বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০১ March ২০২০

রাজধানীতে বেড়েছে ছিনতাই, টার্গেট নারীরা

এক দিনের অভিযানে গ্রেপ্তার ৪২


রাজধানীতে ফের বেড়েছে ছিনতাই। গতকাল শনিবার ভোরে কমলাপুর রেলস্টেশন যাওয়ার পথে মুগদায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে নিহত হন তারিনা বেগম লিপি (৩৮) নামের এক গৃহবধূ। তার স্বামী গোলাম কিবরিয়া জানিয়েছেন, গ্রামের বাড়ি সিলেট যাওয়ার উদ্দেশে দুটি রিকশায় কমলাপুর রেলস্টেশনে যাচ্ছিলেন তারা। একটি রিকশায় তিনি ও মেয়ে। অন্য রিকশায় ছিলেন লিপি ও ছেলে। ইউনিক বাস কাউন্টারের সামনে প্রাইভেট কারে আসা ছিনতাইকারীরা স্ত্রীর ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তিনি রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর অন্তত অর্ধশত স্থানে নিয়মিত ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে নগরবাসী। তিন-চারজন দল বেঁধে মানুষকে টার্গেট করে চলে ছিনতাই। নারীরাই তাদের প্রধান টার্গেট। ঝামেলা এড়াতে বেশির ভাগ ভুক্তভোগী মামলা করেন না। ফলে এদের ধরা কষ্টসাধ্য বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

এদিকে গতকাল সকাল পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘণ্টায় ছিনতাইবিরোধী বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৪২ জনকে গ্রেপ্তারের দাবি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগ (ডিবি-ডিএমপি)। গতকাল দুপুরে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেন এ তথ্য জানান।

এ সময় ছিনতাইয়ের মালামালও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এক সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয়, আটক ছিনতাইকারীদের কাছ থেকে ৭৪টি বিভিন্ন ব্যান্ডের মোবাইল ফোন, একটি ট্যাব, দুটি ল্যাপটপ, ১৩টি ছুরি, দুটি চাপাতি জব্দ করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।

রাজধানীর উত্তরায় সম্প্রতি একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ধরা পড়ে সেখানকার সিসিটিভি ক্যামেরায়। এই ছিনতাইয়ের পেছনে কাজ করেছে তিনজন। দুজন বাইক নিয়ে রাস্তা আটকে এক নারীর কাছে থাকা সব নিয়ে পালিয়ে যায়। আর অন্যজন দূর থেকে তাদের অনুসরণ করে। সুবিধা-অসুবিধা ইশারায় জানান দেয়।

সিসিটিভির ফুটেজ ও প্রযুক্তির সহায়তায় এই চক্রের তিনজনকেই গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ছিনতাইয়ের কথা স্বীকারও করে তারা। রাজধানীর বিভিন্ন এলকায় এমন অন্তত ৫০টি ছিনতাইয়ের স্পট রয়েছে। সেখানে দুই-তিনজন গ্রুপ করে ছিনতাই করে। নিরিবিলি জায়গায় ভোরবেলা একা মানুষ পেলেই অস্ত্র ঠেকিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নেয় এরা। আর যারা নেশাখোর, তারা বেশির ভাগই মোবাইল ফোন ছিনতাই করে।

পুলিশ বলছে, নতুন নতুন স্পটে ছিনতাই করে। নারীরা তাদের প্রধান টার্গেট। অন্য একটি গ্রুপ উবার, পাঠাওয়ের যাত্রী সেজে ছিনতাই, এমনকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটাচ্ছে বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে বেশির ভাগ ভুক্তভোগী মামলা করতে আসেন না।

রাজধানীতে ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, এ কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৪২ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। এ সময় ছিনতাই করা ৭৪টি বিভিন্ন ব্যান্ডের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। তিনি বলেন, রাজধানীতে ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার কারণে গত শুক্রবার থেকে গতকাল পর্যন্ত ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সব টিম একযোগে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এ অভিযান চালায়। মোবাইল ফোন ছিনতাই রোধে রাজধানীতে মোবাইল ফোন মেরামতের দোকানগুলোতেও নজরদারি করা হবে বলে জানান তিনি।

