বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম ভিত্তি ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার আর্থসামাজিক বৈষম্য। ১৯৪৭ সালের ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির মাধ্যমে দুটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের জন্ম হলেও পাকিস্তানের অধীনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে করা হয় একটি অবহেলিত উপনিবেশ। ১৯৪৭-৭১ পর্যন্ত চলে নানা ধরনের শোষণ ও নিপীড়ন। মুক্তির লক্ষ্যে সংগঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ, যার সূচনা হয় ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে স্বাধীনতার যৌক্তিকতা যেমন উঠে আসে তেমনি তা অর্জনেও উৎসাহী হয়ে ওঠে জনগণ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ভয়াল কালরাতে পাকবাহিনী নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে পোড়াজমিতে পরিণত করে পূর্ব পাকিস্তানকে। সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে দেখা দেয় নানা সমস্যা। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেখা দেয় চরম অস্থিরতা। একসময় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শুরু হয় একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনের কাজ। যখনই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই সপরিবারে নিহত হন স্বাধীনতার মহানায়ক। স্তব্ধ হয়ে যায় উন্নয়ন। দেখা দেয় সেনাছাউনিতে বিশৃঙ্খলা। নানা চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সংসদীয় গণতন্ত্র। নতুন করে স্বপ্ন দেখে বাংলার জনগণ। ঘুরে দাঁড়ায় অর্থনৈতিক চাকা যা বর্তমানেও অব্যাহত।
বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০০১-০২ সালে দেখা যায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে মাথাপিছু আয়ের বৈষম্য অনেক কমে গেছে। পাকিস্তানের তথাকথিত উন্নয়নের দশকে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছিল, ৩০ বছরের মধ্যে তা সম্পূর্ণ দূর করতে সক্ষম হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। সত্তরের দশকে ৩ শতাংশ, আশির দশকে ৪ শতাংশ এবং নব্বইয়ের দশকে ৫ শতাংশে উন্নীত হয়। মোটকথা, প্রায় আড়াই দশক ধরে জাতীয় আয় বছরে শতকরা ৪ থেকে ৫ ভাগ হারে বেড়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে দেশে এই যে অগ্রগতি, এটা সম্ভব হয়েছে কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যক্ষেত্রের বদৌলতে।
২০০৭ সালের আগস্টে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দারিদ্র্য বিমোচনে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের স্থান ভারতের পরে। ১৯৯১ সালে যেখানে ৫৭ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল এবং তা ২০০০ সালে ৪৯ শতাংশে নেমে আসে; সে হার ২০০০-০৫ সালে আরো কমে ৪০ শতাংশে নামে এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে ৩০ জুন পর্যন্ত হতদরিদ্র বা চরম দারিদ্র্যের হার কমে ১২ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসে।
১৯৭৩-৭৪ সালে যখন প্রথম দারিদ্র্যের ওপর জরিপ করা হয়, তখন দেশের শতকরা ৭০ জন মানুষকে দুবেলা পেটপুরে খেতে প্রাণান্ত চেষ্টা করতে হতো। বর্তমানে তা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। ১৯৭১ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ৩ শতাংশ। ২০০১ সালে তা কমে ১ দশমিক ৪৮ শতাংশে দাঁড়ায় এবং বর্তমানে যা ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
২০০৭-০৮ সালের ইউএনডিপির মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্থান ১৪০তম। গড় আয়ু দাঁড়িয়েছিল ৬৩ বছর এক মাস, বয়স্ক সাক্ষরতার হার ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্কুল-কলেজে ভর্তির হার ৫৬ শতাংশ এবং বর্তমানে মানব উন্নয়নে বাংলাদেশের অর্জন অসাধারণ। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সূচকের মান মধ্যম সারির দেশের চেয়ে বেশি ছিল।
