সুদীর্ঘ ২৩ বছরের পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বেড়াজালে বন্দি থেকে নয় মাস রক্তক্ষয়ী জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা করে নেয় স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র তথা বাংলাদেশ। এরপরই একই সঙ্গে অভিযাত্রা শুরু আমাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র শাসন ব্যবস্থার। পাকিস্তানি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে জনযুদ্ধের মূলে ছিল একটি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা পূর্ণ বাংলাদেশ বির্নিমাণের। সাংবিধানিকভাবে যা হলো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। অর্থাৎ জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস ও রাষ্ট্রের যা করণীয় তা হবে শুধু জনকল্যাণমুখী তথা জনবান্ধব।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনগণের যে ম্যান্ডেট রচিত হয়েছিল তাতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার, ব্যক্তি ও বাক্স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা। কিন্তু দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বিস্তর ব্যবধান লক্ষণীয়। একটি স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যম একটা দেশকে উন্নতি, অগ্রগতি ও প্রগতির সুউচ্চ চূড়ায় আসীন করতে পারে। এই কথা সর্বজনীন স্বীকৃত, গণমাধ্যম একটি সমাজের দর্পণ, যা দ্বারা সমাজের প্রকৃত চিত্র আমাদের কাছে দৃষ্টিগোচর হয়। আর ক্ষুদ্র অর্থে সমাজের চিত্র বৃহদার্থে রাষ্ট্রের প্রকৃত স্বরূপ। মুক্ত ও স্বচ্ছ গণমাধ্যম ব্যতীত রাষ্ট্রের উন্নতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক অধিকার খর্ব হয়ে থাকে। কারণ আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুঁজি করে যে গঠনতন্ত্র তথা সংবিধান রচনা করা হয়েছে তাতে সাংবিধানিকভাবে নাগরিকের বাক্স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ৩৯(১) ধারায় চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হয়েছে এবং ৩৯(২) ধারায় সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। বাক্স্বাধীনতা জনগণের মৌলিক অধিকার হওয়া সত্ত্বেও আমরা জনগণের বাক্স্বাধীনতায় নগ্ন হস্তক্ষেপ প্রায়ই দেখে থাকি, যা সাংবিধানিক মূল নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সংঘর্ষপূর্ণ। এ কথা মনে রাখা দরকার, দীর্ঘ সময় জনগণের কণ্ঠরোধ করে রাখলে জনগণ ও রাষ্ট্র কারো জন্য তা সুখকর হয় না। আমরা যদি ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে এর সপক্ষে জোরালো প্রমাণ পাই। কয়েক দশক আগে সমাজতান্ত্রিক বা কমিউনিস্টদের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা এই যে, তারা কখনো সরকারি ভাষ্য তথা তাদের নিজস্ব ভাষা ছাড়া জনগণকে মুক্ত ও ভয়হীন পরিবেশে মতপ্রকাশের পথকে মুক্ত ও অবাধ করেনি, রুদ্ধ করে রেখেছিল। আধুনিক পরিভাষায় যাকে বলা হয় মিডিয়া সেন্সরশিপ। ফলস্বরূপ তারা বুঝতে পারেনি যে তাদের পায়ের নিচের মাঠি ক্রমেই সরে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ৭০ বছর বয়সি একটি ব্যবস্থা নিমিষেই ভেঙে পড়ল। ধূলিসাৎ হয়ে গেল তাদের আদর্শিক মতাদর্শের শাসন ব্যবস্থা। আমার মতে, মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যমের অনুমতি না দেওয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার অন্যতম কারণ। তৎকালীন লিডার ব্রেজনেভ এবং কোসিগিনরা জানতেন না যে তাদের সরকার কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল, জনগণ ও তাদের মধ্যে কতটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল এবং জনগণ তাদের কতটা সমর্থন করছে। এর কোনোটিই তারা জানতে পারেনি স্বাধীন গণমাধ্যম না থাকার কারণে।
গণতন্ত্রের চার স্তম্ভ তথা কার্যনির্বাহী বিভাগ, নির্বাচিত প্রতিনিধি বিভাগ, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের মধ্যে মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যমকে স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অন্যতম হিসেবে দেখা হয়। কারণ মুক্ত ও অবাধ গণমাধ্যম ব্যতীত গণতন্ত্র বল পায় না। যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক। অর্থাৎ জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই জনগণের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়। এজন্য গণতন্ত্রকে জনসাধারণের শাসন ব্যবস্থা বলা হয়ে থাকে। গণমাধ্যম ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য। কারণ গণতন্ত্রের জন্য যেমন দরকার হয় জনসাধারণের মতামত তথা অবাধ বাক্স্বাধীনতার ঠিক তেমনি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন মুক্ত গণমাধ্যমের। কোনো রাষ্ট্র যদি নিজেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে তবে তাকে অবশ্যই জনগণের মতপ্রকাশের অধিকারের পথকে মুক্ত রাখতে হবে। মোদ্দাকথা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকতে হবে একশ ভাগ। আমরা প্রায়ই লক্ষ করে থাকি, সরকারের সমালোচনা করলে গণমাধ্যমসমূহকে সরকারি মহলের রোষানলে পড়তে হয়। কিন্তু এই প্রেক্ষাপটে মনে রাখা শ্রেয়, যে গণমাধ্যম সরকারের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার সমালোচনা করবে ঠিক সেই গণমাধ্যমই সরকারের ভালো কাজে স্তুতি গাইবে। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই গণমাধ্যমকে নিরপেক্ষ ও যাবতীয় রাজনৈতিক মতাদর্শের উর্ধ্বে থাকতে হবে। আদর্শিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যে পত্রিকা বা সংবাদপত্র সরকারের সমালোচনা করে সেই পত্রিকার তথা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সরকারেরই সাংবিধানিক দায়িত্ব। গণমাধ্যমের মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠনে রাষ্ট্রের সর্বস্তর থেকে জনগণের মতামত উঠে আসে। ফলে রাষ্ট্রের প্ল্যান-পরিকল্পনা ও পলিসি বাস্তবায়নে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়, যা কার্যকর গণতন্ত্রের দৃষ্টান্ত। তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সহজতর হয়। আলোচনা, মতপ্রকাশ, ঐক্য হলো গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ সিঁড়ি। স্বাধীন, শক্তিশালী ও পক্ষপাতহীন গণমাধ্যম কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য আবশ্যক। গণমাধ্যমের সঠিক চর্চা যেমন গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে পারে, তেমনি প্রকৃত গণতন্ত্র পারে গণমাধ্যমকে স্বাধীন রাখতে। গণমাধ্যম জনগণের জন্য তথ্যের বৃহত্তম প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। সরকারের সমালোচনা করার মধ্য দিয়েই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক চিত্র প্রকটিত হয়, যা প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে থাকে। আর ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অনুপস্থিত থাকলে তা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় ও সুশাসনকে বাধাগ্রস্ত করে। সুশাসনের অর্থ হলো নির্ভুল, দক্ষ ও কার্যকরী শাসন। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ, দুর্নীতি, নিপীড়ন মুক্ত স্বাধীন পরিবেশ ও রাষ্ট্রের ন্যায়পরায়ণ আচরণ। তবে এক্ষেত্রে বলা ভালো, সুশাসনের জন্য অত্যাবশকীয় উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যম। কারণ গণমাধ্যমের জনকল্যাণমুখী আচরণের মাধ্যমেই উঠে আসে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতি।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের অর্ধশতকে একটি আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে গণমাধ্যম, গণতন্ত্র ও সুশাসনের সার্বিক চিত্রপট খুব বেশি খারাপ না হলেও যে মহান আদর্শকে লক্ষ্য করে, যে প্রত্যাশা নিয়ে এদেশের আপামর জনতা জনযুদ্ধে শামিল হয়েছিল তার সামান্য অংশই প্রাপ্তিতে পরিণত হয়েছে বলে মনে হয়।
লেখক : সিরাজুল ইসলাম সোহাগ
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





