আপডেট : ০৮ November ২০২০
ফেসবুকে চাকরির লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণা করছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র। লোভনীয় বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে অনেকেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। রাজধানীজুড়েই এই প্রতারকরা সক্রিয়। চাকরি দেওয়ার নাম করে চাকরি-চাকরি খেলা খেলে এই প্রতারকরা। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ফেসবুকে চাকরির এসব বিজ্ঞাপন দেখে সহজেই আকৃষ্ট না হয়ে খোঁজখবর নিয়ে তারপর আসতে। আর সুনির্দিষ্ট কেউ অভিযোগ দিলে সেই বিষয়ে তারা ব্যবস্থা নেবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘লাইভ গার্ড সিকিউরিটি সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে চাকরির আবেদন করেন তাওহিদ রবিন। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার এ বাসিন্দার সঙ্গে পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন ওই প্রতিষ্ঠানের একজন সহকারী ম্যানেজার। তিনি ইন্টারভিউর সময় ও ঠিকানা মেসেজের মাধ্যমে পাঠান রবিনকে। ঠিকানা অনুযায়ী গিয়ে প্রাথমিক ইন্টারভিউ বোর্ডের মুখোমুখি হন রবিন। তাকে জানানো হয়, মূল ইন্টারভিউর জন্য ৫০০ টাকা দিয়ে একটি ফর্ম পূরণ করতে হবে। ৫০০ টাকা দেওয়ার পর তাকে কিছু প্রশ্নসহ একটি উত্তরপত্র দেওয়া হয়। এটি পূরণ করার পর চাকরি নিশ্চিত করতে চাওয়া হয় আরো ৪ হাজার ২০০ টাকা। এই টাকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুস্ট করার খরচ হিসেবে নেওয়া হচ্ছে বলে তাকে জানান ইন্টারভিউ বোর্ডের সদস্যরা। এতে রাজি না হয়ে আগে দেওয়া ৫০০ টাকা ফেরত নিয়ে চলে আসেন তিনি। তাওহিদ রবিন বলেন, ‘ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখলাম। বেতন কাঠামো ভালো। তাই আমি কাস্টমার কেয়ার অফিসার পদে আবেদন করি। ইন্টারভিউর জন্য সেখানে গিয়ে দেখি, এটা যে কোনো অফিস তা বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। নেই কোনো সাইনবোর্ড। কিন্তু অফিসের ভেতরে গিয়ে দেখি, চাকরিপ্রত্যাশীদের ভিড়।’ ইন্টারভিউর জন্য অপেক্ষা করার সময় রবিনের সঙ্গে কথা হয় কয়েকজন চাকরিপ্রার্থীর। তাদের সবারই চাকরির খুব প্রয়োজন। রবিন বলেন, ইন্টারভিউ দিতে যাওয়া বেশির ভাগ মানুষই আমার মতো টাকা না দিয়ে ফিরে এসেছে। আবার কেউ কেউ ওই টাকা দিয়ে জয়েন করেছে।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, সহকারী ম্যানেজার পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে বিএ। এ পদে বেতন উল্লেখ করা হয়েছে ১৯ হাজার ৫০০ টাকা। কাস্টমার কেয়ার অফিসার পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক। বেতন ১৭ হাজার ৫০০ টাকা। রাজধানীর মিরপুরের সেকশন-১২ এর বি-ব্লকের, ৪ নম্বর সড়কের ৬৩ নম্বর ভবনে চাকরির এমন ব্যবসা পেতে বসেছে প্রতিষ্ঠানটি। যাদের নিয়োগপত্র দেওয়া হচ্ছে, সেখানে রয়েছে মিরপুরের সেকশন-৬ এর এ-ব্লকের ৫/৪৩ নম্বর বাড়ির ঠিকানা। তাদের বেতন কাঠামো দেখে একই ফাঁদে পা দিয়েছিলেন হুমায়রা সিদ্দিকা। ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে তিনিও রবিনের মতো সেখান থেকে ফিরে আসেন। হুমায়রা বলেন, ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে আমি আবেদন করেছিলাম। সেখান থেকে আমার সঙ্গে একজন যোগাযোগ করে। অফিসের ঠিকানা পাঠায়। ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে দেখি, পদে পদে টাকা চাচ্ছে। এখানে যে চাকরির নামে প্রতারণা হচ্ছে, সেটা বুঝতে পেরে আমি চলে আসি। রবিন এবং হুমায়রা পরিস্থিতি বুঝে পিছপা হলেও অনেকেই এ ফাঁদে আটকে যান। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, ‘লাইভ গার্ড প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি’ মূলত কোনো চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান নয়। প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো কাজ নেই। এখানে কাজ হলো- নির্দিষ্ট অঙ্কের বিনিময়ে একজন ‘চাকরি’ নিয়ে আরো একাধিক জনকে চাকরিতে নিয়ে আসবেন, তাদের মাধ্যমে আরো ব্যক্তি চাকরি নেবেন একই পদ্ধতিতে। এটা অনেকটা মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ের (এমএলএম) মতো প্রতারণা। গত সেপ্টেম্বরে প্রতারক প্রতিষ্ঠানটির ফাঁদে পড়েন এক ব্যক্তি। সহকারী ম্যানেজার পদের জন্য ৮ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে চাকরি নেন তিনি। মানি রিসিটে লেখা রয়েছে এই টাকা ফেরতযোগ্য। প্রতিষ্ঠানটিতে নিজের কাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানান, তিনি টাকা দিয়ে চাকরি নেওয়ার পর তার মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। সে বিজ্ঞাপন দেখে যারা আগ্রহী হয়, তাদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেন। তাদের ডাকা হয় ইন্টারভিউর জন্য। চাকরিতে জয়েন করতে চাওয়া হয় টাকা। যারা টাকা দিয়ে জয়েন করেন, একইভাবে তাদের মোবাইল নম্বর দিয়ে আবার বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। তারাও আবার নতুন চাকরিপ্রত্যাশীদের চাকরি দেন। এভাবে একে অন্যের চাকরি দিয়ে চলে তারা। ভাগাভাগি হয় কমিশন। চাকরি দেওয়াটাই এখানে চাকরি বলে জানান ওই ভুক্তভোগী। তিনি বলেন, আসলে এটি চাকরি নয়, চাকরি চাকরি খেলা। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, করোনাকালে চাকরি ছিল না। চাকরির খুব দরকার ছিল। আমি খুব গরিব মানুষ। তখন টাকা ধার করে ৮ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে এখানে জয়েন করি। যখন ট্রেনিং রুমে গেলাম তখন পুরো বিষয়টা বুঝলাম। তারা বলল, আমি যেভাবে জয়েন করেছি একইভাবে আমাকে ২৫ জন লোককে চাকরিতে আনতে হবে। এখানে আমি আপনাকে ঢুকালাম। আপনি আবার একজকে ঢুকালেন। সে আবার একজনকে ঢুকাল। এভাবেই চলে এই প্রতারণা। ‘লাইভ গার্ড সিকিউরিটি সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেডের’ ম্যানেজার মৌসুমি জানান, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরানুল ইসলাম। তবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন সৌরভ হোসেন। আর চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন তাসলিমা সুলতানা। ইমরানুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি দাবি করেন, তাদের কার্যক্রম বৈধ। তিনি বলেন, আমার এখানে চাকরির ক্ষেত্রে অনলাইনে অ্যাড (বিজ্ঞাপন) দিই। পোস্টারিং করি। যারা আমাদের এখানে কাজ করে পোস্টারে-বিজ্ঞাপনে তাদের নম্বরগুলো দিই। যারা গার্ড হিসেবে আসতে চায় তারা আমার স্টাফদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা যে কয়টা গার্ড নিয়ে আসে, আমি তাদের একটা পার্সেন্টেজ দিই। এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান পুরো রাজধানীজুড়েই। রাজধানীর ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার, মতিঝিল, পল্টন, বাড্ডা, রামপুরা এবং মালিবাগেও এমন ভুয়া প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। চাকরির প্রলোভন দেওয়া এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে চাকরিপ্রত্যাশীদের সচেতন থাকতে পরামর্শ র্যাবের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসুর। তিনি বলেন, যারা চাকরিতে আসতে চায়, তারা যেন একটু খোঁজখবর নেন আসলে ওই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব আছে কি না। প্রতারক চক্রগুলো খুব স্মার্টলি নিজেদের উপস্থাপন করবে। এখন প্রায় সবার হাতে স্মার্ট ফোন আছে। চাকরিপ্রত্যাশীরা একটু গুগলে সার্চ করতে পারেন তার ওই কোম্পানি সম্পর্কে। এ ধরনের প্রতারক চক্র ধরতে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের পাশাপাশি র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগ কাজ করছে বলে জানান পলাশ কুমার বসু। তিনি বলেন, যখনই এ ধরনের প্রতারণার খবর আসে, ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দেয় বা আমাদের গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায়, তার ওপর ভিত্তি করে প্রতিনিয়ত কাজ চলছে। চাকরি দেওয়ার নামে টাকা নেওয়া এমন একটি বড় চক্র তৈরি হয়ে গেছে। আমরা নজর রাখছি। অভিযান চলমান আছে।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১