আবদুল বাতেন বলেন, ‘রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার রাস্তায় পর্যাপ্ত লাইট নেই। যেসব ল্যাম্পপোস্ট আছে সেগুলো বেশির ভাগ নষ্ট। এর জন্য গলিপথগুলো অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে। এতে ওই সব এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। যেসব এলাকায় এমন অবস্থা, সেখানে আমাদের দায়িত্বশীলদের নজর দেওয়া দরকার। নগরবাসীকেও ওই সব এলাকা দিয়ে চলাচলের সময় সতকর্তা অবলম্বন করতে হবে।’

ডিবির এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ছিনতাইকারীরা সুযোগ পেলেই ছিনতাই করে। তাদের আইনের আওতায় এনে সাজার ব্যবস্থা না করা হলে অপরাধ কমানো সম্ভব হবে না। বেশির ভাগ সময় বাস-লঞ্চ টার্মিনাল এবং অন্ধকার গলিতে ছিনতাই হয়ে থাকে। আর সেটা গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত।

আবদুল বাতেন বলেন, ‘বসুন্ধরা সিটি শপিং মল, মোতালেব প্লাজাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মোবাইল ফোন মেরামত দোকানের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ছিনতাই হওয়া মোবাইল কোথায় যায়, এটা নিয়ে তদন্ত করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, ছোটখাটো যেসব মোবাইল পার্টসের দোকান আছে, তারা এসব চোরাই মোবাইল কিনে থাকে। বসুন্ধরা, মোতালেব প্লাজার অনেক দোকানদার এসব চোরাই মোবাইল কেনে। এসব মোবাইল সরাসরি মানুষের কাছে বিক্রি করে না। বিশেষ করে কারো মোবাইল নষ্ট হয়ে গেলে চোরাই মোবাইলের পার্টস খুলে বিক্রি করা হয়। এসব পার্টস বিক্রি করলে যে লাভ হয়, তা মোবাইল বিক্রি করলেও হয় না। চোরাই মোবাইলের বিক্রি ও কেনার সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের আমরা চিহ্নিত করেছি। অচিরেই সেসব জায়গায় অভিযান চালানো হবে।’

মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত ছিনতাই বেশি হয়, এ জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, জানতে চাইলে আবদুল বাতেন বলেন, ‘যে সময়গুলোতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটে, তা বন্ধ করতে আমরা বাস ও লঞ্চ টার্মিনালগুলোতে পেট্রল জোরদার করব। সঙ্গে গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হবে। বিশেষ করে ওই সব এলাকায় চিহ্নিত ছিনতাইকারী যারা, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

গতকাল ভোরে কমলাপুরে রেলস্টেশনের কাছে ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার সময় রিকশা থেকে পড়ে তারিনা বেগমের মৃত্যুর বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, ‘আমরা বিষয়টি অনুসন্ধান করছি। এ ব্যাপারে মামলা হবে। যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা অবশ্যই আইনের আওতায় আসবে।’

ছিনতাইয়ের ঘটনায় নগরবাসী মামলা করতে নিরুৎসাহিত হয়, এর পেছনে পুলিশের দায় আছে কি না, এমন প্রশ্নে আবদুল বাতেন বলেন, ‘দায় বললে হবে না, এটা দায়িত্বশীলতা। নাগরিক হিসেবে আপনার দায়িত্ব, কোথাও কোনো অপরাধ হলে তা থানায় গিয়ে অভিযোগ দেওয়া। এ ছাড়া পুলিশের পক্ষে সম্ভব হয় না অপরাধ সম্পর্কে জানা কিংবা অপরাধীকে শনাক্ত করা। নগরবাসীকে বলতে চাই, আপনারা থানায় যাবেন, অভিযোগ দেবেন। থানা যদি মামলা বা অভিযোগ নিতে অপারগতা প্রকাশ করে আমাদের ঊর্ধ্বতনদের জানাবেন। তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১