বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৮ February ২০২১

আধুনিক হচ্ছে বিচার বিভাগ

ব্যয় হবে দুই হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা


আধুনিক হচ্ছে দেশের বিচার বিভাগ। অবসান হবে মান্ধাতা আমলের সিস্টেম। ই-জুডিশিয়ারির ফলে শুধু ভার্চুয়াল কোর্টই নয়, সবকিছুই এক সময় পেপারলেস হয়ে যাবে। মামলা দায়ের থেকে শুরু করে আদেশ বা রায়ের অনুলিপি সবই মিলবে অনলাইনে। এতে কমবে মামলার জট, বাড়বে নিষ্পত্তির হার। জনগণ দ্রুত বিচার পাবে। কমবে নাগরিক ভোগান্তি। 

বর্তমান সরকার বিচার বিভাগ আধুনিকায়নের যে উদ্যোগ নিয়েছে তার অংশ হিসেবে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। সেটি এখন প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) দপ্তরে। পিইসি থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। ২০২০ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের জুন মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৮৭৮ কোটি টাকারও বেশি, যার সম্পূর্ণ অর্থায়ন করবে সরকার।

ই-জুডিশিয়ারি শীর্ষক এ প্রকল্পের সারা দেশে প্রায় দেড় হাজারের বেশি এজলাসকে আধুনিক এজলাসে রূপান্তরিত করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে মামলা দায়ের থেকে শুরু করে আদেশ বা রায়ের অনুলিপি সবই মিলবে অনলাইনে। এতে মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়বে এবং জনগণ দ্রুত বিচার পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এ প্রকল্প বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তা দেবে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস)। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে যুগোপযোগী ভার্চুয়াল পদ্ধতির সর্বোচ্চ বিস্তার ঘটানো সম্ভব হবে। যার সুফল পাবেন বিচারপ্রার্থীরা। ই-জুডিশিয়ারি ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হলে দেশের আদালতগুলোতে অনেক দ্রুত বিচার নিশ্চিত হবে। কমবে নাগরিকদের ভোগান্তি। 

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এর আওতায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট থেকে শুরু করে নিম্ন (বিচারিক) আদালত এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ভার্চুয়াল পদ্ধতির আওতায় আনা হবে। আদালত এবং কারাগারে আটক ও অভিযুক্তদের মধ্যে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়া পরিচালনা, একটি স্বয়ংক্রিয় বিচারিক ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম চালুর জন্য সারা দেশে ই-কোর্ট রুম স্থাপন এবং বিচারক, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আইনজীবীদের তথ্যপ্রযুক্তিগত জ্ঞান বাড়ানো হবে। এজন্য সুপ্রিম কোর্টে সেন্ট্রাল ডাটা সেন্টার স্থাপনের পাশাপাশি ৬৪ জেলায় মাইক্রো ডাটা সেন্টার স্থাপন করা হবে।

এছাড়া প্রকল্পের কার্যক্রমে যেসব বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে আইন ও বিচার বিভাগের ডাটা সেন্টার আপগ্রেডেশন ও নেটওয়ার্ক অপারেটর সেন্টার স্থাপন, বিচার ব্যবস্থার সব অফিসের জন্য ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) স্থাপন, বিচার ব্যবস্থার জন্য এন্টারপ্রাইজ আর্কিটেকচার উন্নয়ন এবং এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্লানিং (ইআরপি) সফটওয়্যার উন্নয়ন।

প্রকল্পের আওতায় বিচারকদের জন্য দুই হাজারের বেশি উন্নত মানের ল্যাপটপ বা ট্যাব ক্রয় করা হবে। একইসঙ্গে রেকর্ডরুম স্বয়ংক্রিয়করণ এবং পুরনো রেকর্ডরুম ডিজিটালাইজেশন, বায়োমেট্রিক অ্যাটেনডেন্স সিস্টেম স্থাপন, ভিডিও কনফারেন্সিং সিস্টেমের মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণ এবং ডিজিটাল অ্যাভিডেন্স রেকর্ডিং ও সেন্ট্রাল জেল টার্মিনাল স্থাপন করা হবে। ই-কোর্ট রুম তৈরির জন্য নতুন আইন প্রণয়ন ও প্রচলিত আইনগুলোর প্রয়োজনীয় সংশোধন, বিচার ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডেস্কটপ কম্পিউটার সরবরাহ এবং বিচার ব্যবস্থা ও মামলা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, সম্পূর্ণ বিচার বিভাগ ডিজিটালাইজড হয়ে যাবে। ফলে দ্রুত বিচার শেষ করতে পারব। ই-জুডিশিয়ারি হলে শুধু ভার্চুয়াল কোর্টই নয়, সবকিছুই পেপারলেস হয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, মামলা জট আর হবে না। প্রায়ই দেখা যায়, অনেক মামলা হয় শুধু প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর জন্য। কাউকে হেনস্তা করার জন্য মামলা হচ্ছে। বাদীর উদ্দেশ্য, বিবাদীকে কয়দিন জেল খাটানো যায় সেটা দেখা, এবং ভয় দেখানো। এক্ষেত্রে বিচারের শেষ দেখা আসল উদ্দেশ্য নয়। দেশে এ রকম মামলা এখন অনেক আছে, যেটা জট বৃদ্ধি করছে। ডিজিটালাইজড হলে এসব কমবে। এছাড়া জটবৃদ্ধির কারণগুলোও বুঝতে পারব এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।

তিনি আরো বলেন, মোবাইল ফোন হওয়ায় আমাদের যে উপকার হয়েছে, বিচার বিভাগ ডিজিটালাইজেশনের হলে তেমনই উপকার হবে। বিচার বিভাগের অনেকগুলো বিষয় জড়িয়ে আছে, তাই ই-জুডিশিয়ারি করা হচ্ছে। এর মধ্যে কোর্ট ম্যানেজমেন্টসহ অন্যান্য সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকবে।

এ বিষয়ে মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, প্রকল্প নিয়ে পুরোপুরি কোনো তথ্য এখনো পাইনি। তবে আইনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ যদি গণদরদি, গণমুখী না হয় এবং বিচারক যদি নিজের স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখতে না পারেন, তাহলে মেগা প্রজেক্ট দেখার জন্য ভালো হবে, কিন্তু তা জনগণের কল্যাণ আসবে না।

তিনি আরো বলেন, গণমুখী বিচার ব্যবস্থা করতে হলে একদিকে যেমন দরিদ্র-দরদি ও দরিদ্রবান্ধব বিচারক দরকার তেমনি মান্ধাতা আমলের আইনগুলোর পরিবর্তন দরকার। আইনগুলো যেন জনগণের স্বার্থবিরোধী না হয় এবং তা বিশ্লেষণের জন্য দরকার দক্ষ বিচারকের। আইনের এই শিক্ষক আরো বলেন, ন্যায়বিচারের জন্য ন্যায়বিচার বোধসম্পন্ন দক্ষ বিচারক দরকার। প্রকল্পে বিচারক ও অন্যদের প্রশিক্ষণের জন্য কত বরাদ্দ রাখা হয়েছে সেটার চাইতে প্রশিক্ষণে অর্থ খরচ করা হবে কি না, সেটাই মূল কথা। শুধু নামকাওয়াস্তে প্রশিক্ষণ হলে হবে না।

বিচারক প্রশিক্ষণ ইনস্টিস্টিউট যেমন বাংলাদেশে আছে, তেমনি ভারতের ভুপালেও আছে। দুটোর মধ্যে কীভাবে কী ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং দুটোর প্রক্রিয়া যদি তুলনা করা হয় তাহলে বাস্তবতা বোঝা যাবে। তারা বিচার কীভাবে আরো উন্নত করা যায় সেটি নিয়ে কাজ করছে। ভারতের জুডিশিয়াল ট্রেনিং একাডেমির প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, তাদের কারিকুলাম দেখেন, সেখানে বিচারকরা কীভাবে বিচারগুলো করছে এবং সিদ্ধান্ত দিচ্ছে সেগুলো দেখতে হবে। এ ছাড়া সেগুলোকে কীভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ-সমালোচনা করে আরো ভালো হতে পারত বলে মতামত দেওয়া যায় সেভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ই-জুডিশিয়ারি ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হলে দেশের আদালতগুলোতে অনেক দ্রুত বিচার নিশ্চিত হবে। নাগরিকদের ভোগান্তি কমবে। ই-জুডিশিয়ারি চালু হলে বিচারের সময় দুর্নীতির যেসব অভিযোগ আছে, সেসব থেকে আমরা অনেকাংশেই মুক্তি পাব। সাক্ষ্য-প্রমাণ সংরক্ষণের ব্যবস্থা আরো উন্নত হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি বিচার বিভাগে ডিজিটালাইজেশন করা যায়, তাহলে বিচার ব্যবস্থার জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।

উল্লেখ্য, করোনা সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে গত বছরের ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশে নিয়মিত আদালত বন্ধ রাখা হয়। এ অবস্থায় বিচারপ্রার্থীদের কথা বিবেচনা করে ভার্চুয়াল আদালত পদ্ধতি চালু করা হয়। ৯ মে এ বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করে বিল আকারে জাতীয় সংসদে পাস করা হয়। অধ্যাদেশ জারির পর ১১ মে থেকে সারা দেশে ভার্চুয়াল আদালত কার্যক্রম শুরু হয়, যা অব্যাহত রয়েছে। গত ১২ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাজেট বক্তৃতায় সংসদে বলেন, নিম্ন আদালতগুলোকে আইসিটি নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। প্রতিটি আদালত ই-কোর্ট রুমে রূপান্তরিত হবে।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১