আপডেট : ০২ April ২০২১
মো. জিল্লুর রহমান ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ একটি প্রত্যয়, একটি স্বপ্ন, যা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ও অগ্রসরমাণ বিষয়। বিরাট এক পরিবর্তন ও ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপই হলো ডিজিটাল বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে মূলত একটি উন্নত, বিজ্ঞানমনস্ক সমৃদ্ধিকে বোঝায়। এটি হচ্ছে সেই সুখী, সমৃদ্ধ, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বৈষম্য, দুর্নীতি, দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ, যা প্রকৃতপক্ষেই সম্পূর্ণভাবে জনগণের রাষ্ট্র এবং যার মুখ্য চালিকাশক্তি হচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। এটি দেশের জনগণের একটি উন্নত জীবনের প্রত্যাশা, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা। এটি দেশের সব মানুষের ন্যূনতম মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর প্রকৃষ্ট পন্থা। এটি আমাদের দেশের জন্য স্বল্পোন্নত বা দরিদ্র দেশ থেকে সমৃদ্ধ ও ধনী দেশে রূপান্তরের জন্য মাথাপিছু আয় বা জাতীয় আয় বাড়ানোর অধিকার ও কৌশল। ডিজিটাল বাংলাদেশ বস্তুত জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রথম সোপান। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের পরের প্রজন্মের জন্য যে সমৃদ্ধি ও উন্নত জীবন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম, ডিজিটাল বাংলাদেশ আমাদের সেই স্বপ্ন পূরণ করবে। ‘বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি’ ১৭ থেকে ১২ নভেম্বর ২০০৯-এ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ সামিট’ নামক এ বিষয়ে প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করে, যাতে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো আলোচিত হয়। আর এভাবেই বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বার্ষিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, এশিয়ার দেশগুলোতে ই-গভর্নমেন্ট কার্যক্রম দ্রুত প্রসার লাভ করছে। বিশ্বের ১৯৮ দেশের ই-গভর্নমেন্ট কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে বার্ষিক এই রিপোর্ট তৈরি করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের টাবম্যান সেন্টার ফর পাবলিক পলিসি বিভাগ। রিপোট অনুযায়ী ই-গভর্নমেন্টে প্রথম স্থানে রয়েছে-দক্ষিণ কোরিয়া, দ্বিতীয় তাইওয়ান, তৃতীয় সিঙ্গাপুর এবং চতুর্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আগে দক্ষিণ কোরিয়ার স্থান ছিল ৮৬তম। তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে ৮৬ নম্বরে। আগে বাংলাদেশ ছিল ১১৫-তে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ পরিণত হয়েছে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর মেরুদণ্ড হিসেবে এবং ধীরে ধীরে এর ব্যবহারও প্রসারিত হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রাকে আরো গতিশীল করার লক্ষ্যে সরকার এ সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে ও এর বাস্তবায়ন করছে। দেশে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির প্রসার ও বিকাশের জন্য যেমন প্রয়োজন দক্ষ জনবল, তেমনি দরকার প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন। তাই বাংলাদেশের সরকার হাতে নিয়েছে বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। তাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যথার্থ স্লোগান, ‘প্রযুক্তি প্রগতির পথ হিসাবে গণ্য, ডিজিটাল বাংলাদেশ হতে হবে সকলের জন্য।’ এখন দেশের ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলায় ৫ হাজার ২৭৫টি ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে জনগণকে ২০০ রকমের সেবা দেওয়া হচ্ছে। গ্রাম ও শহরের অনেকের হাতেই এখন মুঠোফোন এবং মুঠোফোনের মাধ্যমে নানাবিধ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি দপ্তর ও অফিসের যে-কোনো তথ্য ডিজিটাল ফর্মে পাওয়া যাচ্ছে এবং সময় সময় এগুলো হালনাগাদ করা হচ্ছে। বেসরকারি খাতের ব্যাংক, বীমা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির সেবা সত্যিই চোখে পড়ার মতো। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, এজেন্ট ব্যাংকিং, এটিএম সেবা, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ইফটি ও ব্যাচ সিস্টেমের মাধ্যমে একই দিন চেকের লেনদেন নিষ্পন্ন হওয়া ইত্যাদি ডিজিটাল প্রযুক্তির সেবা শহর বন্দর ও গ্রামে বসেও পাওয়া যাচ্ছে। আশার কথা হচ্ছে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছে। এ ফ্রিল্যান্সারদের কথা ভেবে তাদের উন্নয়নে এবং দেশের তরুণদের এ মুক্তপেশায় উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সহায়তা করার প্ল্যাটফরম করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশের প্রায় ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সারকে পরিচয়পত্র দিতে কাজ শুরু করেছে সরকার। ইতোমধ্যে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একটি ‘ফ্রি কার্ড’ চালু করেছে এবং সে কার্ডের নাম দেওয়া হয়েছে ফ্রি কার্ড। ফ্রিল্যান্সারদের এ পরিচয়পত্র বা ফ্রি কার্ডে ব্যক্তিগত তথ্য, মোবাইল নম্বরসহ বিশেষ কোড থাকছে। সরকার তথ্যপ্রযুক্তিতে রপ্তানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এবং একটা বড় ক্ষেত্র হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং। বর্তমান পুরো পৃথিবীতে এ মুহূর্তে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের মার্কেট যেটি আইটি ফ্রিল্যান্সারদের দখলে। হতাশার খবর হচ্ছে ওকলা’স স্পিডটেস্ট গ্লোবাল ইনডেক্সের মতে, মোবাইল ডাটার গতির হিসাবে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান শুধু আফগানিস্তানের ওপরে। ১৩৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩। বাংলাদেশে মোবাইল ডাটার ডাউনলোড গতি প্রতি সেকেন্ডে ১০.৭৬ মেগাবাইট (এমবিপিএস) অথচ বিশ্বে গড় গতি ছিল ৩৫.২৬ এমবিপিএস। মোবাইল ইন্টারনেট গতির হিসাবে দক্ষিণ এশিয়ায় মালদ্বীপের অবস্থান সবার ওপরে এবং দেশটির অবস্থান ৫৭। তবে ব্রডব্র্যান্ড ইন্টারনেট গতির হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো। তালিকায় ১৭৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৮ এবং ডাউনলোড গতি ২৯.৮৫ এমবিপিএস, আপলোড গতি ৪৫.৭৪ এমবিপিএস এবং ল্যাটেনসি ২১ এমএস। বাংলাদেশে মোবাইল অপারেটরগুলো অনেকদিন ধরেই ৪জি গতির ইন্টারনেট সেবা দিয়ে আসছে বলে দাবি করে। এমনকি খুব শিগগিরই তারা ইন্টারনেটের নবতম প্রযুক্তি ৫জি সেবা দেবে এমন কথাবার্তাও শোনা গেছে। অথচ মোবাইল ইন্টারনেটের গতির দিক দিয়ে ভারত কিংবা পাকিস্তানের থেকে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু বাংলাদেশের চাইতে কম গতির ইন্টারনেট রয়েছে আফগানিস্তানে। এমনকি আফ্রিকার দরিদ্র দেশ বলে পরিচিত ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ার চাইতেও খারাপ অবস্থা বাংলাদেশের। ইন্টারনেট গতির কারণে আমরা নানা ধরনের ব্যবসা বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়ছি এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ। গত এক দশকে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। এই খাতে দেশকে আরো এগিয়ে নিতে নেওয়া হচ্ছে নানা ধরনের পরিকল্পনা। তা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ অনেক পেছনে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায়ও বাংলাদেশের অবস্থান মাঝামাঝি পর্যায়ে। ইউরোপীয় সেন্টার ফর ডিজিটাল কম্পিটিটিভনেসের ‘ডিজিটাল রাইজার রিপোর্ট’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। বাংলাদেশের আগে রয়েছে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও নেপাল। তবে প্রতিবেশী ভারত রয়েছে বাংলাদেশেরও পেছনে। তবে এটাও সত্য, তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি একেবারেই সাম্প্রতিক। আর এই ক্ষেত্রটি যেহেতু অতিমাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর, এক্ষেত্রে এগোতেও সময় লাগবে। ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার এবং এ ক্ষেত্রে মেধাসম্পন্ন তরুণদের বেশি সংখ্যায় বেরিয়ে আসার ওপর এই খাতের সাফল্য অনেকটাই নির্ভরশীল। আবার কিছু ক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে আমাদের আরো ভালো করা উচিত ছিল; কিন্তু তা হয়নি। উপরোক্ত প্রতিবেদন তৈরিতে দেশগুলোর দুটি ভিত্তির মাধ্যমে বিগত তিন বছরের ডিজিটাল প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বিবেচনা করা হয়েছে। এর একটি হলো ইকোসিস্টেম, অন্যটি মাইন্ডসেট। প্রতিটির অধীনে রয়েছে পাঁচটি করে সূচক। ইকোসিস্টেমের অধীন পাঁচটি সূচক হলো পুঁজির সহজলভ্যতা, ব্যবসা শুরু করার খরচ, ব্যবসা শুরুর সময়, বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ কতটা সহজ, স্নাতক ডিগ্রিধারীদের দক্ষতা। আর মাইন্ডসেটের অধীন পাঁচটি সূচক হলো-জনগণের ডিজিটাল দক্ষতা, উদ্যোগের ঝুঁকিবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি, শ্রমশক্তির বহুমুখিতা, মোবাইল ব্রডব্যান্ড সাবস্ক্রিপশন এবং কোম্পানির উদ্ভাবনী আইডিয়া গ্রহণ। ইকোসিস্টেমে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ চতুর্থ হলেও মাইন্ডসেটে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। ভিত্তি বিবেচনায় বাংলাদেশের এই অগ্রগতি কম নয়। কিন্তু এখানেই থামলে চলবে না। মনে রাখতে হবে, বর্তমান বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তির সক্ষমতায়। আমাদেরও সেই সক্ষমতা থাকতে হবে। এ জন্য আমাদের করণীয় নির্ধারণ করতে হবে এবং দ্রুত এগিয়ে যেতে হবে। ব্যবসা শুরুর সময় ও খরচ বিবেচনায় শুধু তথ্যপ্রযুক্তি খাতই নয়, সামগ্রিকভাবেই বাংলাদেশ অনেক পেছনে। এর একটি বড় কারণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি। এ নিয়ে অতীতে অনেক কথা হয়েছে; কিন্তু অগ্রগতি তেমন হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে এগিয়ে চলার কোনো বিকল্প নেই। দ্রুত সক্ষম জনবল ও পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরো বেশি করে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি লক্ষ রাখতে হবে, এক্ষেত্রে কোনো দুর্বলতা বা অপব্যবহার যেন জনজীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। আমরা চাই, দু-এক দশকের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, বিশ্বেই বাংলাদেশ একটি অনন্য নাম হয়ে উঠুক। লেখক : ব্যাংক কর্মকর্তা
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১