বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৮ August ২০২১

পানের স্বীকৃতি চায় খাসিয়ারা


বাংলাদেশের পাহাড়ী এলাকায় বসবাসকারী খাসিয়া ও গারো জনগোষ্ঠির। খাসিয়া ও গারো জাতি গোষ্ঠির জীবন জীবিকার অবলম্বন জুম চাষ। যার মধ্যে অন্যতম পান চাষ। বেশির ভাগ খাসিয়া ও গারো জাতি গোষ্ঠি তাদের জীবিকা নির্বাহ করে এই পান থেকে। নিজেদের আদিবাসী দাবি করা এ জাতি গোষ্ঠি এখনও পায়নি রাষ্ট্রীয় স্বাকৃতি। মৌলভীবাজার কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন পানপুঞ্জিতে পানের চাষাবাদ হয়ে থাকে ব্যাপক ভাবে। যার ফলে পানকে কৃষি পণ্য হিসেবে স্বীকৃতিসহ রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধার দাবী খাসিয়া ও গারোজাতি গোষ্ঠির।

খাসি পান চাষে যেমন বৈচিত্রতা রয়েছে তেমনই সিলেটসহ সিলেটি অধ্যুষিত বহির্বিশ্বে এর চাহিদাও রয়েছে তুঙ্গে। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় পান পুঞ্জি বেশি থাকায় লংলা পরগনায় গড়ে উঠেছে সর্ববৃহৎ রবিরবাজার পানের আড়ৎ। সেখান থেকে পান দেশ বিভিন্ন অঞ্চলসহ বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এর ফলে দেশের জাতীয় অর্থনীতিতেও এ পান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

খাসিয়া পানপুঞ্জি সূত্রে জানা গেছে, কুলাউড়ার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ছোটবড় ৪৫টি পানপুঞ্জি রয়েছে। বিশেষ করে উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের প্রায় ২৩টি পানপুঞ্জিতে পানের চাষাবাদ সবচেয়ে বেশি হয়।

পুরাতন গাছ থেকে কাটিং করে পানের চারা রোপণ করা হয়। চারা রোপণের এক বছরের পর গাছ থেকে পান উৎপাদন শুরু হয়ে ৩ বছর পর্যন্ত এই গাছ থেকে পান সংগ্রহ করা হয়। পানগুলো পাহাড়ের সারি সারি টিলায় সুপারি গাছ ও অন্যান্য গাছে চাষাবাদ হয়।

জুখাসিয়া পুরুষরা লু-উ নামে (মই) এক ধরনের বাঁশের মই দিয়ে পান তুলে থাকে। পান তোলার সময় এরা সঙ্গে পান সগ্রহ করার জন্য ঝুঁড়ি রাখে। এই পান তুলে রাখা হয় ঝুঁড়িতে। পরে পান সংগ্রহ করে জুম থেকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসেন খাসিয়া পুরুষরা। আর খাসিয়া নারীরা ঘরে বসে পান গুছিয়ে তা বিক্রি করে। প্রথা অনুয়ায়ী সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত পানের ‘লংখং’ বা গাছের সম্পূর্ণ পান তোলা হয়ে থাকে। মার্চ-এপ্রিল এই দুই মাস গাছে পান তেমনটা থাকে না। কিন্তুু এবার আগাম বৃষ্টি হওয়ায় পানের বাম্পার ফলন হয়েছে।

খাসিয়া সমাজে মেয়েদের প্রাধান্য বেশি। মেয়েরা ধনসম্পদের উত্তরাধিকারী। খাসিয়া আদিবাসীরা মাতৃতান্ত্রিক পরিবার। বংশ পরিচয় দেয়া হয় মায়ের বংশানুক্রমে। তাই পরিবারে নারীদের অধিকারই বেশি। পুঞ্জিতে অনেক পরিবারের ৪-৫টি পানের জুম থাকে এবং নূন্যতম একটি পরিবারে ১-২টি পানের জুম থাকে।

পান চাষ করতে গিয়ে পানের বিভিন্ন রোগ ধরা পড়ে। উথ্রাম (পান পঁচা) একটি রোগ মারাত্মক ভাবে পানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এছাড়া পান গাছের লতা পঁচা ক্লাম নামে একটি বিষাক্ত রোগ রয়েছে। সঠিক সময়ে বৃষ্টি না হলে পানের যত্ন না নিলে জুন মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাসে পানগুলো লালচে হয়ে যায়। তখন তারা নিজেদের মত পানের গোড়ায় চুন দিয়ে থাকে। খাসিয়ারা জানায়, তারা নিজেরা আদি ফর্মূলায় পান চাষ করে থাকে। কৃষি বিভাগের কোন সহযোগিতা ছাড়াই তারা এ চাষাবাদ করে আসছে। পানকে কৃষি পন্য হিসেবে স্বীকৃতির দাবি খাসিয়াদের।

এক কুঁড়ি নতুন পানের (নই) দাম ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা। আর খাসিয়া পুরান পান এক কুঁড়ির দাম ৫৫০০ থেকে ৬৫০০ টাকা। বর্তমান মৌসুমে সপ্তাহে যেদিন পান বিক্রি হয় সেদিন পুঞ্জিগুলোত প্রতি পরিবার থেকে ৫ কুঁড়ি পান হলে ৬০০০-৬৫০০ টাকা পেয়ে থাকে।

এই পান চাষকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে ৪৫০ থেকে ৫০০ জন শ্রমিক কাজ করে। পুঞ্জি থেকে ৩০-৪০ টি সিএনজি অটোরিক্সা করে পানগুলো আড়ৎ এ নিয়ে আসে। পুঞ্জি থেকে প্রায় ২০০ শ্রমিক পানগুলো পাহাড়ি টিলা বেয়ে গাড়িতে নিয়ে আসে। প্রতিজন শ্রমিক পারিশ্রমিক হিসেবে দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত পান।

কুলাউড়া উপজেলার সর্ববৃহৎ পানের আড়ৎ রবিরবাজারে অবস্থিত। বিভিন্ন পাহাড়ের গহিনে চাষকৃত এসব পানের সিংহ ভাগই আসে রবিরবাজারের বিভিন্ন আড়তে। রবিরবাজারে তিনটি মার্কেটে ছোটবড় প্রায় ৬০টি পান আড়ৎ রয়েছে। ১২০ থেকে ১৩০ জন মহাজন রয়েছেন।

আন্ত:পুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠন (কুবরাজ) এর সাধারণ সম্পাদক ও কুলাউড়া মুরইছড়া পান পুঞ্জির মন্ত্রী ফ্লোরা বাবলী তালাং জানান, পান চাষকে এখনো সরকারীভাবে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পানচাষে অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে সরকারী বেসরকারীভাবে ঋণ দেয়া হয়। কিন্তুু কুলাউড়ায় এই সুযোগ নেই। পান চাষকে কেন্দ্র করে আদিবাসী ছাড়া অনেক বাঙ্গালী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন। পান চাষকে শিল্প হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১