন নিয়ে ইসরাইল জেরুজালেমকে নিজেদের রাজধানী বলে ঘোষণা করেছিল, এখন সেখানে চলছে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ভেঙে দখলদারিত্ব। জোরটা অন্য কিছুর নয়, অস্ত্রের। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপরে। বাইডেন প্রশাসন যে ইসরাইলকে থামাবে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দুর্নীতির জন্য বিশেষভাবে বিখ্যাত ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আমাদের কাজ আমরা করব, অন্যের কী বলার আছে।’ বর্তমান বিশ্বে ইসরাইলই পরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠিত একমাত্র ধর্মভিত্তিক জাতি-রাষ্ট্র, সেজন্যই বুঝি ভারতে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অভিলাষী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ইসরাইলের শাসকদের হরিহর আত্মিক সম্পর্ক, যেন মাসতুতো ভাই। ভারতে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে কুম্ভ মেলা হয়, তাতে পদদলিত হয়ে অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটে থাকে। এ বছর, এই মহামারির মধ্যেও, কুম্ভ মেলা ঠিকই হয়েছে। তাতে ২৬ লক্ষ মানুষ যোগও দিয়েছে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা গঙ্গায় নেমে একসঙ্গে স্নান করেছে, তাতে করোনার বিস্তার কতটা ঘটেছে তার হিসাব পাওয়া যায়নি বটে তবে ভারতে করোনার সর্বগ্রাসী বিস্তারে ওই গাদাগাদি ঘেঁষাঘেঁষি একসঙ্গে স্নান যে সহায়ক হয়েছে সেটা তো নিশ্চিত। ইসরাইলেও এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ভিড়ের চাপে পদদলিত হয়ে ৪৪ জন প্রাণত্যাগ করেছে। ফিলিস্তিনিদের ক্ষমতা ছিল না এমন একটা ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করে।

বোঝাই যাচ্ছে করোনাকে জব্দ করা গেলেও হিংস্রতাকে কাবু করা যাবে না। সেটা কেবল ঘরের বাইরে নয়, ঘরের ভেতরও ঢুকবে এবং মানবিক সম্পর্কগুলোকে ভেঙেচুরে ফেলবে। নিয়ন্ত্রক ব্যক্তি নয়, নিয়ন্ত্রক হচ্ছে পুঁজিবাদী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা, যে ব্যবস্থা ওপরে সভ্যভব্য কিন্তুও ভেতরে বন্য; যার নীতি হচ্ছে সে-ই টিকবে যার ক্ষমতা আছে টিকবার। সুতরাং লড়াইটা কেবল উপসর্গকেন্দ্রিক হলে চলবে না, হতে হবে ব্যাধিকেন্দ্রিক। আর এই লড়াই কোনো একটি দেশের নয়, সারা বিশ্বের। মানুষের সভ্যতা এখন এক ক্রান্তিকালে এসে পৌঁছেছে; কোনদিকে সে মোড় নেবে সেটা নির্ভর করছে মানুষের কর্তব্য পালনের ওপরই। যুগে যুগে তাকে জাগিয়ে তুলেছে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভখ্যাত সংবাদপত্রগুলো। বাংলাদেশের খবর-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এ বিষয়টি তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।

 

 

ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১