ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে সমঝোতার জন্য প্রশাসনের কর্মকর্তা ও সরকারের এমপি-মন্ী্ত্রর কাছে ধর্না দেওয়া শুরু করেছেন হেফাজত ইসলামের নেতারা। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারের অনড় মনোভাবের কারণে কোনো সুবিধা করতে পারেনি তারা। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরও দ্বারস্থ হন হেফাজত নেতারা। কিন্তু সরকারের মনোভাব স্পষ্ট জানিয়ে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের তাণ্ডবে হেফাজতের যুগ্ম-মহাসচিব ও খেলাফত মজলিসের প্রধান মামুনুল হকের সম্পৃক্ততা পেয়েছে সিআইডি পুলিশ। হেফাজতের বিরুদ্ধে দায়ের করা ২৩টি মামলার তদন্ত করবে জানিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিআইডি প্রধান ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান। অন্যদিকে রিমান্ডে থাকা মামুনুল হকের কাছে তার মদতদাতাদের সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন গোয়েন্দারা।
ইউটার্ন হেফাজতের : যুগ্মমহাসচিব মামুনুল হক গ্রেপ্তারের পরপরই পুরোপুরি উল্টে যান হেফাজত ইসলামের নেতারা। আগের সেই আগ্রাসি মনোভাব পাল্টে সুর নরম করেন। সোমবার রিমান্ডে আনার পর রাতে ফেসবুক লাইভে আসেন হেফাজতের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী। তার আগে সোমবার সারা দিন নিজেদের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেন। প্রথমে তারা পুলিশের বিশেষ শাখার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে যান। সেখান থেকে রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ধানমন্ডির বাসভবনে যান। প্রায় ৪৫ মিনিট তারা সেখানে অবস্থান শেষে বেরিয়ে আসেন।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি হেফাজতের তাণ্ডব এবং পরবর্তী সময়ে পুলিশের গ্রেপ্তার অভিযান নিয়ে আলোচনা করতে মন্ত্রীর বাসায় যান হেফাজত নেতারা। হেফাজত নেতাদের মধ্যে ছিলেন সংগঠনটির নায়েবে আমির মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জী, হেফাজতের কেন্দ্রীয় মহাসচিব মাওলানা নূরুল ইসলাম জিহাদী, গ্রেপ্তার মাওলানা মামুনুল হকের বড়ভাই বেফাক মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক, অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান (দেওনার পীর) ও মাওলানা হাবিবুল্লাহ সিরাজী প্রমুখ। তবে বেরিয়ে যাবার সময় হেফাজতের নেতারা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি। হেফাজতের মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদী শুধু বলেন, ‘সাক্ষাৎ করতে এসেছিলাম।’
সূত্র জানায়, হেফাজত নেতাদের সঙ্গে মন্ত্রীর একান্তে কথা হয়। এ সময় হেফাজত নেতারা নরেন্দ্র মোদির সফরকে কেন্দ্র করে তাদের দ্বারা বাড়াবাড়ি হয়েছে বলে স্বীকার করেন। পরে তারা চলমান ধরপাকড় বন্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন।
এরপরপরই হেফাজতের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী ফেসবুক লাইভে আসেন। এ সময় তিনি ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ২৬ মার্চ পরবর্তী ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। ভিডিওবার্তায় বাবুনগরী বলেন, ‘বায়তুল মোকাররমে সন্ত্রাসীরা মুসল্লিদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এরপর হাটহাজারী ও বি-বাড়িয়ায় সংঘাতের এ ঘটনা ঘটে। তারপরও এ ঘটনার জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি।’
বাবুনগরী বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে আমাদের কোনো কর্মসূচি ছিল না। তবে কিছু আলেম গরম বক্তব্য দিয়েছেন এটা সত্য। কিন্তু হেফাজতে ইসলাম সংঘাতে জড়াতে চায় না। সংঘাতও পছন্দ করে না।’
২৩ মামালার তদন্তে সিআইডি
নারায়ণগঞ্জে সাম্প্রতিক সহিংসতায় হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। রাজধানীর মালিবাগে সিআইডির প্রধান কার্যালয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে বিভাগের প্রধান ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান এ কথা জানান। ওই মামলায় সিআইডির পক্ষ থেকে তার রিমান্ড চাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে ২০১৬ সাল থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলায় হেফাজতের সাম্প্রতিক সহিংতার ঘটনায় করা ২৩ মামলার দায়িত্ব পেয়েছে সিআইডি। এ সব মামলার বিস্তারিত জানাতে গিয়ে সিআইডি প্রধান বলেন, ‘২৩টি মামলার সবগুলোই গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যেই নারায়ণগঞ্জের একটি মামলায় হেফাজত নেতা মামুনুল হকের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, ‘সে মামলায় আমরা তার রিমান্ড চাইব। তাছাড়া অন্যান্য মামলায় তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে ধারাবাহিকভাবে সব মামলায় তাকে রিমান্ডে নেওয়া হবে।’ এসব ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না হুঁশিয়ারি দিয়ে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘মামলা তদন্ত করতে গিয়ে যাদেরই জড়িত থাকার প্রমাণ মিলবে তাদেরকেই আইনের আওতায় আনা হবে।’
ব্রিফিংয়ে সিআইডিপ্রধান আরো বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও চট্টগ্রামের একাধিক মামলারও তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে সিআইডি। ২০১৬ সালের পাঁচটি মামলা ও সাম্প্রতিক সময়ের ১৮টি মামলাসহ ২৩টি মামলার তদন্ত করবে সিআইডি। ‘আমরা আশা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যেই তদন্ত শেষ করব এবং যারা এখনো আইনের আওতায় আসেনি তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করব। হামলা, ভাঙচুর ও সহিংসতার ঘটনায় যারা উপস্থিত ছিল, মদত দিয়েছে, উস্কানি দিয়েছে, জ্বালাও-পোড়াও করেছে তাদের ভিডিও ফুটেজ ফরেনসিক করা হবে। ফরেনসিক করে যাদের পাওয়া যাবে তাদের সবাইকেই আমরা আইনের আওতায় আনব।’
বাবুনগরীসহ হেফাজতের অন্য ঊর্ধ্বতন নেতাদের সংশ্লিষ্টতা পেলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে মাহবুবুর রহমান বলেন, আমরা এসব মামলায় প্রাথমিক তদন্তে তিন ধরনের লোকের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছি। যারা উপস্থিত থেকেছে, অনুপস্থিত থাকলেও ইন্ধন দিয়েছে এবং দুষ্কর্মে যারা সহযোগিতা করেছে। বাবুনগরীসহ অন্য কারো সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তের স্বার্থে বলছি না। তবে যদি কারো সংশ্লিষ্টতা পাই তবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনের চোখে সবাই সমান। আমরা দ্রুত মামলাগুলো নিষ্পত্তি করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবো।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মামলায় যদি কোনো জনপ্রতিনিধির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা- জানতে চাইলে সিআইডি প্রধান বলেন, আমরা আইন অনুযায়ী কাজ করি। তদন্তে যারই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাক আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ আইনের চোখে সবাই সমান।
অন্যদিকে মামুনুল হকের ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করার পরপরই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, কর্মকর্তাকে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছেন। গোয়েন্দাদের প্রশ্ন ছিল দেশব্যাপী পুলিশের ওপর হামলা, থানা আক্রমণ, সরকারি অফিস আক্রমণসহ যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে এর মদতদাতা কারা।
সূত্র জানায়, ওই সব ঘটনার দায় কোনোভাবেই হেফাজত এড়াতে পারেনা। আর উস্কানি দিয়ে মাদরাসার ছাত্রদের রাস্তায় নামানোর মূল ছিলেন মামুনুল হক। এখন এ সকল করার উদ্দেশ্যে কি ছিল আর কার মদতে এগুলো হয়েছে সেগুলো জানতে চাওয়া হয়েছে।
তবে এগুলোর উত্তরে মামুনুল হক কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্যও দিয়েছেন। রিমান্ডের প্রথমদিন হওয়ায় এগুলো নিয়ে এখুনি মুখ খুলতে নারাজ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমের নিকট তুলে ধরা হবে বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা।
এদিকে সোমবার মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাজেদুল আদালতে মামুনুলকে হাজির করেন। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মামুনুলের ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দেবদাস চন্দ্র অধিকারী সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।