১৯৯০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়েছে ১৪ দশমিক ৪ বছর। গড় শিক্ষাজীবন বেড়েছে ৩ দশমিক ৪ বছর এবং প্রত্যাশিত শিক্ষাকাল বেড়েছে ৬ বছর। একই সময়ে মাথাপিছু আয় বেড়েছে শতকরা প্রায় ২২০ দশমিক ১ শতাংশ। ১৯৪৭ সালের পর আমরা নানা ধরনের খনিজ দ্রব্য আবিষ্কার এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও সাশ্রয়ের স্বপ্ন দেখে এসেছি। সেক্ষেত্রে একটি স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। ১৯৬২ সালের ২৩ আগস্ট তিতাস গ্যাস আবিষ্কৃত হয়। ১৯৬৮ সালের ১ এপ্রিলে সেই গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। বর্তমানে ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে এবং ২০১৮ সালের জুলাই মাসে বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সংসদে তথ্য দিয়েছেন, উত্তোলনযোগ্য নিট মজুতের পরিমাণ ১২ দশমিক ৫৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। গত কয়েক দশকে দেশে বহু রাস্তা ও ব্রিজ হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে যোগাযোগের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু সেতু। কাজ চলমান আমাদের বহুল আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সাধারণ ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রযুক্তিক্ষেত্রেও আমাদের সফলতা উল্লেখ করার মতো। তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদের ভাষ্য, ‘বর্তমানে দেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের আয় ১০০ কোটি ডলার। ২০২১ সাল নাগাদ এ আয় ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আমরা প্রযুক্তির বিকেন্দ্রীকরণ করছি। এজন্য দেশব্যাপী ২৮টি হাইটেক পার্ক করা হয়েছে। এখানে আমাদের সবার একটাই ইচ্ছা, তা হলো অর্থনৈতিক-সামাজিক উন্নয়নে প্রযুক্তি ব্যবহার করা। তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশের উন্নতির প্রশংসা ইতোমধ্যে সারা বিশ্ব থেকেই আসছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের আন্তর্জাতিক সংগঠন ওয়ার্ল্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সার্ভিসেস অ্যালায়েন্সের (উইটসা) মহাসচিব জেমস পয়জ্যান্টস বলেন, তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশ ভালো করছে এবং যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে বলেই উইটসা ঢাকাকে বেছে নিয়েছে বিশ্ব সম্মেলন করার জন্য। বাংলাদেশের ভিশন ২০২১ রয়েছে, যার মাধ্যমে আইসিটিতে এগিয়ে চলেছে। যেকোনো দেশের সফলতার মূল বিষয় হলো নেতৃত্ব। বাংলাদেশের তা আছে।
চিকিৎসা ও ওষুধ শিল্পেও রয়েছে অভূতপূর্ব সাফল্য। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে চাহিদার শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি ওষুধ আমদানি করতে হতো। মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়রোধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের অধীনে প্রয়োজনীয় ওষুধ আমদানির লক্ষ্যে একটি সেল গঠন করেন। বঙ্গবন্ধু দেশে মানসম্মত ওষুধের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং এ শিল্পকে সহযোগিতা ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে ‘ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তর’ গঠন করেন। দেশে মানসম্পন্ন ওষুধ নিশ্চিত করার জন্য ওষুধ উৎপাদন, বিপণন এবং আমদানি-রপ্তানি অধিকতর কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালে ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তরকে অধিদপ্তরে উন্নীত করেন। দেশীয় চাহিদার শতকরা প্রায় ৯৮ ভাগ ওষুধ বর্তমানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। বর্তমানে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের ১৪৫টি দেশে ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। গত ছয় বছরে ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে পাঁচ থেকে ৩১ বিলিয়নে।
দেশে গত ৫০ বছরে সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ এবং বিশেষায়িত শিক্ষা ও মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক, শিক্ষকসহ প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি হয়েছে। যারা স্বাস্থ্যক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখছেন। একসময় বিদেশ থেকে ওষুধ আমদানি করা হতো। বর্তমানে ৯৮ শতাংশ ওষুধ দেশেই উৎপাদন হয়।
যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যতদূর এগিয়েছে নিঃসন্দেহে তা ছিল আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানের এ ধারা অব্যাহত রাখতে প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। যদি তা সম্ভব হয় স্বাধীনতার হীরকজয়ন্তীতে আমরা আমাদের স্বাধীনতার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব।
সায়মা জাহান সরকার
লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





