ধর্ম

সময়ের মূল্যায়ন : লাভ-ক্ষতি

  • প্রকাশিত ৬ অগাস্ট, ২০২১

মুহাম্মাদ আব্দুল কাদির

 

জীবন সময়ের সমষ্টি। বলা হয়ে থাকে; সময়ই জীবন। যার আপন জীবনের প্রতি মায়া আছে সে সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন করে। জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতা লুকিয়ে আছে সময়ের কররেখায়। শক্তি ও সাধনা দিয়ে যে জয় করতে পারে সময়কে, সময়ের বাঁকে বাঁকে নিহিত সম্ভাবনাকে, সেই হয় সময়ের রাজা। ইমাম আবু ওয়াফা ইবনে আকীল (রহ.) বলেন, ‘জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান সকলে এ কথায় একমত যে, মানুষের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুঁজি হলো সময়। সময় ও অবসর মূল্যবান সম্পদ। কেননা মানুষের দায়িত্ব ও করণীয় অধিক, কিন্তু সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়।’ আরবিতে প্রবাদ বাক্য আছে, ‘সময় সোনার চেয়ে দামি।’ প্রবাদটিতে যদিও সময়কে সোনার সাথে তুলনা করা হয়েছে, প্রকৃতার্থে সময়কে তুলনা করার মতো পরিপক্ব কোনো বস্তু নেই!

সময়ের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য দয়াময় প্রভু তাঁর পাক কালামে সময়ের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। মানবজীবনে সফলতা ও ব্যর্থতার কথা বলতে গিয়ে সুরা আসরের শুরুতে ‘সময়ের শপথ’ করেছেন। (সুরা আসর, আয়াত : ১৩) ‘সময়ের শপথ।’ (সুরা ফাজর, আয়াত : ০১)। এমনিভাবে কোরআনুল কারিমের বহু স্থানে রয়েছে সময়ের শপথ। ইসলামের যতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যেমন : নামাজ, রোজা হজ ইত্যাদির জন্য সময়কে নির্ধারিত করে দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করা মুমিনদের কর্তব্য।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১০৩) এখানে নামাজের গুরুত্বের সাথেসাথে সময়ের প্রতিও বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন।

হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, তাঁর পুরো জীবনটাই ছিল সময়ের তালে নির্দিষ্ট নিয়ম মাফিক। ইবনুল জাওযি রহ. লিখেন, ‘মনে রাখবেন, সময় খুবই দামি। একটি মুহূর্তও নষ্ট করার নয়! মানুষ সময় নষ্ট করে, অথচ এই সময়ে সে বেহিসাব নেকি কামাই করে নিতে পারত। সময় হলো আবাদি জমির মতো। যদি আমরা একটি বীজ বপন করি তবে হাজারটা শস্য পাব। এরকম পরিস্থিতিতে কোনো জ্ঞানী মানুষ কি বীজ বপন করা থেকে বিরত থাকতে পারে?’ সময়কে কাজে লাগালেই ধরা দেয় সফলতা। প্রকৃতপক্ষে  যারা সফল, তাদের ভিন্ন কোনো গুণ নেই! তাদের গুণ এটাই যে, তারা সময়কে কাজে লাগায়।

প্রসিদ্ধ তাবেই আমর ইবনে কায়েস (রহ.)-কে জনৈক ব্যক্তি বলল, হজরত আসুন একটু কথা বলি। তিনি উত্তরে বলেন, ‘সূর্যের যাত্রা থামিয়ে দাও, তোমার সঙ্গে কথা বলব!’ সময় কতই না মূল্যবান ছিল তাঁদের নিকট। ইমাম ফখরুদ্দিন (রাজি রহ.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম! খানাপিনার সময়টুকুকে কাজে লাগাতে না পারায়  আমার ভীষণ আফসোস হয়! কেননা সময় অতি মূল্যবান।’ হাসান আল বাসরি (রাহি.- বলতেন, ‘প্রতিটি দিন তোমার মেহমান, আর প্রতিটি মেহমানই একসময় বিদায় নেয়।’ তাই  মেহমানকে অবহেলা আর অযত্নে ছেড়ে দেওয়া কি বুদ্ধিমানের কাজ?

