বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১৭ August ২০২১

ওরা রক্তের ফেরিওয়ালা: রক্ত দিয়ে জীবন বাঁচায় 'আত্মীয়'


রক্ত ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। অধিকাংশ মানুষ অসুস্থ রোগীর প্রাণ বাঁচাতে রক্তের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ছুটে বেড়ায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, মোবাইলফোনসহ বিভিন্নভাবে রক্তের প্রয়োজনের খবর পাওয়া মাত্রই এক ঝাক তরুণ,তরুনী, জীবন বাঁচাতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে রক্ত দিতে ছুটে চলেন তারা। ওরা হলেন রক্তের ফেরিওয়ালা। মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়িয়ে রক্ত দিয়ে মুখে হাঁসি ফুটিয়ে তোলা যেন তাদের নেশা।

এভাবেই হাঁসিমুখে নিজের রক্ত দিয়ে অসুস্থ মানুষের জীবন বাঁচানো চেষ্টা করছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় আত্মীয় নামক একটি স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন। দেখতে দেখতে ৩ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। চতুর্থ বছরে পা রেখেছে।

২০১৮ সালের ১৭ আগস্ট পৌর শহরে আত্মীয় নামক সেচ্ছা সেবক সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বরাবরের মতো এবারও দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে মঙ্গলবার থেকে ৪ দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের ব্যতিক্রম উদ্যোগ নিয়েছে এই সংগঠনটি। এর মধ্যে রয়েছে বিনামূল্যে বৃক্ষরোপন, স্বাস্থ্যসেবা, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, অসহায় লোকজনের মাঝে খাবার বিতরণ, চিকিৎসক এবং ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধিদের মাঝে মিষ্টি বিতরণসহ নানা কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়।
এই সংগঠনের সদস্যরা প্রতিনিয়ত সমাজের আশার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কারোর রক্তের প্রয়োজন , রক্ত ছাড়া চিকিৎসা বা অপারেশন চলছে না সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক কিংবা মোবাইল ফোনে রক্তের প্রয়োজন এমন খবর পাওয়া মাত্র জীবন বাঁচাতে ছুটে চলেন সংগঠনের সদস্যরা।

আত্মীয়’এর থেকে পাওয়া তথ্য মতে জানা গেছে, গত তিন বছরে এই সংগঠনের সদস্যদের রক্ত পেয়েছেন গর্ভবতী মা,ক্যান্সার আক্রান্তরোগী, দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন রোগী। এ পযর্ন্ত মোট ৫০০ জনের উপর রোগীকে ৬২৮ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়।

সংগঠনটির মোট নিবন্ধিত রক্তদাতা সদস্য রয়েছে ১৩ শতাধিকের উপর। তাছাড়া এর বাইরেও আত্মীয়ের আহবানে সাড়া দিয়ে অনেকেই রক্ত দিয়ে থাকেন। এ সংগঠনের ফেসবুক পেজ অনুসরণ ৮ হাজারের বেশি মানুষ । দিন দিন বাড়ছে সদস্য সংখ্যা। মূলত এক ঝাঁক তরুণ-তরুণীর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে সংগঠনটি।

সংগঠনটির প্রধান সমন্বয়ক হচ্ছেন ব্যাংকে কর্মরত সমীর চক্রবর্তী। এছাড়া শাহবুদ্দিন বেগ শাপলু, শেষ দীপু, সুজন সাহা, এম আর আই রাকিব, রাকিবা হাবিব, হৃদয় দেব, যুবায়েদ, সুদীপ্ত সাহা, কিবরিয়া, মমতা ঘোষ মণিসহ ২০-২৫ জন সদস্য সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তারা ঘুরে ঘুরে খোঁজ নিয়ে এ কাজ করে আসছেন।

তাছাড়া এই সংগঠনের মাধ্যমে স্থানীয় শত শত তরুণ তরুণী, স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে অসুস্থ রোগীকে রক্ত দিতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

সংগঠনের সার্বিক ভাবে কার্যক্রমে সক্রিয় হয়ে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ময়মনসিংহ বিভাগের পরিচালক ডা: মো. শাহআলম, চিকিৎসক ও শিল্পী ডা: গুলজার হোসেন উজ্জল। তাছাড়া দুটি স্কাউট গ্রুপ ও ছাত্র সংগঠনের বড় একটি অংশ ও সক্রিয় ভাবে জড়িত হয়ে রক্ত দিয়ে যাচ্ছে।


তাছাড়া এই সংগঠনটি শুধু রক্তদানেই সিমাবদ্ধ নয়। সামাজিক সাংস্কৃতি অনুষ্ঠান, জাতীয় বিভিন্ন দিবস পালন, বিশেষ দিনে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খাবার বিতরণ, ফ্রি রক্তের গ্রুপ নির্নয় করা ,ইফতার সামগ্রী বিতরণ, পোশাক বিতরণ, মাসিক পাঠ চক্রের আসরসহ নানামুখি কাজে নিয়মিত অংশ গ্রহন করছেন।


বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও অনলাইনের মাধ্যমে মূলত তাদের কার্যক্রমের প্রচারনা চলছে। ইতিমধ্যে বিশাল নের্টওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন এই সংগঠনটি। সংগঠনটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাসহ বিভিন্ন স্থানে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে।


জেলার কোন হাসপাতালে রোগী রক্তের কোন সমস্যায় পড়লে খবর পাওয়া মাত্র সংগঠনের সদস্যরা ছুটে গিয়ে জীবন বাঁচানে রক্ত দিয়ে আসছেন।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সমন্বয়ক সমীর চত্রবর্তী বলেন, ‘সকল শ্রেণি পেশার মানুষের সমন্বয়ে আত্মীয় এখন অনেক সমৃদ্ধ একটি সংগঠন। রক্তের প্রয়োজনে মানুষের পাশে থাকার ব্রত নিয়ে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছি। সেটা অনেকটাই সম্ভব হয়েছে এলাকার মানুষের ব্যাপক সাড়ায়।’

সংগঠনের সদস্য রাকিবুল ইসলাম বলেন, এ পযর্ন্ত ৩ বার রক্ত দেওয়া হয়। শরীরে কোন অসুবিধে হয়নি। রক্ত দিতে পেরে খুবই ভাল লেগেছে।
তারাগন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মৌসুমী আক্তার বলেন, ছোট বোন সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলে অনেক রক্তের প্রয়োজন হয়। চেষ্টা করে কোথাও রক্তের সন্ধান করতে না পারায় কোন উপায় না পেয়ে ফোনের মাধ্যমে এই সংগঠনের লোকদের সাথে যোগাযোগ করা মাত্র ৩ ঘন্টার মধ্যে রক্ত পেয়েছি। এই বিপদে যারা এসে রক্ত দিতে এগিয়ে এসেছে তারাই হচ্ছে পরম বন্ধু আপনজন। তারা যে উপকার করেছে তা কখনও ভূলার নয়।

আত্মীয়’এর সদস্য শিক্ষক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন অনেক আগে থেকেই ইচ্ছা ছিল অসুস্থ্য লোকজনকে রক্তদিতে। কোথাই দেব কিভাবে দেব সঠিক কোনো পথ খোঁজে পাচ্ছিলাম না। ‘আত্মীয়’এর মাধ্যমে সেইপথ খোঁজে পাওয়া। এরপর শুরু করি রক্ত দেয়া। এ পযর্ন্ত ৩০ বার রক্ত দিয়েছেন বলে জানায়। প্রতিবারই দেখেছি রক্তগ্রহীতাদের সেকি আবেগ এইটুকু রক্তের জন্য। আত্মীয় মানুষের প্রাণ বাঁচাতে যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে সেটা দেখে সত্যিকার অর্থেই মন জুড়ায়, মুগ্ধ হতে হয়।

বাবুল মিয়া বলেন, তার বড় ভাই’এর স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে রক্তের প্রয়োজন দেখা দেয়। অনেক চেষ্টা করে রক্তের সন্ধ্যান না পেয়ে মোবাইল ফোনে এই সংগঠনের লোকদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা রক্ত দিয়ে আমার স্ত্রীর জীবন বাঁচান। আমরা তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।

আখাউড়া পৌরসভার মেয়র মো. তাকজিল খলিফা কাজল বলেন, ‘আত্মীয় সত্যিকার অর্থেই স্বার্থহীনভাবে মানুষের জীবন বাঁচাতে কাজ করছে। একদল তরুণ যে কাজটি করে যাচ্ছে তা সত্যিই অনেক গর্ব করার মতো। আত্মীয়ের আহবানে সাড়া দিয়ে আমিও ছুটে গেছি রক্ত দিতে, যা আমার কাছে অনেক সৌভাগ্যের মনে হয়েছে।

আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মো. রাশেদুর রহমান বলেন, একজন সুস্থ ও সবল মানুষ ৩ মাস অন্তর অন্তর রক্ত দিতে পারেন। এতে শরীরের কোন সমস্যা হয়না। আত্মীয় নামে সংগঠন রক্তদিয়ে যে কাজটি করছেন সত্যি তা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।

 


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১