বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০১ August ২০২১

দক্ষিণের ইলিশে সয়লাব চাঁদপুরের মাছঘাট


জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর এই তিন মাস ইলিশের মৌসুম। ভরা মৌসুমে চাঁদপুরের পদ্মা ও মেঘনায় আশানুরূপ ইলিশ পাচ্ছেন না চাঁদপুরের জেলেরা। তবে দক্ষিণের ইলিশে সয়লাব জেলার মাছঘাট। প্রতিদিন নোয়াখালীর হাতিয়া, ভোলা, মনপুরা, লক্ষ্মীপুরের রামগতি থেকে সাগরের মাছ নিয়ে চাঁদপুর মাছ ঘাটে আসে অর্ধশতাধিক ট্রলার। ফলে লকডাউনের মধ্যেও কাকডাকা ভোর থেকে চাঁদপুর মাছঘাট ক্রেতা আর বিক্রেতার হাঁকডাকে মুখর হয়ে উঠছে।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রধান ইলিশ বাণিজ্যিক কেন্দ্র চাঁদপুর। এখানে প্রতিদিন অন্তত ২শ আড়তদার ও মাছ ব্যবসায়ীর ঘরে অন্যান্য মাছ ছাড়াও ১ হাজার ৫শ থেকে ২ হাজার মণ ইলিশ কেনাবেচা হয়ে থাকে। কিন্তু, করোনাভাইরাসের প্রভাবে জুলাইতে অন্যান্য বছরের তুলনায় ইলিশের আমদানি একেবারেই কমে গেছে। দক্ষিণের ইলিশই বাঁচিয়ে রেখেছে চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী মাছঘাট।

দক্ষিণের ইলিশের মাছঘাট সয়লাব হলেও মানুষের চাহিদা চাঁদপুরের পদ্মার ইলিশ। স্বাদে আর গন্ধে চাঁদপুরের পদ্মার রূপালী ইলিশের সুনাম বিশ্বজুড়ে। তাই বাজারে সবাই পদ্মার ইলিশ খোঁজে। ভালো স্বাদের ইলিশ খেতে হলে প্রথমে তাজা ইলিশ হতে হবে। আর তা হতে হবে চাঁদপুরের পদ্মা নদীর। আসলেই কি পদ্মার ইলিশ সেরা, নাকি মেঘনা নদীর। আসল ইলিশ ও সু-স্বাদু ইলিশ কোনটি এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা হয় মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের ইলিশ বিষয়ক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক, মৎস্য কর্মকর্তা, মৎস্য বণিক সমিতির নেতা এবং মৎস্য ব্যবসায়ীদের সাথে। তারা জানালের আসল স্বাদ এবং কোথাকার ইলিশ সেরা।

মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের ইলিশ বিষয়ক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান বলেন, ইলিশ বিষয়ে যারা অভিজ্ঞ, তারা দেখেই আসল ইলিশ চিনতে পারেন। সাগরের ইলিশ আর নদীর ইলিশে সহজে বুঝে নিতে হবে, নদীর ইলিশে উজ্জ্বলতা বেশি থাকে আর কিলবনের ফ্যাট এবং রূপালী চকটকতা থাকে। পরিবেশের কারণে ইলিশের কিছুটা ভিন্নতা থাকে। পদ্মা-মেঘনার ইলিশের কোনো পার্থক্য নেই। নদী অর্থাৎ মিঠাপানি আর খাদ্যের কারণে স্বাদের পার্থক্যটা আসে। আসল স্বাদের পার্থক্যটি আসে পরিবেশ ও স্বাদের কারণে। মিঠাপানি অর্থাৎ পদ্মা-মেঘনার পরিবেশ এবং খাদ্যের মান ভালো থাকায় এখানকার ইলিশ স্বাদ ভিন্ন। মূলত পদ্মা-মেঘনার উভয় ইলিশের মধ্যেই স্বাদ থাকে। আসলে যে শুধু পদ্মার ইলিশ সেরা সেটি নয়, মেঘনার ইলিশও সুসাধু। প্রচলিত কারনে সবাই পদ্মার ইলিশ বলে। পদ্মা-মেঘনা দুটোর ইলিশই স্বাদ রয়েছে।

এ ইলিশ গবেষক বলেন, সাগরের ইলিশ স্বাদ সম্পূর্ণই আলাদা। সেখানে পরিবেশ ও খাদ্যভ্যাসগত পরিবর্তন থাকে। যার কারণে সেই সেখানকার ইলিশগুলো উজ্জ্বলতা কম থাকে ও শরীরে লালচে ভাব এবং দুসর বর্ণের থাকে। এই ইলিশের শরীরে যে মাংসপেশী তৈরি হয় সেখানে গঠনগত পার্থক্য থাকে পদ্মা-মেঘনা নদীর ইলিশের সাথে। যার কারণেই সাগরের ইলিশ স্বাদ কম হয় এবং নদীর ইলিশ স্বাদ ভালো হয়। ড. আনিসুর রহমান আরো বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আজকে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইলিশের উৎপাদন ২০০২-২০০৩ সালে যেখানে ২ লক্ষ মেট্রিক টনেরও নিচে ছিল, আজ সেটি এখন সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিকটনে চলে আসছে। আমরা আশা করতে পারি, মা ইলিশের ডিম ছাড়ার সুযোগ, অভয়াশ্রম বাস্তবায়ন, জাটকা সুরক্ষা এবং সর্বপরি সাগরের যে ৬৫ দিন নিষেধাজ্ঞা চলে সেটি মেনে চলা। এই চারটি যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন হতে থাকলে এ অর্থ বছরে সাড়ে  ৬ লাখ মেট্রিক টন ইলিশের উৎপাদন বাড়তে পারে বলে আমরা আশা করি।

চাঁদপুর বড়স্টেশন মাছঘাটের ব্যবসায়ী রুবেল গাজী বলেন, চাঁদপুরের রূপারী পদ্মার ইলিশ চিনার উপায় চোখ থাকবে কালো, মাছটি হতে চড়া, মাথা গোলগাল ছোট। শরীর চকচক করবে। আর সাগরের ইলিশ শরীরে লালচা লালচা লম্বা থাকে। লেজের আকৃতি ভিন্ন। লেজের পাশে পিচলা পিচলা থাকবে। অনেকেই এই বিষয়গুলো না জানার কারণে সাগরের ইলিশ কিনে নিয়ে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, ক্রেতারা এসব জানলে বাইরের ইলিশের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পায় না।

চাঁদপুরের পদ্মায় ইলিশ কম পাওয়া প্রসঙ্গে আনিছুর রহমান বলেন, পদ্মায় প্রচুর পরিমাণে ডুবো চর এবং নদীতে ড্রেজিং করে অবাধে বালু উত্তোলণের ফলে পদ্মায় ইলিশ আশানুরূপ পাওয়া যাচ্ছেনা। তবে তিনি আশাবাদী প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সামনে অমাবশ্যায় তারাবুনিয়া পয়েন্ট দিয়ে পদ্মায় মাছ প্রবেশ করবে। তখন পদ্মায় জেলেদের জালে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যাবে।

চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত সরকার বলেন, এখনতো পদ্মায় আগের মতো ইলিশ নেই। যা পাওয়া যায় যৎ সামান্য।

তিনি বলেন, চাঁদপুরের ইলিশের চিনার উপায় হলো চাঁদপুরের ইলিশ দুটি কালারে হয়। উপরের কালার হবে কালো আর নিচে অংশে সাদা। শরীরের আকৃতি একটু চেপ্টা, মাথা ছোট গাড় চড়া। গভেষকরা যাই বলুক, আসলে পদ্মার ইলিশই আমাদের কাছে সেরা।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা গোলাম মেহেদি হাছান বলেন, বাংলাদেশের মধ্যে ইলিশের সবচেয় বড় ল্যান্ডিং সেন্টার চাঁদপুরে। সারা দেশে এই শহরকে ইলিশের শহর হিসেবেই চিনে। যার কারণে মানুষ একটু বেশি আকাঙ্ক্ষা থাকে, এখান থেকে আসল সুস্বাধু ইলিশ ক্রয় করে নিয়ে যাবে। এখানে যে শুধু চাঁদপুরের ইলিশ বিক্রি হয় তা কিন্তু নয়, এখানে বিভিন্ন জেলা থেকে জেলারা মাছধরে এখানে নিয়ে আসে। মূলত পরিবেশ ও খাবার ভিন্ন হওয়ার কারণে এক এক জেলার ইলিশ এক এক রকম স্বাদ হয়ে থাকে। অনেক ক্রেতারা আসল ইলিশ না চিনে অন্য ইলিশ কিনে হতাশ হচ্ছেন। 


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১