বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৭ May ২০২১

আজকের শিক্ষাকে কাজে লাগাই


মালয়েশিয়াকে যিনি আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন তিনি মাহাথির মোহাম্মদ। তাকে বলা হয় আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার। প্রথম দফায় দীর্ঘ সময়, ১৯৮১ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। প্রধানমন্ত্রী থাকার কোনো এক সময় তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তখন চিকিৎসার জন্য তাকে উন্নত কোনো দেশে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। খুব দূরে না হলেও অন্তত পাশের দেশ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা করাতে তাগাদা দেওয়া হয়। দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে হবে। কেন? কারণ চিকিৎসাসেবায় মালয়েশিয়া তত উন্নত নয়। প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলেন, উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে যে সময় প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করে তিনি দেশেই চিকিৎসা নেয়ার মতো সময় পাবেন? উত্তর হ্যাঁ হওয়ায়, ঝুঁকি নিয়েও তিনি অপেক্ষা করেন। দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত করে দেশেই চিকিৎসা নেন। ঘটনাটি বেশ আগের হলেও, গত বছর করোনাকালের শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ঘটনার বর্ণনা সংবলিত একটি পোস্ট আবারো ঘুরেফিরে অনেকের দেয়ালে দেখা যেতে থাকে। যারা তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের দেয়ালে এ ধরনের পোস্ট টানিয়েছিলেন, বা বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ার করেছিলেন, ম্যাসেঞ্জারেও একে অন্যকে বিলি করেছিলেন, তাদের সেই চালাচালির পেছনে— মালয়েশিয়ার উন্নতিতে শিরঃপীড়া নয়, বরং আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার দীনতা, সমস্যা ও সম্ভাবনার কথাই উঁকি দিয়েছে।

২. আজকে, এই দুই হাজার একুশে, চাইলেই চট করে যে কারো পক্ষে সহজেই দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। বেশ আগেই সে সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা দুয়ার খোলা রাখলেও, অন্যরা তা এঁটে দিয়েছে। করোনাভাইরাস বাইরের দুনিয়াকে দুয়ার আঁটতে উসকে দেয়। দুই হাজার উনিশে চীনে মানবশরীরে শনাক্ত হয় ভাইরাসটি। তারপর থেকেই হুটহাট ভিন দেশে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। সে বেড়ানোর উদ্দেশ্যেই হোক, আর চিকিৎসা নিতেই হোক। এই বাইরে যাওয়া বন্ধ হতেই আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার হালহকিকত আরো স্পষ্ট হয়েছে। করোনা সংক্রমণের শুরু, সেই প্রথম ঢেউ থেকেই শুধু আমাদেরই নয়, বিশ্বের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কোথায় কতটুকু ত্রুটি, কতোটুকু ফাঁকি তা স্পষ্ট। সেই ত্রুটি, সেই ফাঁকি অন্যরা মেরামত শুরু করেছে। স্বাস্থ্যখাত এগিয়ে নিতে পুরো বিশ্বকেই অনেক পথ হাঁটতে হবে। সেই পথ কতোটুকু? তার সীমা কোথায়? সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘আমরা স্বাস্থ্যখাতকে গুরুত্ব দিইনি, অবহেলা করেছি। যার ফলাফল আমরা করোনায় পেয়েছি। করোনা মহামারীতে আমরা কতোটা অসহায়, সেটা দেখেছি। শুধু আমরাই নই, পৃথিবীর কোনো দেশই স্বাস্থ্যখাতকে গুরুত্ব দেয়নি।’ কেতাবে লেখা না হলেও, এ কথা সংবাদপত্রের পাতায় লেখা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই কথার মধ্য দিয়ে অনেক বার্তাই স্পষ্ট। পৃথিবীর কোন দেশ কী করেছে, সে উদাহরণ টানার চেয়ে আমরা কী করেছি, কতোটুকু করতে পেরেছি, কতোটুকু সুযোগ ছিল, তার কতটুকু কাজে লাগিয়েছি, সেটাই এখন বিবেচ্য হওয়া প্রয়োজন। চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে সরকার আন্তরিক। বর্তমান সরকারের এটি অঙ্গীকারও। কিন্তু তারপরও সাম্প্রতিক সময়েও স্বাস্থ্য খাতের ত্রুটি মেরামতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও যথাসময়ে বাস্তবায়ন না হওয়ার নজিরও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে সামনে আনতে চাই, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর প্রায় বছর পেরুলেও ঝুলে থাকা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ। এরকম আরো আছে, যা সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে আমাদের জানা। এতে করে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক নয় কি, যে স্বাস্থ্যখাতকে গুরুত্ব না দেয়ার যেসব অভিযোগ বরাবর উঠে এসেছে, তা থেকে আমরা কি বেরুনোর চেষ্টা করছি, না যেখানে ছিলাম সেই বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছি?

স্বাস্থ্যখাতকে এতদিন গুরুত্ব না দেওয়ার ফলে যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য কী করণীয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী তাও কিন্তু একই অনুষ্ঠানে বলেছেন। স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে আমাদের আরো বেশি এগিয়ে আসার সঙ্গে তিনি এও বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ছাড়া দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। কেন? কারণ, করোনা আমাদের দেখিয়েছে স্বাস্থ্যসেবার যদি বিপর্যয় ঘটে, তাহলে মানুষের কী অবস্থা হয়। থেমে যায় দেশের সব উন্নয়ন, দেশে শান্তি থাকে না, সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি হয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে এবং ভবিষ্যতের বিপদ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যখাতকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

পার্শ্ববর্তী দেশসহ অনেক দেশেই এখন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাত তাদের স্বাস্থ্যসেবা। আস্থা রাখার মতো আমাদের যথেষ্ট চিকিৎসক রয়েছেন, চিকিৎসক তৈরিতে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও সন্তোষজনক। সরকারি এবং বেসরকারি উভয় ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই বিদেশি শিক্ষার্থীও কম নয়। তাতে এটি স্পষ্ট যে, আমরা ভুল পথে নেই। এই পথটিকে কাজে লাগিয়েই আমাদের স্বাস্থ্যখাত এগিয়ে যেতে পারে। স্বাস্থ্যখাতে আমাদের বাজেট জিডিপির মাত্র ০ দশমিক ৯ শতাংশ। স্বাস্থ্যখাতকে শক্তিশালী করতে এবং আগামী দিনের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর বিকল্প নেই। সেইসঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে চলমান প্রকল্পগুলোরও সর্বশেষ অবস্থা পর্যালোচনায় নিতে হবে। গত এক বছরে স্বাস্থ্যখাতের কোথায় কতটুকু বরাদ্দ হয়েছে আর তা কোথায় কীভাবে কতটুকু ব্যয় হয়েছে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং যেসব কর্মসূচি বাস্তবায়নাধীন ছিল, নির্ধারিত সময়ে যতোটুকু হওয়ার কথা, তা না হয়ে থাকলে পর্যালোচনার মাধ্যমে সেখানের গাফলতি ও দায়িত্বহীনতা চিহ্নিত করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।

টাকার অভাবে চিকিৎসা পায় না দরিদ্র মানুষ। এমন কথা শোনা যায়, কিন্তু টাকা থাকলেও যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া যায় না, মর্মান্তিক সেই উদাহরণও কিন্তু আমরা করোনাকালেই দেখেছি। সেসব উদাহরণের প্রসঙ্গ টেনে মনকে ব্যথাতুর করে তুলতে চাই না। বরং আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতিতে সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায় থেকেই এগিয়ে আসা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণেই এখন আমরা নানান বিচিত্র খবর জানি, পড়ার সুযোগ পাই। ভারতের শীর্ষ ধনী রতন টাটার করোনাকালীন সময়ে মানুষের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসার যে খবর, সেই মানবীয় গুণের সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়ালে দেয়ালে ঘুরছে। কেন? কারণ মানুষ চাইছে, যাদের সামর্থ্য নেই, তারা চাইছেন, যাদের সামর্থ্য আছে, তারা এগিয়ে আসুন। দেশের চিকিৎসাখাতে বিনিয়োগ করুন। সেই বিনিয়োগ আপনাকেই শুধু নিরাপদ রাখবে না, সাধারণকেও নিরাপদ রাখবে। যে নিরাপত্তা তারা অর্থের বিনিময়েই নেবে। সহায়তা হিসেবে নয়। মানুষ চাইছে উন্নত সেবা, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার আর আস্থা। আমাদের ধনিক শ্রেণি, যাদের সামর্থ্য আছে, দেশে মানসম্মত হাসপাতাল গড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার দিকেও তারা নজর দিন। দেশে ব্যবসা করছেন, সম্পদ গড়ছেন, সেই সম্পদ নানাখাতে বিনিয়োগ করছেন, তা থেকে কিছুটা স্বাস্থ্যখাতেও বিনিয়োগের প্রয়োজন অনুভব করুন। কারণ প্রয়োজনের সময়ে সিঙ্গাপুর-ব্যাংকক সবসময় সহজ নাও হতে পারে। করোনা আজ সবাইকে এক কাতারে এনেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অসুস্থ হলে তাঁকে যেন এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তোলা না হয়। চিকিৎসা তিনি বাংলাদেশেই নেবেন, বিদেশে যেন তাঁকে নেওয়া না হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তের যথাযথ বাস্তবায়নের জন্যও কিন্তু আমাদের উদ্যোগী হওয়া জরুরি।

৩. করোনাভাইরাসের প্রভাবের এই ভীতি আমাদের আতঙ্কিত করলেও, শিখিয়েছে অনেক। সকলক্ষেত্রেই স্থবিরতার জন্য থমকে গেছে অর্থনীতি। কিন্তু এ অবস্থারও অবসান হবে। আজকের এই বিপদও একসময় কাটবে। পৃথিবীর মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে। কিন্তু সেই ফিরে আসা জীবনের জন্য আমাদের আজকের সময় থেকেই শিক্ষা নিতে হবে। মুনাফার লোভে, পুঁজিবাদী সভ্যতার দিকে আমাদের যে যাত্রা, সেই যাত্রায় আজ যে বাধা প্রকৃতি তৈরি করেছে, আমাদের সভ্যতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে দুর্বলতা, জীবনের যে দুর্বল দিক, পৃথিবী সুস্থ হওয়ার পরেও আমরা যদি সেদিকে দৃষ্টিপাত না করি, তবে মেনে নিতেই হবে করোনাভাইরাস আমাদেরকে ঘরে বন্দি করলেও কোন শিক্ষা দিতে পারেনি। অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব ফলানোর চেয়ে, অন্যকে ঘায়েল করার চেয়ে এখন আমাদের মনোযোগী হতে হবে নিজের প্রতি। আমরা শুধু ভোগের দিকে এগিয়েছি, ত্যাগের দিকে নয়— সেবার দিকেও নয়। এই দৃশ্য আজ পৃথিবীর প্রায় সকল দেশের।

চলতি পথে, হঠাৎ কোথাও বিকট আওয়াজ হলে আতঙ্কিত মানুষ প্রথমে ছুটে পালানোর চেষ্টা করে। দ্বিগবিগ্দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সটকে পড়ার চেষ্টা করে। তারপর ধাতস্থ হলে ফিরে আসে শব্দের উৎসের কাছে, জানার চেষ্টা করে কোথায়, ঠিক কি ঘটেছে? করোনাভাইরাস আজ আমাদেরকে আতঙ্কিত মানুষের মতো পথ থেকে হটিয়ে দিয়েছে। ইতোমধ্যে পেরিয়েছে অনেক সময়। মানুষ ধাতস্থ হচ্ছে, সংবিৎ ফিরছে। এই সম্বিত দেশে দেশে সরকারের মাঝেও ফিরতে হবে। ভবিষ্যতের পৃথিবী যেন শঙ্কামুক্ত থাকে, মানুষ যেন নিরাপদ থাকে সেজন্য উন্নতি নিশ্চিত করতে হবে চিকিৎসাব্যবস্থার। সঙ্গে মানুষকেও সচেতন হতে হবে। কারণ জনগণের ভেতর থেকে গড়ে ওঠা ব্যক্তিগত সুরক্ষার ধারণার মাধ্যমেই আসবে কাঙ্ক্ষিত  মুক্তি। সেইসঙ্গে আমাদের আজকের এই নিয়ন্ত্রিত জীবনের শিক্ষাও যেন আমরা ভুলে না যাই।

 

লেখক : কবি, সাংবাদিক


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১