ধর্ম

হিজরি নববর্ষ : চেতনা ও আহ্বান

  • প্রকাশিত ১০ অগাস্ট, ২০২১

আব্দুল্লাহ আলমামুন আশরাফী

 

দেখতে দেখতে আরেকটি হিজরিবর্ষ বিদায় নিল। মহাকালের অতলগর্ভে আরেকটি বছর হারিয়ে গেল। সূচনা হলো আরেকটি নতুনবর্ষের। ১৪৪৩ হিজরি। এই যে হিজরিবর্ষ আমাদের কাছে আসে, সময়ের আবর্তে দেখতে দেখতে আবার চলে যায়-এটা আমাদের মাঝে কী চেতনা জাগায়। আমাদেরকে কিসের আহ্বান জানায়? হিজরি নববর্ষের চেতনা ও আহ্বান নিয়েই বক্ষমাণ রচনার অবতারণা।

হিজরি বর্ষের প্রেক্ষাপট : মাটি আর মানুষ-এই দুই মিলেই পৃথিবী। এর বাইরে যা কিছু আছে, যত কিছুই নজরে পড়ে সবই তার শোভাবর্ধক, প্রয়োজনীয় সামগ্রী। তাই মাটি ও মানুষের সম্পর্ক এক আত্মিক সম্পর্ক। সব দেশে, সব যুগে এর প্রভাব দেদীপ্যমান। এর বিকাশ প্রতীয়মান। মাতৃভূমির প্রতি নিখাঁদ আকর্ষণ, বাপ-দাদার ভিটেমাটির প্রতি অম্লান মায়া কার না আছে? প্রবাসে যে জন কাঁদেনা মায়ের  দেশের টানে, শত ব্যস্ততার মাঝেও যে প্রবাসীর মন আমোদিত, আহ্লাদিত ও আন্দোলিত হয়না মাতৃভূমির স্মরণে, সে তো পাষাণ। দয়া মায়াহীন সীমার। হূদয়হীন দুপেয়ো..।

মানুষ বিপদ-আপদে ধন-সম্পদ বিসর্জন দেয়। সহায়সম্বলের বিনিময়ে জীবন ঠেকাতে চায়। এটা মানুষের স্বভাব। এটা তার প্রকৃতি। কিন্তু ওই সম্পদের মাঝেও মাটির মর্যাদা তার কাছে আলাদা। তাই মানুষ যথাসম্ভব নিজেকে ধরে রাখতে চায় এই মাটিতে। যখন তার সামনে মাটি বিক্রি ছাড়া আর কোনো উপায় থাকেনা, তখন সে মাটি বেচে। তবে এ কঠিন সিদ্ধান্ত তাকে জ্বালা দেয়, তাড়া করে, হূদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। সে মুষড়ে পড়ে এক অব্যক্ত যন্ত্রণায়। তাই তো প্রবীণরা বলেছেন, ‘মাটি ছাড়তে যার বুক কাঁপে না, সে বড়ই হতভাগা’।

মাটি থেকে মানুষের সৃষ্টি-এটাই হয়তো এই ভালোবাসার নেপথ্যে কাজ করে। মাটির সাথে যে মানুষের এ গভীর ভালোবাসা, নিঃসীম প্রেম সে মাটিকেও মানুষ বিসর্জন দেয়। মানবজাতির ইতিহাস হাতড়ালে দেখা যায়, মানুষ সাধারণত দুটি কারণে মাটি ছাড়ে। আপন ভিটেমাটিও পরিত্যাগ করে। এক. জীবন বাঁচানোর তাকিদে। আপন নিবাসে যখন জীবনের নিশ্চয়তা হারিয়ে যায়। দুই. আপন নিবাসে আরেকটু সুখে কাটাবার স্বপ্নে। সাময়িক প্রবাসের উদ্দেশ্যে। কাজকর্মের সন্ধানে। এ দুটি কারণে মানুষকে ভিটেমাটি বিসর্জন দিতে দেখা যায় প্রতিনিয়ত। মানবজীবনের দৈনন্দিন জীবনযুদ্ধের এ এক অখণ্ড চিত্র।

কিন্তু আজ থেকে চৌদ্দো শত বছর আগে পৃথিবী প্রত্যক্ষ করল ভিটেমাটি বিসর্জনের আরেকটি কারণ। বড় কঠিন, খুনে খুনে লাল আরেকটি কারণে শিহরিত হয় সেদিনকার পৃথিবী। পৃথিবী দেখল, নীলাভ আকাশ দেখল, উন্মুক্ত বাতাস আর অগণিত সৃষ্টি  দেখল, একদল মানুষ অমানবিক নির্যাতনে অতীষ্ঠ হয়ে আঘাতের পর আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছেন। আপন মাতৃভূমি, পরিবার-পরিজন ছেড়ে অজানার পথে হারিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা মাতৃভূমি ত্যাগ করছেন। অথচ প্রাণের ভয়েও নয়, জীবিকার সন্ধানেও নয়। হারিয়ে যাচ্ছেন একটি সত্যকে পৃথিবীর সকল কিছুর ঊর্ধ্বে তুলে ধরার দৃপ্ত শপথে। তাঁরা কাঁদছেন; এক মহাসত্যের কান্না। নয়নের সব পানিই তারা উৎসর্গ করছেন তাঁর জন্য যিনি মানবতার অহংকার, দুজাহানের সরদার, রাহমাতুল্লিল আলামিন, মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ জন্মভূমি মক্কায় আল্লাহতায়ালার নির্দেশে তাওহিদের আওয়াজ তুললেন। কিছু মানুষ তাঁর ডাকে সাড়া দিলেন। তবে একটা বড় অংশ তাঁর বিরোধিতায় আকণ্ঠ ডুবে গেল। তাঁর সঙ্গীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন শুরু করল। কারণ, তাঁদের অপরাধ মস্তবড়। তাঁরা পাথরের মূর্তিকে প্রভু মানেন না। তাঁরা হাতের তৈরি মূর্তির সামনে মাথানত করেন না। তিনশ ষাটের বদলে এক আল্লাহর কথা বলেন। তাঁরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন। তাঁরা নারীর অধিকারের কথা বলেন। তাঁরা মানবতার জয়গান গেয়ে যান। অন্যদেরকেও তাওহিদ ও মানবতার পথে আহ্বান জানান। তাঁদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। তীব্র থেকে তীব্রতরে রূপ নেয়। অবশেষে তাঁরা আল্লাহর নির্দেশে মাতৃভূমি ছেড়ে দূর-দিগন্তে হিজরতের উদ্দেশে বের হন। প্রথমে একদল হাবাশায় (বর্তমান ইথিওপিয়ায়) পাড়ি জমান। পরবর্তীতে নবীজির নির্দেশে ইসলামের পতাকাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তুলে ধরার দৃপ্ত প্রয়াসে মাতৃভূমির সকল ভালোবাসা বিসর্জন দিয়ে ‘সোনার মদিনায়’ গমন করেন। এটাকেই পরিভাষায় ‘হিজরত’ বলে। আর এখান থেকেই হিজরি সনের সূচনা।

আমাদের বিশ্বাস, নবীজির কঠিন ত্যাগ আর সাহাবিদের সীমাহীন কোরবানির সাক্ষীরূপেই বছর গণনার এ ধারার প্রবর্তন করা হয়েছে। পৃথিবীতে যতদিন সত্য টিকে থাকবে, বাতিলও ছায়ার মতো ধাওয়া করে চলবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই সত্যকে সমুন্নত রাখতে হলে দিতে হবে প্রতিনিয়ত  কোরবানি, বিসর্জনের পর বিসর্জন। পরীক্ষার পর পরীক্ষা। মূলত বছরান্তে মুহাররামের এক ফালি বাঁকা চাঁদ মুমিনের চেতনায় যেন হিজরতের সেই ত্যাগী আহ্বান নিয়ে হাজির হয় প্রতি বছর। মুমিনের ভাবনাকে আরেকটু শাণিত করাই যেন হয় প্রতিটি হিজরি নববর্ষের প্রকৃত আবেদন।

আমরা আজ বড় অসহায়। পৃথিবীটা আজ বিধ্বস্ত। কোভিড-১৯ করোনাভাইরাসে পুরো দুনিয়া আজ মৃত্যুপুরী। প্রায় অর্ধকোটি মানুষ পরপারে রওয়ানা হয়েছে। বিজ্ঞান প্রযুক্তির দম্ভ অহংকার আজ চূর্ণবিচূর্ণ‌। এতকিছুর পরেও  ইসলাম ও মুসলমানদের দুশমনদের দুশমনি অব্যাহত। মক্কার কাফেরদের মতো এরাও মুসলমানদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। একদিকে কাঁদছে আমাদের অসহায় মুসলিম ভাই-বোনেরা। সর্বশক্তি নিয়ে আমাদের ওপর হামলে পড়ছে ইসলাম ও মানবতার শত্রুরা। তবুও আমাদের চেতনা-অনুভব জমাট হিমের মতো স্থির। প্রাণ নেই বিশ্বাসে-অনুভূতিতে। নতুন হিজরিবর্ষের ঊষালগ্নে আল্লাহর দরবারে এই কামনা-এবারের হিজরি নববর্ষে পুনরায় ফিরে আসুক চেতনা-বিশ্বাসে এক মহাআলোড়ন। হিজরতের আদর্শের প্রদীপ অম্লান হয়ে জ্বলে উঠুক আমাদের অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনসংসারে।

লেখক : খতীব, আউচপাড়া জামে মসজিদ, টঙ্গী গাজীপুর

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads