ধর্ম

সুস্থ মস্তিষ্ক আল্লাহর বড় নিয়ামত

  • প্রকাশিত ৩০ জানুয়ারি, ২০২১

হাবীব আনওয়ার

 

 

আল্লাহতায়ালা মানুষকে সুন্দর অবয়বে তৈরি করেছেন। মেধা ও মননে করেছেন বৈচিত্র্যময়। সুন্দর চিন্তা-চেতনা, অমায়িক ব্যবহার, হাস্যোজ্জ্বল চেহারা প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য আল্লাহতায়ালা আমাদের দান করেছেন। সুস্থ মস্তিষ্ক আল্লাহর অগণিত নিয়ামতের অন্যতম। মস্তিষ্ক যদি সুস্থ না হয় তাকে আমরা পাগল বলি। ধিক্কার দেই। ঘৃণা করি। এই গত ক’দিন আগেও দেখলাম রাস্তার পাশে উলঙ্গ অবস্থায় দাঁড়িয়ে অনবরত বকে যাচ্ছে একজন। যেটাকে আমরা পাগলের প্রলাপও বলে থাকি। অথচ চেহারা সুরত মাশাআল্লাহ! আমাদের ভাষায় সুদর্শন যুবক বলে। আমাদের মতোই তার সবকিছু রয়েছে। আমি খুব ভালো করে খেয়াল করেছি, আমার চেয়ে সে অনেক স্মার্ট। চুলগুলো কালো কুচকুচে। মুখের ভাষাও সুন্দর। লোকে বলে পড়ালেখাও নাকি আছে অল্প বিস্তর। কিন্তু হঠাৎই মাথায় সমস্যা দেখা দেয়, তারপর থেকে উলঙ্গ অবস্থায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আহ, কী মর্মান্তিক! একটু চিন্তা করে দেখুন সুস্থ মস্তিষ্কের কত মূল্য। আমাদের এই সমাজ একটি মানুষকে ততক্ষণ মূল্যায়ন করে, যতক্ষণ তার মস্তিষ্ক কাজ করে। এই হিসেবে বলা যায়, এই সমাজ মানুষকে নয়, মূল্যায়ন করে মানুষের মস্তিষ্ককে। তাও আবার সুস্থ হওয়া শর্ত।

আমাদের মাথা শরীরের তুলনায় যথেষ্ট ছোট হয়। মস্তিষ্ক তার থেকেও ছোট হয়। কিন্তু এই মস্তিষ্ক বা ব্রেইনের কারণেই আমরা দুনিয়াতে টিকে আছি এবং সৃষ্টির সেরা জীব নামে পরিচিতি লাভ করেছি। আমাদের মস্তিষ্কটা ছোট হতে পারে কিন্তু এর ভেতরের সিস্টেম এতই জটিল যে দুনিয়াতে কেউ কখনো কাউকে বোঝাতে সক্ষম হবে না। এর ভেতরের একটা অংশ আরেকটা অংশের সাথে এমনভাবে জোড়া লাগানো যে বিজ্ঞানীরাও কার্যকলাপ ও কর্মপদ্ধতি পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেন না।

আজ আমাদের এই সমাজ ও রাষ্ট্র মূল্যায়নের পেছনের বড় কারণ হচ্ছে, আমাদের মস্তিষ্ক। কিন্তু কখনো কি চিন্তা করেছি, আমি অফিসের বস। রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সমাজের প্রতাপশালী নেতা, অর্থবিত্তের ছড়াছড়ি। কিন্তু এগুলোর পেছনে যে সুস্থ মস্তিষ্কের বড় অবদান রয়েছে, আর এই সুস্থ মস্তিষ্ক যিনি দান করেছেন, তাঁরও একটা উদ্দেশ্য রয়েছ তা একবারও কী ভেবে দেখেছি? আল্লাহতায়ালা মানবজাতিকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, একমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য। এক আল্লাহর আনুগত্য মেনে চলার জন্য। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ, বিধিমালা বোঝার জন্যই সূক্ষ্ম ও কার্যকরী মস্তিষ্ক দান করেছেন। আল্লাহর ওপর ঈমান আনয়ন করার জন্য সারা দুনিয়ায় অসংখ্য অগণিত কুদরতি বিষয় আমাদের সামনে দৃশ্যমান করেছেন। আমরা যদি আমাদের সাড়ে তিন হাত শরীরের দিকে তাকায় তাহলেই আল্লাহর অগণিত নিয়ামত দেখতে পাবো। তারপরও আল্লাহতায়ালা কোরআনের জাগায় জাগায় সুস্থ মস্তিষ্কওয়ালাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, তাঁরা কি ভূপৃষ্ঠে ভ্রমণ করে না, যাতে তারা জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন হূদয় ও শ্রুতিসম্পন্ন শ্রবণের অধিকারী হতে পারে! বস্তুত চক্ষু তো অন্ধ নয়, বরং অন্ধ হচ্ছে তাদের হূদয়।’ (সুরা হজ : ৪৬)

আল্লাহতায়ালা অন্যত্র ঈমানের দাওয়াত দিয়ে বলছেন, ‘তবে কি তারা লক্ষ্য করে না উটের প্রতি, কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আকাশের প্রতি, কীভাবে তাকে উঁচু করা হয়েছে এবং পাহাড়সমূহের প্রতি, কীভাবে তাকে প্রথিত করা হয়েছে এবং ভূমির প্রতি, কীভাবে তা বিছানো হয়েছে।’ (সুরা গাশিয়া ১৭-২০)। আল্লাহতায়ালা আরো ইরশাদ করেন : আমি কি পৃথিবীকে শয্যা (রূপে) নির্মাণ করিনি? পর্বতসমূহকে কীলক রূপে নির্মাণ করিনি? আমি সৃষ্টি করেছি তোমাদের জোড়ায় জোড়ায়। তোমাদের জন্য নিদ্রাকে করে দিয়েছি বিশ্রাম, করেছি রজনিকে আবরণ। করেছি দিনকে জীবিকা আহরণের জন্য (উপযোগী)। আর নির্মাণ করেছি তোমাদের ঊর্ধ্বদেশে সুদৃঢ় সপ্ত আকাশ এবং সৃষ্টি করেছি একটি প্রদীপ্ত প্রদীপ। আর বর্ষণ করেছি মেঘ হতে প্রচুর বৃষ্টি। তদ্বারা আমি উদ‌গত করি শস্য, উদ্ভিদ এবং বৃক্ষরাজি বিজড়িত উদ্যানসমূহ। (৬-১২)।

এভাবেই পবিত্র কোরআনে গবেষণা ও চিন্তা চর্চার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহর দেওয়া মস্তিষ্ক কাজে লাগিয়ে ভাবনা, উপলব্ধি ও ইন্দ্রিয়শক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে সৃষ্টির রহস্য উদ্ঘাটনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘সৃষ্টি নিয়ে এক ঘণ্টা গবেষণা করা বছরের পর বছর ইবাদত করার চেয়ে বেশি মূল্যবান।’ পবিত্র কোরআনে অসংখ্য আয়াতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে-তারা যেন চিন্তা-ভাবনা করে। শোনে, মনোযোগ দেয়, তুলনা করে বা পরিমাপ করে। ভাবে, বুদ্ধি ও বিবেকের চর্চা করে এবং বিচার-বিবেচনা করে। সর্বোপরি মেধাকে যেন কাজে লাগায়। আল্লাহর এত এত নিয়ামত দেখার পরও যাদের চিন্তার বদ্ধ দুয়ার না খুলে, তাদের মতো কপাল পোড়া আর হতভাগ্য কেউ নেই। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ তাদের অন্তরসমূহের ওপর ও তাদের কর্ণসমূহের ওপর মোহরাংকিত করে দিয়েছেন এবং তাদের চক্ষুসমূহের ওপর আবরণ পড়ে আছে এবং তাদের জন্য রয়েছে ভয়ানক শাস্তি।’ (বাকারা-৭)। অন্যত্র তাদের পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট বলে সম্বোধন করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘আর এটি একটি অকাট্য সত্য যে, বহু জিন ও মানুষ এমন আছে যাদের আমি জাহান্নামের জন্যই সৃষ্টি করেছি। তাদের হূদয় আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চোখ আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না। তাদের কান আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। তারা পশুর মতো বরং তাদের চেয়েও অধম। তারা চরম গাফলতির মধ্যে হারিয়ে গেছে।’ (সুরা আরাফের ১৭৯)

 

লেখক: শিক্ষার্থী, হাটহাজারী মাদরাসা, চট্টগ্রাম।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads