বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৬ January ২০২১

গৌরবোজ্জ্বল ছাত্রসমাজ


আপামর জনতার সক্রিয় অংশগ্রহণই ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রাণ। তবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল অহংকার করার মতো। একক গোষ্ঠী হিসেবে ছাত্রদের সংখ্যা ছিল বেশি। গোটা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা।

বলা যায়, দেশের সব আন্দোলনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে এ দেশের ছাত্রসমাজ। মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রদের অবদানের কথা বলতে গেলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিজয়ী বেশে অস্ত্র হাতে স্লোগানরত ছাত্রদের একটি অবিস্মরণীয় ছবি।

বাংলাদেশে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ ও ৬৪ সালের শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ছয় দফার আন্দোলন, ১৯৬৮ সালে ১১ দফার আন্দোলন, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভ্যানগার্ড হিসেবে তৎকালীন ছাত্রসমাজের ভূমিকা অপরিসীম। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় অংশ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের প্রথম দিন থেকেই উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। ১ মার্চ দুপুরে ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চের অনুষ্ঠিতব্য অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা দেওয়ার পরপরই ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে ছাত্ররাও পথে নেমে আসে। তারা স্লোগান দেন ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথ। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ থেকে শুরু করে জাতীয় নেতাদের পথচলার পেছনে ছাত্রনেতাদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। ছাত্রসমাজ মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র সংগ্রামে কৃষক, শ্রমিক, মজুরদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে।

২ মার্চ ছাত্রলীগের ডাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। লাখো জনতার উপস্থিতিতে সেদিন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। বাংলাদেশের পতাকা প্রথম উত্তোলন করেন ছাত্ররাই। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ডাকসুর ভিপি আ স ম আবদুর রব স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করেন। ২ মার্চ ছাত্র ইউনিয়নও অভিন্ন দাবিতে বিশাল জনসভা করে। এভাবে প্রতিদিন ছাত্ররা বিশাল বিশাল কর্মসূচি দিয়ে সারা দেশের জনগণকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে উদ্বুদ্ধ করে। ছাত্রলীগ পূর্ব পাকিস্তানের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা বন্ধ রাখার আহ্বান জানায়। ৩ মার্চের পর ৪, ৫ ও ৬ মার্চ সকাল ৮টা থেকে ২টা পর্যন্ত হরতাল পালিত হয়। ৩ মার্চের জনসভার পর বঙ্গবন্ধু আর কোনো জনসভায় বক্তব্য দিতে পারবেন কি না এই সন্দেহে তিনি বলেন, ‘হয়তো এটাই আমার শেষ ভাষণ। আমি যদি নাও থাকি আন্দোলন যেন থেমে না থাকে। বাঙালির স্বাধীনতার আন্দোলন যাতে না থামে।’

এদিন ছাত্রলীগ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করে। ৭ মার্চ ছাত্র ইউনিয়ন যুদ্ধ করার জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ শুরু করে। ১৯ মার্চ তারা স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবিতে প্রচারপত্র বিতরণ শুরু করে। ২০ মার্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্র ইউনিয়নের শত শত গণবাহিনী ডামি রাইফেল নিয়ে মার্চপাস্ট করে।

বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির বহুল পরিচিত চার খলিফা ছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, আবদুল কুদ্দুস মাখন। এছাড়া তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন এবং ওই সময়ের অন্যসব জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের ছাত্রনেতারা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের হত্যা করে, তখন বাংলাদেশের মানুষের হূদয়ে যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল, তা সশস্ত্র সংগ্রামকে আরো বেগবান করেছিল। যুদ্ধের ৯ মাসে ছাত্রসমাজ সারা বাংলায় ছড়িয়ে থেকে বাংলার মানুষকে সাহস জুগিয়েছে, সব বাধা মোকাবিলা করে বিজয়ের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর স্বপ্নে মানুষকে বিভোর রেখেছে।

মুক্তিযুদ্ধকালে অসংখ্য ছাত্র বিভিন্নভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যায়। সেখানে বিভিন্ন শিবিরে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশে ফিরে ঝাঁপিয়ে পড়েন পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধে একটি বিশেষ গেরিলা গ্রুপ ছিল ‘ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনী’। এ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বেতিয়ারা গ্রামে শহীদ হন বিভিন্ন এলাকায় ৯ ছাত্র যোদ্ধা। এছাড়া অনেক ছাত্র দখলদার পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে শহীদ হন। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক শামীম তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের প্রায় ২৮ হাজার নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন।

একাত্তর সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই সচেতন ছাত্রসমাজ স্বাধীনতার জন্য কাজ করে আসছিল। ছাত্রনেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রবদের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ স্লোগানে-মিছিলে আওয়াজ তুলে ছাত্রসমাজই সারাদেশে মানুষের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জাগরণ তৈরি করেছিল।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১