আপডেট : ১০ May ২০২১
ফুরিয়ে আসছে করোনাভাইরাস প্রতিরোধী টিকার মজুত। দেশে এখন যে সংখ্যক টিকা আছে, তাতে প্রথম ডোজ নেওয়া সবাই দ্বিতীয় ডোজ নির্ধারিত সময়ে পাবেন কি না তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। এর মধ্যে দেশে করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্তের খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত হয়ে আরো ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ১১ হাজার ৯৩৪ জনের। নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩৮৬ জন। সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৩ জনে। গতকাল রোববার বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাছিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নতুন মারা যাওয়া ৫৬ জনের মধ্যে ৩৮ জন পুরুষ ও ১৮ জন নারী। গত ২৪ ঘন্টায় ঢাকা সিটিসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ও বাড়িতে উপসর্গবিহীন রোগীসহ সুস্থ হয়েছেন ৩ হাজার ৩২৯ জন। এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ৭ লাখ ১০ হাজার ১৬২ জন। সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪৫৪টি ল্যাবে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা হয়েছে। এর মধ্যে আরটি-পিসিআর ল্যাব ১২৮টি, জিন এক্সপার্ট ৩৫টি, র্যাপিড অ্যান্টিজেন ২৯১টি। এসব ল্যাবে ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ১৬ হাজার ৭৭৫টি। মোট নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১৬ হাজার ৯১৫টি। এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ৮৯৪টি। গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার ৮ দশমিক ১৯ শতাংশ। এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৯১ দশমিক ৮১ এবং শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুর হার এক দশমিক ৫৪ শতাংশ। নতুন করে আইসোলেশনে এসেছেন ২৮৫ জন ও ছাড় পেয়েছেন ৫১২ জন। এ পর্যন্ত আইসোলেশনে এসেছেন এক লাখ ২৬ হাজার ১৫৩ জন এবং ছাড়পত্র নিয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ৪০৭ জন। বর্তমানে আইসোলেশনে আছেন ১৮ হাজার ৭৪৬ জন। করোনার দ্রুত বিস্তার, ক্রমাগত রূপ পরিবর্তন আর টিকার ঘাটতিতে মহামারীর দ্বিতীয় ধাক্কায় বিপর্যস্ত প্রতিবেশী দেশ ভারত। একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশেও। শনিবার বাংলাদেশে প্রথম ভারতীয় ‘ডাবল মিউট্যান্ট’ ভ্যারিয়েন্ট শনাক্তের তথ্য নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এর সঙ্গে রয়েছে টিকার ঘাটতিও। সেরাম ইনস্টিটিউট টিক সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় সরকার হন্যে হয়ে অন্যত্র থেকে টিকা আনার চেষ্টা করছে। দেশে এ পর্যন্ত ৯২ লাখেরও বেশি মানুষ টিকা নিয়েছেন। এক সপ্তাহের মধ্যেই টিকার মজুত ফুরিয়ে যাবে। দ্রুত টিকা না আসলে ১৪ লাখেরও বেশি মানুষ টিকার দ্বিতীয় ডোজ থেকে বঞ্চিত হবে। ভারতে মহামারীর ঊর্ধ্বগতির বিপজ্জনক প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশী বাংলাদেশেও। বিশেষ করে যখন টিকা কর্মসূচি জোরেশোরে এগোনোর কথা, তখনই টিকার সংকট তৈরি হয়েছে বলে উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তার ওপর ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিক সংক্রামক করোনার বিস্তারও বাড়ছে। ভারতে প্রথম শনাক্ত যে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের করোনার উপস্থিতি বাংলাদেশে পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য মেলেনি এখনো। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশে করোনার যত নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং হয়েছে, তার অধিকাংশই ছিল সাউথ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট। অব্যাহত রূপ পরিবর্তনের ফলে নতুন ভ্যারিয়েন্টগুলো বেশি সংক্রামক। এগুলোর ওপর করোনা প্রতিরোধী বিদ্যমান টিকার কার্যকারিতা কম বলে আগেই সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, মার্চ ও এপ্রিলের শুরুর দিকের তুলনায় গত দুই সপ্তাহে বাংলাদেশে করোনা শনাক্তের হার কমেছে। কিন্তু এর কারণ অস্পষ্ট। এখনই মোক্ষম সময় করোনা প্রতিরোধে টিকা কর্মসূচির গতি বাড়ানোর। দেশে করোনার জিনোম সিকোয়েন্সিং করছেন শিশু স্বাস্থ্য গবেষণাকেন্দ্রের বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা। বলেন, টিকাদানের গতি বাড়িয়ে করোনার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখার এখনই সময়। এখনই নিশ্চিত করা দরকার যে ভাইরাসের নতুন রূপগুলোর বিস্তার এ দেশে যেন না বাড়ে। বাংলাদেশে টিকা আসার মূল উৎস ভারত। করোনা মহামারীর বর্তমান প্রেক্ষাপটে ডোজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে দিল্লি। বিশ্বে টিকা উৎপাদনকারী সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদন করছে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা ফার্মাসিউটিক্যালসের গবেষণালব্ধ করোনা প্রতিরোধী টিকা। এখন পর্যন্ত এ টিকাই সবচেয়ে বেশি কিনেছে বাংলাদেশ সরকার। প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ হিসাবে জুনের মধ্যে বাংলাদেশে তিন কোটি ডোজ পাঠানোর কথা ছিল সেরামের। সেখানে মাত্র ৭০ লাখ ডোজ পাঠানোর পর গত ফেব্রুয়ারি থেকে টিকা রপ্তানি বন্ধ রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ কারণে দেশে রাশিয়া ও চীন উদ্ভাবিত টিকা উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশ দুটি থেকে টিকা উৎপাদনের প্রযুক্তিও দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে। চীন থেকে ১২ মে উপহার হিসেবে পাঁচ লাখ ডোজ টিকা পৌঁছানোর কথা রয়েছে বাংলাদেশে। টিকার ঘাটতি পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও দুই কোটি ডোজ চেয়েছে সরকার। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) গবেষক ড. আ স ম আলমগীর জানান, মহামারীর এ পর্যায়ে টিকার ঘাটতি উদ্বেগজনক। নির্ধারিত সময়ে টিকা না আসায় গত মাসে প্রথম ডোজ নেওয়ার জন্য নিবন্ধন কর্মসূচি স্থগিত করে সরকার। এখন বিঘ্নিত হওয়ার পথে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়াও। এ অবস্থায় মরিয়া হয়ে টিকা আমদানির জন্য ভারতের বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে বাংলাদেশ। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের কারণে মহামারীর তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই। বিশেষ করে আমাদের সীমান্ত যখন পুরোপুরি সুরক্ষিত নয়, তখন তো এ শঙ্কা অনিবার্য। দেশজুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিতে ব্যর্থতার অর্থ হলো প্রাকৃতিক নিয়মে ভাইরাসটিকে আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া-যা এড়ানোর কোনো উপায় নেই। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভাইরাসের অব্যাহত রূপ পরিবর্তন ও দেশে নতুন নতুন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের করোনার উপস্থিতি এমনিতেই উদ্বেগের কারণ। টিকার সংকটে এ জটিলতা আরো বাড়বে। বিশ্বে করোনার দৈনিক সংক্রমণে শীর্ষে রয়েছে ভারত। দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা বেশ কিছুদিন ধরেই চার লাখের ওপরে রয়েছে। দৈনিক প্রাণহানিও চার হাজার ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় করোনায় ১৬৬ জন প্রাণ হারাচ্ছে দেশটিতে। প্রতি মিনিটে এ সংখ্যা অন্তত তিন। ছোঁয়াচে ভাইরাস আতঙ্কে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত হয়ে ভ্রমণ বন্ধ থাকলেও অব্যাহত আছে পণ্য আনা-নেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রায় সব দেশে করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রয়োজনের তুলনায় ভীষণ অপ্রতুল। বাংলাদেশে এ সংখ্যা ধারেকাছেও নেই। অর্থাৎ নতুন ভ্যারিয়েন্টের বিস্তার এ দেশে কতটা, সে বিষয়ে একেবারেই অনিশ্চিত গবেষকরা। দেশজুড়ে চলমান বিধিনিষেধ ১৬ মে পর্যন্ত বাড়ানো হলেও সচল রয়েছে শপিং মল, স্থানীয় পরিবহন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আন্তজেলা গণপরিবহন বন্ধ রাখা হলেও পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে নিজস্ব ব্যবস্থায় ঢাকা ছাড়ার অপেক্ষায় আছে লাখো মানুষ। অথচ ভারতের সীমান্তবর্তী আরেক দেশ নেপালেও করোনার বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকায় কঠোর লকডাউন আরোপ করেছে দেশটি। এমন পরিস্থিতি স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতা আর লকডাউনের শৈথিল্যের ফলে ভারতের পরে মহামারীর ঝড় বাংলাদেশে আঘাত হানবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। কারণ এ ধরনের পদক্ষেপের ফলেই ভারতে করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ধাক্কা এতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেটের গত শনিবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ল্যানসেটের বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানায়, মহামারীর প্রথম ধাক্কা নিয়ন্ত্রণের সাফল্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের অতি আত্মতুষ্টিই ভারতে জাতীয় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাইরাসের বিস্তার সীমিত থাকাকালীন একের পর এক ভুল পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত সরকার। বিশেষ করে সংকট সামলাতে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা ও উন্মুক্ত আলোচনা দমনেরও তীব্র সমালোচনা করা হয় এতে। হিন্দু-অধ্যুষিত ভারতে ধর্মীয় কুম্ভমেলায় কোটি মানুষের সমাগম আর পাঁচ রাজ্যে মাসব্যাপী বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ও প্রচারের পরই করোনা সংক্রমণ তীব্র রূপ নেয় দেশটিতে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যবিদদের বারবার সতর্কতাও নরেন্দ্র মোদির প্রশাসন আমলে নেয়নি বলে রয়েছে অভিযোগ।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১