আপডেট : ২১ June ২০২০
পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় ভ্রমণে আসা পর্যটক ও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা চিন্তা করে হাসপাতাল ২০১২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পটুয়াখালীর কুয়াকাটার ২০ শয্যা উদ্ধোধন করেন। উদ্ধোধনের আট বছরেই হাসপাতালটির আধুনিক ভবনের ভেতরে এখন ভুতুড়ে অবস্থা। আর হাসপাতালের বাইরে এখন গোচারণ ভূমি। সর্বত্রই ময়লা আবর্জনার স্তুপ। ভেতরে খসে পড়ছে ছাদের পলেস্তারা। বর্ষায় পানি জমে গেছে গোটা ভবনের ফ্লোরে। দেয়ালে শ্যাওলার স্তুপ জমতে জমতে ভেতরেই জন্ম নিচ্ছে বিভিন্ন উদ্ভিদ। জনবল সংকট ও অব্যবস্থাপনায় হাসপাতালে বন্ধ হয়ে গেছে ইনডোরের চিকিৎসা সেবা। রোগীর চিকিৎসার জন্য ২০ বেডের এই হাসপাতাল ঘুরে খুঁজে পাওয়া যায়নি একটি শয্যা। আর অপারেশন থিয়েটার, ল্যাবরেটরিসহ বিভিন্ন আধুনিক সরঞ্জামাদির কক্ষ না খুলতে খুলতে তালায় মরিচা পড়ে গেছে। কক্ষগুলোতে মাকড়শার জাল ও ধুলোর স্তর দেখে সহজেই যেকেউ বুঝতে পারবে বছরের পর বছর ধরে এভাবেই অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে হাসপাতালটি। যদিও আবাসিক মেডিকেল অফিসার জনবল সংকটের কারণে ইনডোরে চিকিৎসা সেবা বন্ধ রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন। কুয়াকাটা হাসপাতালের রেজিস্টার খুঁজে দেখা যায় জুন মাসের এক তারিখ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত মাত্র ১০৮ জন রোগী জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। যার অধিকাংশ হাতে,পায়ে মাথায় আঘাত ও দুর্ঘটনাজনিত। রেজিস্টারে সর্বশেষ কবে ইনডোরে রোগী ভর্তি করেছেন তার হিসেব নেই। বাস্তব চিত্র একই। ভর্তি রোগীদের ভবনের দ্বিতীয় তলার যে কক্ষে রাখা হয় সেখানে একটি শয্যাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। গোটা হাসপাতালটিই যেন শুনশান নিরব। রোগীদের ব্যবহারের টয়লেট,বাথরুমের ময়লার স্তুপ জমা হয়ে আছে। হাসপাতালের ছাদে, সিড়িতে ভেঙ্গে পড়ে আছে হাসপাতালে জানালা, রোগীর শয্যার ভাঙ্গা অংশ। ছাদ ও দেয়ার চুইয়ে বৃষ্টির পানি জমতে জমতে পিচ্ছিল শ্যাওলা জমে গেছে। এ কারনে কোন সুস্থ্য মানুষও ফ্লোরে হাটতে গিয়ে হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হাসপাতালের জরুরী বিভাগে দায়িত্বরত নার্স নাসিমা খাতুন চিকিৎসা সেবার এ বেহাল দশার কথা স্বীকার করে বলেন, প্রয়োজনীয় ঔষধ ও জনবল সংকটের কারনে ইনডোরে রোগী ভর্তি না দিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েই রোগীদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। গত ১৮ জুন হাসপাতালে পাওয়া যায় মাত্র দুইজন রোগী। যাদের একজন মাথায় আঘাত পেয়েছে, অপরজন হাতের সমস্যা নিয়ে এসেছেন। রাতে নিরাপত্তা প্রহরী না থাকায় জরুরী বিভাগের নার্সরাও নিজ বাসায় চলে যান। ওই সময় গোটা হাসপাতালটি দায়িত্ব পালন করেন একজন ওয়ার্ড বয। যার দায়িত্ব মাসের প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা। স্থানীয় মনির হোসেন, মো. রুবেল ও আনোয়ার জানান, হাসপাতালটি নির্মানের সময় রোগী ও রোগীর স্বজনদের কথা চিন্তা করা হাসপাতালের নিচতলার একটি সুসজ্জিত কক্ষে ব্রেস্ট ফিডিং কক্ষ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু কক্ষের অভ্যন্তরের সাজসজ্জা দেখে সহজেই বোজা যায় শিশুকে নিয়ে কোন মা এখানে প্রবেশ করেনি। একই অবস্থা ডাক্তার কক্ষ, অপারেশন থিয়েটার, ল্যাবরেটরী, ভিআইপ কক্ষগুলোর। তুলাতলী গ্রামের মিনারা বেগম, সাহানা খাতুন ও রশিদ মিয়া বলেন, হাসপাতাল নির্মাণ হওয়ার পর এখানে রোগীদের ভিড় থাকতো। প্রথম কয়েক মাস পাঁচজন ডাক্তার নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতেন। রোগী ও রোগীর স্বজনদের ভীড় লেগেই থাকতো হাসপাতালে। কিন্তু চিকিৎসক ও নার্স সংকটের কারণে হাসপাতালটি ভুতুড়ে অবস্থা বিরাজ করছে। দু’একজন রোগী আসলেও তাদের জরুরী বিভাগ দিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয। যেসব রোগী একটু গুরুতর অসুস্থ্য তাদের রেফার করা হয় কলাপাড়া, পটুয়াখালী ও বরিশাল হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতালের নিজস্ব এ্যাম্বুলেন্স না থাকায় গুরুতর অসুস্থ্য রোগীকে অন্য হাসপাতালে নিতে গিয়ে প্রায়ই পথিমধ্যে রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, কুয়াকাটা হাসপাতালে মোট ২৫ পদের বিপরীতে ডাক্তারের পদ রয়েছে ছয়জন। দায়িত্ব পালন করছেন একজন ডাক্তার। নার্সের ছয় পদ থাকলেও দায়িত্ব পালন করছেন তিন জন। এছাড়া রয়েছে মাত্র একজন ওয়ার্ড বয়। গোটা হাসপাতালে খুঁজে পাওয়া যায় এই পাঁচজনকেই। যদিও আরও দুইজন ডাক্তার ও দুইজন নার্স কাগজ কলমে এই হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। হাসপাতালের এ দুরাবস্থা নিয়ে কুয়াকাটা পৌর মেয়র আব্দুল বারেক মোল্লা বলেন, উদ্বোধনের পরই ভালোই চিকিৎসা সেবা দিচ্ছিলেন চিকিৎসকরা। কিন্তু গত সাত বছর ধরে হাসপাতালে ডাক্তার না থাকায় এখানে কোন চিকিৎসা সেবাই পাচ্ছে না রোগীরা। কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্রে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক ভ্রমনে আসে। সাগরে মাছ শিকারে গিয়ে প্রায়ই জলদস্যুদের হামলা কিংবা ট্রলার ডুবিতে জেলেরা আহত হয়। তারা এখানে চিকিৎসা নিতে আসলেও কোন চিকিৎসা সরঞ্জামাদি, ডাক্তার ও লোকবল না থ্কাায় হাসপাতালেই অনেক রোগী মারা যায়। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ আরিফুর রহমান চিকিৎসা সেবার এ বেহাল দশার কথা স্বীকার করে বলেন, তিন প্রায় চার মাস একা দয়িত্ব পালন করেছেন। হাসপাতালে ওষুধ সংকট, জনবল সংকট রয়েছে। আবাসিক ভবন ও হাসপাতাল ভবনের নাজুক অবস্থা। রাতে নিরাপত্তা প্রহরী না থাকায় হাসপাতালে রোগী ভর্তি দেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে হাসপাতালের রোগীদের শয্যাগুলো পটুয়াখালী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এলাকাবাসী ও জনপ্রতিনিধিরা দাবি করেন, দেশের এই দুঃসময়ে করোনা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে অনেক বড় বড় হাসপাতাল অন্য রোগীদের ঠিকমতো চিকিৎসা সেবা দিতে পারছে না। এই সময়ে উপকূলীয় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা চিন্তা করে কুয়াকাটা হাসপাতালে কিছু জনবল ও ডাক্তার নিয়োগ করলে এই হাসপাতাল থেকে মানুষ চিকিৎসা সেবা পেতো।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১