বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২৮ May ২০১৯

কক্সবাজারে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং


দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে কক্সবাজারের কিশোর অপরাধীরা। শহর কিংবা গ্রাম সবখানেই এখন ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে কিশোর বয়সের অপরাধীরা। আর ঈদ সামনে রেখে এখন আরো বেপরোয়া বিভিন্ন এলাকার উঠতি বয়সের গ্রুপভিত্তিক তরুণরা।

মূলত এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, নিজেদের মধ্যে গ্রুপ গঠন, অনেক সময় বান্ধবী নিয়ে ঝগড়া ইত্যাদি করে বড় বড় অপরাধ সংঘটিত করছে কিশোর বয়সের ছেলেরা। পরিবারের সচেতনতার অভাবে এবং পাড়ার কিছু অসৎ ব্যক্তি নিজের সুবিধার জন্য এসব উঠতি বয়সের ছেলেদের ব্যবহার করার কারণেই তাদের ভেতরে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

গত শনিবার (২৫ মে) রাত সাড়ে ১০টার দিকে শহরের কুরালরীফ মার্কেটের সামনের একটি ঘটনায় বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। হঠাৎ ১০/১২টি  মোটরসাইকেল নিয়ে আসা অন্তত ২০ জনের বেশি কিশোর যাদের বেশিরভাগেরই বয়স ১৬ বছরের কাছাকাছি তারা তড়িঘড়ি করে নেমে মার্কেটের ভেতরে-বাইরে কাউকে যেন খুঁজছে। পরে খবর নিয়ে জানা গেছে এর আগে এই গ্রুপের একজনকে আরেক গ্রুপের ছেলেরা নাজেহাল করেছে। তাই পাড়ায় খবর দিয়ে গ্রুপ নিয়ে এসে প্রতিপক্ষের কিশোরদের খুঁজতে এসেছে। তবে ভাগ্য ভালো ততক্ষণে আরেক পক্ষ স্থান ত্যাগ করেছে।

কালুর দোকান এলাকার ব্যবসায়ী নাছির উদ্দিন বলেন, এখন সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হচ্ছে উঠতি বয়সের তরুণরা। তাদের চলাফেরা এবং কথাবার্তা দেখলে মনে হয় আমরা অন্য গ্রহের বাসিন্দা। প্রায় সময় দেখা যায় কয়েকজন তরুণ মোটরসাইকেল নিয়ে এলাকায় ঘোরাঘুরি করে, আবার আরেক পক্ষের সাথে উচ্চস্বরে বািবতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ছে। ভয়ে কেউ তাদের সাথে কথা বলে না। তবে আমার কাছে মনে হয় মাদকের অবৈধ টাকা এবং এলাকার বড় ভাইদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে দিন দিন বেশি অপরাধী হয়ে উঠছে এসব কিশোর বয়সীরা।

জেলার চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুল করিম সাঈদী বলেন, এটা সত্যি এলাকায় কিছু উঠতি বয়সের তরুণ বা কিশোররা বড় বড় অপরাধ করছে। বিশেষ করে গত ২৫ মে রাতে চকরিয়ার একটি মার্কেটে অপ্রীতিকর ঘটনা নিয়ে এক স্কুলছাত্র আনাস ইব্রাহিমকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। আমি নিশ্চিত এরকম ঘটনা অনেক জায়গায় ঘটছে।

উপজেলা চেয়ারম্যান জানান, মূলত পারিবারিক অসেচতনতার কারণে ছাত্ররা বকে যায়। স্কুল-কলেজে পড়াকালীন শিক্ষার্থীরা কোথায় যায়, কার সাথে মিশে সেটা অভিভাবকরা খেয়াল রাখেন না। অনেক অভিভাবক আছে ১০ বছরেও একবার ছেলের স্কুলে বা কলেজে গিয়ে খোঁজ নেয়নি ছেলে নিয়মিত স্কুলে আসে কি না বা ছাত্র হিসেবে কেমন। তাই আমি সবার প্রতি আহ্বান জানাতে চাই উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের প্রতি বেশি করে নজর দেওয়া দরকার।

ঝিলংজা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান টিপু সুলতান বলেন, আগে আমরা মুরব্বি দেখলে একটু সমিহ করতাম এবং পাড়ার মুরব্বিদের পরামর্শ মেনে চলার চেষ্টা করতাম। কিন্তু এখনকার ছেলেরা মুরব্বি মানে না বরং কোনো পরামর্শ দিলে সেটা কর্ণপাত করে না। এখন মোবাইল বা ফেসবুকের যুগ, সব কিছু ডিজিটাল হয়ে গেছে। আর বেশির ভাগ সময় দেখা যায় অপরাধপ্রবণতা তাদেরই বেশি যাদের পরিবার আগে থেকেই অপরাধী ছিল। ভালো মানুষের বা ভালো বংশের ছেলেরা খুব কম অপরাধী হয়।

এ ইউপি চেয়ারম্যান আরো বলেন, তারাই বেশি মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় বাহাদুরি করে, অথচ খোঁজ নিলে দেখা যায় তাদের ঘরে খাবারের ভাতও ঠিকমতো নেই। তবে এটা সত্য যে ইদানীং কিশোর বয়সের ছেলেদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে। আগে ক্লাব বা গ্রুপ দেখতাম শহরে বন্দরে। এখন সেই প্রথা গ্রামেও চলে এসেছে। ফলে বিভিন্ন গ্রুপ একে অপর প্রুপের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে সামান্য কারণে ঝগড়া বাধায়। সঙ্গে সঙ্গে ঝগড়া করতে আসে ১৫/২০ জনের গ্রুপ। তাদের সাথে থাকে দেশি-বিদেশি অস্ত্র। সব চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে তারা কাউকে পাত্তা দিতে চায় না। কাউকে মানেও না।

রামু চৌমুহনীর বিশিষ্ট ব্যবসায়ী প্রকাশ সিকদার বলেন, রামুতেও কিশোর বয়সের অপরাধীদের দৌরাত্ম্য সীমাহীন বেড়েছে। কোনো পানের দোকানে সামান্য পান ক্রয় নিয়েও কোনো ঘটনা হলে ১০/২০ জন আসে সেটা নিয়ে ঝগড়া করার জন্য।

প্রকাশ সিকদার বলেন, তবে আমার জানামতে বেশিরভাগ সময় এসব কিশোর বয়সী ছেলে তাদের মেয়ে বন্ধু বা বান্ধবী নিয়ে বিরোধে জড়ায়। সেটা নিয়ে একে অপরের মধ্যে মারপিট, হামলা-পাল্টা হামলা এ ধরনের অনেক ঘটনা দেখেছি।

আবার সেখানে অনেক রাজনৈতিক নেতাও জড়িয়ে রাজনৈতিক রং মাখিয়ে সেই ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন। আমি একটি জিনিস বুঝি না, এত ছোট বয়সের ছেলেদের হাতে এত নগদ টাকা আসে কীভাবে?

মূলত চাহিদার চেয়ে বেশি টাকাপয়সা এবং ক্ষমতা কিশোর বয়সে তাদের অপরাধী করে তুলছে। এ জন্য শুধু পুলিশ নয়, সমাজ এবং রাষ্ট্রেরও অনেক ভূমিকা রাখার আছে।

কক্সবাজার সিটি কলেজের অধ্যাপক জেবুন্নেছা বলেন, তরুণ বা কিশোর বয়সটি হচ্ছে জীবনের সোনালি সময়। এই সময়টাই জীবনকে বলে দেয় সে ভবিষ্যতে কোন দিকে যাবে। কিশোর অপরাধ আসলে একদিনে হয় না। আমি মনে করি একজন স্কুল ছাত্র যখন কোনো নেতার বাড়িতে যায় তখন সেই নেতার জিজ্ঞেস করা উচিত তুমি স্কুলের পড়া শেষ করেছ কি না। বাস্তবতা হচ্ছে অনেকে ব্যক্তি স্বার্থে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের ব্যবহার করে। তারা পিতা-মাতার কাছ থেকে ১০০ টাকা কোনো দিন পকেট খরচ না পেলেও এলাকার বড় ভাই বা নেতাদের কাছ থেকে ১ হাজার টাকা পকেট খরচ পায়। সে জন্য ওই কিশোরটি আর পিতা-মাতার বাধ্য থাকে না। টাকার কারণে তার কাছে সবকিছুকে তুচ্ছ মনে হয়।

এ শিক্ষাবিদ বলেন, শুধু কক্সবাজার নয়, রাজধানীসহ সব জায়গাতে ইদানীং কিশোর বয়সের অপরাধীদের নিয়ে খুবই চিন্তিত। আমি নিজেও কোনো উঠতি বয়সের ছেলেদের সাথে বিনা কারণে কথা বলতে ভয় পাই। কারণ, জানি না কখন কি হয়ে যায়।

এদিকে শহরের বেশ কয়েকটি মার্কেটের ব্যবসায়ীরা বলেন, প্রতিটি মার্কেটে কিছু উঠতি বয়সের ছেলেদের সব সময় দেখা যায়, এরা আসলে কোনো ক্রেতা নয়। তারা সব সময় অযথা আড্ডা দেয় আর বিনা কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষজনকে হয়রানি করে। আবার সুবিধামতো পেলে সবকিছু ছিনিয়েও নেয়।

যেমন কয়েক দিন আগে সুপার মার্কেটের সামনে রিকশায় করে যাওয়া দুটি ছেলেমেয়েকে নামিয়ে পরিচয় জানতে চাইছে এবং বিনা কারণে তাদের হয়রানি করছিল। পরে ছেলেটি তাদের ৫০০ টাকা দিয়ে কোনোমতে রেহাই পেয়েছে। এ রকম ঘটনা প্রায় ঘটছে। বিশেষ করে গ্রাম থেকে আসা লোকজনকে বেশি হয়রানি করছে তারা।

কক্সবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর এ কে এম ফজলুল করিম চৌধুরী বলেন, অপরাধ এটা মানসিকতার ব্যাপার। যে বয়সে অনেকে অস্ত্র হাতে নেয় সে বয়সে বেশিরভাগই বই কম্পিউটার হাতে রাখার কথা। তবে কিছু পরিবেশ আছে সেটার পরিবর্তন করা গেলে এ সমস্যা থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে। প্রথমত, অভিভাবকদের সচেতনতা দরকার। আমি দেখেছি অনেক অভিভাবক ছেলে বখাটে বা সন্ত্রাসী সে জন্য নিজেকে গর্ববোধ করে। অনেক সময় ভাব নিয়ে পরিচয় দেয় আমি অমুকের বাবা। ফলে সেই ছেলে আরো বেশি অপরাধী হয়ে ওঠে। আবার পুলিশের কাছে যখন কোনো অভিযোগ যায় তখন তারা সেটাকে হালকাভাবে নেয়। ফলে তার ভেতরে আইনের প্রতি বিরূপ ধারণা জন্ম নেয়। সবচেয়ে সমস্যা হচ্ছে বখাটে বা সন্ত্রাসীদের এলাকাতে মানুষ যখন ভয়ে হলেও মর্যাদা দেয়, সম্মান করে তখন তাকে আর কেউ রুখতে পারে না। যদি সন্ত্রাসী বা খারাপ লোকদের ঘৃণা করে, সবাই তাকে এড়িয়ে চলত তাহলে কেউ আর সে পথে যেত না।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আদিবুল ইসলাম বলেন, সব ধরনের অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে নিরলসভাবে কাজ করছে পুলিশ। তবে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পরিবারকে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে বলে মন্তব্য করেন এ পুলিশ কর্মকর্তা।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১