পূর্বেই বলেছি, সফল ব্যক্তিদের সফলতার মূল খুঁটিই হলো সময়কে কাজে লাগানো। বাংলার খ্যাতিমান অন্যতম কবি হলেন আল মাহমুদ। সব ছেড়ে  কৈশোরে এসেছিলেন ঢাকায়। সঙ্গে টিনের একটি সুটকেস ছাড়া কিছুই ছিল না! ঢাকায় এসে ডুবে থাকলেন নিমগ্ন সাধনায়, হয়ে গেলেন সফলতার আকাশে ধ্রুবতারা। অর্থের অভাবে স্কুল ছাড়তে হয়েছিল  ইরানিকে, সময়কে বুঝলেন, সময়কে কাজে লাগিয়ে শেষমেশ হয়ে গেলেন বিশাল ভারতের শিক্ষামন্ত্রী।

বাবা একজন সামান্য ট্যাক্সিচালক আর মা ক্যাটরিনা দোকান চালাতেন। ১২ বছর বয়সে দৈনিক পত্রিকার ব্যবসা শুরু করলেন। রাতদিন মেহনতের মাধ্যমে সময়কে কাজে লাগিয়ে একসময় নাম লেখালেন পৃথিবীর সেরা ধনীদের লিস্টে। যার নাম শেলডন অ্যাডেলসন। এসবই মূলত জীবনের শ্রেষ্ঠধন সময়কে কাজে লাগানোর নান্দনিক সুফল।

প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী দুটি নেয়ামতের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে অনেকেই প্রবঞ্চিত হয়। নেয়ামত দুটি হলো-সুস্থতা এবং অবসর। (সহিহ বুখারী, হাদিস : ৬৪১২)। অন্যত্র বলেছেন, ‘পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসিত না হওয়া পর্যন্ত কেয়ামতের দিন কোনো মানুষ তার পা নাড়াতে পারবে না। ১. তার হায়াত সম্পর্কে তা কোথায় ব্যয় করেছে, ২. তার যৌবন সম্পর্কে তা কোথায় বিলিন করেছে, ৩. সম্পদ সম্পর্কে তা কোথা থেকে আয় করেছে, ৪. অর্জনকৃত সম্পদ কোথায় খরচ করেছে, ৫. সে যা জেনেছে সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৬)।

উক্ত হাদিসটির দিকে দৃষ্টিপাত করলে সহজেই অনুমেয় যে, প্রতিটি মানুষকে প্রথম প্রশ্নটি  করা হবে তার হায়াত সম্পর্কে। আর হায়াত হলো সময়ের সমষ্টি, বিধায় বলা যায় প্রথম প্রশ্নটিই করা হবে সময় সম্পর্কে। সুতরাং যে আদম সন্তানই সময়ের অপব্যয় করবে, সে কেয়ামতের দিন রবের দরবারে আটকে যাবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ কে? তিনি বললেন, ‘যার আয়ু দীর্ঘ অথচ আমল মন্দ।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৩০)।

ইমাম শাফেই (রহ.) বলেন, ‘সময় তরবারির মতো, যদি তুুমি সময়কে কর্তন না করো ( কাজে না লাগাও) সে তোমাকে কর্তন করবে (বরফের মতো গলে গলে তোমার জীবন নিঃশেষ করবে। তোমার বিরুদ্ধে হাশরের ময়দানে সাক্ষী হবে এবং তোমাকে ধ্বংস করবে)।’ এজন্যই মানবতার শ্রেষ্ঠ বন্ধু হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘পাঁচটি বিষয়ের পূর্বে অপর পাঁচটি বিষয়কে সুযোগ হিসেবে বরণ করে নাও। ১. বার্ধক্য আসার পূর্বে তারুণ্যকে, ২. অসুস্থ হওয়ার পূর্বে সুস্থতাকে, ৩. অভাব আসার পূর্বে সচ্ছলতাকে, ৪. কর্মব্যস্ততা আসার পূর্বে অবসরকে এবং ৫. মৃত্যু আসার পূর্বে জীবনকে।’ (মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস : ৭৮৪৬)। বর্ণিত হাদিসের পাঁচটি উপদেশেই মূলত সময়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। খাজা মাজজুব (রহ.)-এর একটি বিশেষ কবিতাংশ, ‘জীবন গলে যাচ্ছে বরফের মতো, ধীরে ধীরে চুপিসারে অবিরত।’ আল্লাহপাক আমাদেরকে সময়ের গুরুত্ব বোঝার এবং সময়কে কাজে লাগানোর তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক

marufhabdulkadir@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads