আপডেট : ১২ July ২০২১
স্কুলের বড় আপুরা যখন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় খুব স্পষ্ট, দ্রুত, গুছিয়ে কথার পরিপ্রেক্ষিতে কথা বলত তখন তিনি ভাবতেন আপুরা এত সুন্দর করে কথা বলেন কীভাবে। বিতর্কের যুক্তিতর্কের খেলাটা ছোটবেলায়ই খুব ভালো লেগে যায় তার। তারপর সাতপাঁচ না ভেবে সিদ্ধান্ত নেন বড় হয়ে তিনিও বিতর্ক করবেন। বিতর্কের সাথে নিজেকে জড়িয়ে নেওয়ার যাত্রার গল্পটা এমনই ছিল। ছোট থেকেই অবহেলা, নানান সমস্যা, বাধা পেরিয়ে এখনকার ডিকে দিব্যা মনি হয়ে উঠেছেন। তবে তিনি মানুষের ভুলগুলো ভুলে গিয়ে একসাথে সকলকে নিয়ে চলতে চান। আর ভুলে যেতে চান পেছনের যত মন্দ স্মৃতি তার পথ আটকে দাঁড়িয়েছিল। এতক্ষণ যার কথা বলছিলাম, তিনি ডিকে দিব্যা মনি। পিরোজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। শিশুরা নিজেদের সমস্যা সরাসরি দেশের কর্তাব্যক্তিদের সামনে তুলে ধরার প্ল্যাটফরম চাইল্ড পার্লামেন্ট। মানে শিশুদের সংসদ। শিশুদের সমস্যার সমাধান করার প্ল্যাটফরমেও যুক্ত রয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিশুদের হয়ে একটি প্রশ্ন করার মাধ্যমে হলেও যদি দেশের উপকার হয় তাহলে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া কিংবা অবদান। একের ভেতর অনেকের মতো তিনি আবৃত্তিতেও পারদর্শী। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আবৃত্তি না শিখেও আবৃত্তি করার ভালোলাগা থেকে এবং ছোটবেলা থেকেই মায়ের কাছ থেকে আধ আধ কণ্ঠে আবৃত্তি শেখার মাধ্যমেই এই জগতে তার প্রবেশ। বিভাগীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জনের মাধ্যমে পেয়েছেন সাফল্যও। তিনি বিশ্বাস করেন, যারা বিতর্ক, বক্তৃতা, আবৃত্তি, কুইজে পারদর্শী বা যারা যুক্তি দিয়ে কথা বলতে পারে তারা বাস্তব জীবনেও যুক্তিবাদী হয়ে থাকে। সুস্থ মানসিকতার অধিকারী হয়ে ওঠে। তিনি এই বিশ্বাসটিই নিজের মধ্যে ধারণ করেন। সেই বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করেই ২০১৮ সালে স্কুল পর্যায়ে উপস্থিত বক্তৃতায় বাংলেদেশের সেরা সাতের একজন হন। মানুষের স্বপ্ন বা ভবিষ্যৎ পরকিল্পনা বৈচিত্র্যময়। এখন এই হতে চায় তো, কিছু সময় পরই চায় অন্যকিছু হওয়ার। ডিকে দিব্যা মনিও এর ব্যতিক্রম নয়। ছোটবেলায় তিনি হতে চেয়েছিলেন ডাক্তার। তারপর চেয়েছেন বিজ্ঞানী, নভোচারী। এমনকি তিনি জাদুকর হতেও চেয়েছেন। তবে সেসব ইচ্ছা এখন আর তার নেই। এখন তিনি বিশ্বের মানুষের কল্যাণে কিছু করতে চান। তার ভাষায়, এখন দেশের মানুষগুলো যেন ভালো থাকে সেরকম কিছু করব, পৃথিবীর শান্তি রক্ষার জন্য কিছু করব। ‘দিব্যা’ বলে পরিচিত থাকলেও অনেক বন্ধুরাই শর্টকার্ট করে ‘ডিকে’ বলে ডেকে থাকেন বলে তিনি জানান। সাফল্যের ঝুড়িও তার ছোট নয়। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুবাধে ১৯০টির অধিক সার্টিফিকেট, ৩০টি ক্রেস্ট, অনেক অনেক বই পেয়েছেন। তবে তিনি পুরস্কার নিয়ে ভাবেন না। ভাবেন কাজটি নিয়ে। জাতীয় পর্যায়ে মণিপুরী নৃত্যে, উপস্থিত বক্তৃতায়, জ্ঞান জিজ্ঞাসায় ও দলীয় বিতর্কে অংশগ্রহণ তার সাফল্যের লাইমলাইন বলে মনে করেন তিনি। এর বাইরে বিভাগীয় পর্যায়ে উচ্চাঙ্গ নৃত্য, নজরুল সংগীত, দেশাত্মবোধক গান, কবিতা আবৃত্তি, রচনা প্রতিযোগিতা, একক বিতর্ক, বঙ্গবন্ধুকে জানো বাংলাদেশকে জানোসহ আরো বেশ কয়েকটি বিষয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন তিনি। এছাড়া গণিত উৎসবে পিরোজপুর জেলায় প্রথম, মাধ্যমিক পর্যায়ের পিরোজপুর জেলার নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী নির্বাচিত হন তিনি। তাছাড়া গার্লস গাইডিং, স্কাউটিং, গণিত অলিম্পিয়াড, সায়েন্স অলিম্পিয়াডের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। তবে তিনি মনে করেন এখনো সাফল্য আসেনি। তিনি বলেন, সবকিছুতেই অংশগ্রহণ করে যেতে চাই। আমার এখনো সাফল্য আসেনি। আরো কঠিন পথচলা বাকি। শান্তিতে বিশ্বজয়ী মালালা ইউসুফজাই তার অনুপ্রেরণার উৎস কেন্দ্র। তার তেজ তাকে রোমাঞ্চিত করে বলে তিনি জানান। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে নিজের হাতে কাজ করার করতে চাই। অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমার অভিজ্ঞতা তেমন নেই। তবে বিশেষ একটা মুহূর্তের কথা বারবার আমার মনে পড়ে। একবার ৪টি বিষয় প্রতিযোগিতা; কিন্তু দুটোতে অংশগ্রহণ করা যাবে। কিন্তু আমি তো ৪টিতেই অংশগ্রহণ করতে চাই। পরবর্তীতে যে দুটোতে অংশগ্রহণ করলাম সেই দুটো প্রতিযোগিতাই হয়েছিল। বাকিগুলো সময়ের অভাবে আর হয়নি। সেদিনের অনুষ্ঠান প্রায় শেষ তবু আমার নাম ডাকছে না। বিশাল হলরুমে ৫ বা ৬ জন বসে আছি। একদম শেষ পর্যায়ে জানালো, ৪৫০ জনের মধ্যে আবৃত্তিতে প্রথম হয়েছে ডিকে দিব্যা মনি। সেদিনের সেই সময়টাই দারুণ অভিজ্ঞতার ছিল। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের নানান স্মৃতি রয়েছে তার। এরমধ্যে বিশেষ স্মৃতি সম্পর্কে তিনি বলেন, বিভাগীয় পর্যায়ে উচ্চাঙ্গ নৃত্য আর একক বিতর্ক দুটো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে গিয়েছিলাম। নাচের পোশাক পরে বিতর্কটা করতে হয়েছিল। যখন ঐ পোশাকে বিতর্কের কক্ষে প্রবেশ করি, বিচারকরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তুমি এই রুমে কেন! আমি যখন বললাম, স্যার পিরোজপুর জেলা থেকে একক বিতর্কের জন্য আমি নির্বাচিত। তখনো সবার ঘোর কাটেনি। সমবয়সীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সবারই নিজস্ব মতামত রয়েছে। কিন্তু দেশের জন্য যেটা ভালো সেজন্য সকলকে এক হতে হবে, নিজ নিজ অবস্থান থেকে চেষ্টা করা উচিত ভালো থাকার এবং ভালো রাখার। তিনি আরো বলেন, আমি চাইব অন্তত সমবয়সীরা আগে নিজেকে পাল্টাবে। নিজেরা বদলালেই চারপাশটাও বদলে যাবে। কারণ সোনার বাংলা তো আমরাই গড়ে তুলব।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১