জাতীয়

তাজরীন ট্র্যাজেডির সাত বছর

শেষ হয়নি বিচারকাজ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৪ নভেম্বর, ২০১৯

সাভারের আশুলিয়ার তাজরীন গার্মেন্টসে আগুন লাগার সাত বছর হলো আজ। ২০১২ সালের এই দিনে আশুলিয়ার ইয়ারপুর ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন গার্মেন্টসে ভয়াবহ আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান ১১৩ জন শ্রমিক। এই ট্র্যাজেডি ভুলতে পারেনি অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের পরিবার ও আহত শ্রমিকরা। আগুন লাগার সাত বছরেও কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি বলে অভিযোগ করেছেন এই ঘটনায় আহত শ্রমিকরা। কর্মক্ষমতা হারিয়ে বেকার জীবনযাপনে নিজেদের চিকিৎসার ব্যয় বহনে অপারগ তাদের অনেকেই। পঙ্গু সদস্যদের নিয়ে নিদারুণ কষ্টে আছে তাদের পরিবার। সাত বছর পেরিয়ে গেলেও এ দুর্ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচারকাজ আজো সম্পন্ন হয়নি।

এদিকে তাজরীন ট্র্যাজেডির সাত বছর পূর্তি উপলক্ষে আজ রোববার সকালে নিহত শ্রমিকদের স্বজন ও আহত শ্রমিকরাসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাজরীন গার্মেন্টস কারখানার ফটকের সামনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন নিহতদের স্মৃতির প্রতি। এ সময় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাজরীন গার্মেন্টসের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল বের করবেন বলে জানা গেছে।

অগ্নিকাণ্ডের ওই ঘটনার পর শ্রমিকদের  অভিযোগ ছিল-আগুন লাগার পরও কারখানার ছয়টি ফ্লোরের কয়েকটিতে দরজা আটকে রাখা হয়েছিল, শ্রমিকদের নিচে নামতে দেওয়া হয়নি। এছাড়া ওই কারখানা নির্মাণের ক্ষেত্রে ইমারত বিধি অনুসরণ না করা এবং অবহেলারও প্রমাণ পাওয়া যায়।

এসব অভিযোগে তাজরীন ফ্যাশনসের মালিক দেলোয়ার হোসেন ও তার স্ত্রী মাহমুদাসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। তদন্ত করে ১৩ মাস পর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন সিআইডির পরিদর্শক এ কে এম মহসীন উজ জামান খান। অভিযোগপত্রে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০৪ ও ৩০৪ (ক) ধারা অনুযায়ী ‘অপরাধজনক নরহত্যা’ ও ‘অবহেলার কারণে মৃত্যুর’ অভিযোগ আনা হয়। মামলার অপর আসামিরা হলেন—প্রতিষ্ঠানটির লোডার শামীম, স্টোর ইনচার্জ (সুতা) আল আমিন, সিকিউরিটি ইনচার্জ আনিসুর রহমান, সিকিউরিটি সুপারভাইজার আল আমিন, স্টোর ইনচার্জ হামিদুল ইসলাম লাভলু, অ্যাডমিন অফিসার দুলাল উদ্দিন, প্রকৌশলী এম মাহবুবুল মোর্শেদ, সিকিউরিটি গার্ড রানা ওরফে আনোয়ারুল, ফ্যাক্টরি ম্যানেজার আবদুর রাজ্জাক, প্রোডাকশন ম্যানেজার মোবারক হোসেন মঞ্জুর ও শহীদুজ্জামান দুলাল।

২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন বিচারক। এরপর শুনানি বিভিন্ন তারিখে সাক্ষী আনতে ব্যর্থ হয় রাষ্ট্রপক্ষ। মামলার কার্যক্রম একপ্রকার থেমে আছে বলা যায়।

এদিকে তাজরীন ফ্যাশনস গার্মেন্টস কারখানায় ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও আহতদের পুনর্বাসনের দাবি ছিল শুরু থেকেই। কিন্তু ৭ বছরে এর কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি। অগ্নিকাণ্ডে হতাহতদের পেছনে যাদের দায় ছিল, শাস্তিরও মুখোমুখি হননি তাদের কেউ। এ অবস্থায় সাত বছর পেরিয়ে গেলেও তাজরীন ফ্যাশনের আগুনে নিহতদের পরিবার ক্ষতিপূরণ, আহতদের চিকিৎকসা ও পুনর্বাসন এবং অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে গত শুক্রবার মানববন্ধন করে কয়েকটি সংগঠন। এ মানবন্ধনে ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। শুক্রবার  সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, গ্রিন বাংলা ওয়ার্কার্স ফেডারেশন, তৃণমূল গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন মানববন্ধনে অংশ নেয়।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, তাজরীনের অনেক শ্রমিক পঙ্গুত্ববরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কেউ কেউ ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। বিভিন্ন সংগঠন থেকে হতাহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা থাকলেও তা সবাই পাননি। সরকারের পক্ষ থেকেও অল্পকিছু শ্রমিককে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল।

বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন নিছক দুর্ঘটনা নয়, সেটি ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় আগুন লাগার পর কারখানার গেট বন্ধ করে দিয়ে শ্রমিকদের হত্যা করা হয়েছিল। যাদের অবহেলার কারণের শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয় মানববন্ধন থেকে।

গ্রিন বাংলা ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি সুলতানা বেগমের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য দেন জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের আহ্বায়ক বাহরানে সুলতান বাহার, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের সভাপতি মাহাতাব উদ্দিন সহিদ ও বাংলাদেশ তৃণমূল গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি শামীম খান।

শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ক্ষতিপূরণের দাবিতে মানববন্ধনে দাঁড়ানো কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। এদের একজন ময়মনসিংহের জরিনা বেগম। ঘটনার দিন আগুন থেকে বাঁচতে তিনতলা থেকে লাফ দিয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন তিনি। অনেকের আশ্বাস, বহু জায়গায় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি জরিনা। দুই সন্তানের মা এই নারী বলেন, আমার মেরুদণ্ড ভাঙা। ঘাড় নাড়াতে পারি না। কোনো কাজকর্ম আমি করতে পারি না। কেবল স্বামীর রোজগারে সংসার চলা বড় দায়। এর মধ্যে আমার চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে অনেক টাকার প্রয়োজন হয়। কিন্তু অভাবের কারণে চিকিৎসা নিতে পারি না।

সাত বছর ধরে ক্ষতিপূরণের আশায় থাকা রেহেনা বেগম বলেন, আহত হওয়ার পর নারী ও শিশু হাসপাতালে বেশ কয়েক মাস চিকিৎসা নিয়েছি। তখন তো আমার কোনো টাকা-পয়সা লাগেনি। এখন শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা করে। মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়েছি। কিছুদিন পর পর হাসপাতালে যেতে হয়, কিন্তু চিকিৎসার জন্য ব্যয় করার মতো কোনো অর্থ আমার নেই।

তাজরীন ফ্যাশনসে ঝাড়ুদারের কাজ করতেন রংপুরের আঞ্জু আরা। সেদিনের ভয়াবহ স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমি ছিলাম পাঁচতলায়, দেখি সবাই দৌড়াদৌড়ি-কান্নাকাটি করছে। আমিও দৌড়ে কিনারে এসে লাফ দিয়ে দোতলায় পড়ি। এতে পায়ের ভেতরে রড ঢুকে যায়। হাত-পায়ে প্রচণ্ড আঘাত পাই। এরপর বহুদিন কয়েকটি হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নিয়েছি। খরচ চালাতে বাবার সম্পত্তি থেকে পাওয়া তিন শতক জমি বিক্রি করেছি। এখন বিনা চিকিৎসায় আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার টাকা-পয়সার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনো কিছুই পাইনি।

বিভিন্ন সময় শ্রমিক সংগঠনগুলো ‘ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষকেই ছাড় দিতে নারাজ’ বলে এলেও এখন পর্যন্ত আহত শ্রমিকদের অভিযোগের সুরাহা হয়নি। ‘কিছু টাকা-পয়সা’ পাওয়ার আশায় এদিন আতাহারুল ইসলামও যোগ দেন মানববন্ধনে। স্ত্রী সাহেরা বানু ঘটনার দিন বেঁচে ফিরে আসতে পারলেও মাথায় প্রচণ্ড আঘাতের কারণে এখন অনেকটা ‘অপ্রকৃতস্থ’ বলে জানান তিনি।

আতাহার বলেন, তাজরীন ফ্যাশনসের পেছনে একটি টিনের ঘরে তারা থাকেন। ঘর থেকে তার স্ত্রীর বের হওয়ার মতো অবস্থা নেই। মাঝে মাঝে ঘরের লোকদেরও চিনতে পারে না।

সাহেরা ও আতাহারের সংসারে আছে শিশু দুই ছেলে ও এক মেয়ে। আতাহার একটি গার্মেন্টে কাজ করছেন। তবে একার আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। স্ত্রী অনেকটা পাগলের মতো। তার চিকিৎসা দরকার, কিন্তু অভাবের কারণে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারি না।

প্রেস ক্লাবের সামনে তাজরীন ফ্যাশনসের আহত শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণে দাবিতে মানববন্ধনের আয়োজন করে জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন।

সংগঠনটির আহ্বায়ক বাহারানে সুলতান বাহার বলেন, তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সাত বছর হতে চলছে। এ সময়ের মধ্যে বহু এনজিও আহত শ্রমিকদের নিয়ে অনেক খেলেছে। সেই ঘটনার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিহত ও আহতদের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হবে বলে বলেছিলেন। আহতদের মধ্যে মাত্র ১৭৪ জন সামান্য অঙ্কের টাকা-পয়সা পেয়েছে। এখনো শত শত আহত শ্রমিক কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার বলেন, তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে হতাহত শ্রমিকদের আইএলও কনভেনশন অনুসারে ক্ষতিপূরণের দাবি করেছিলাম আমরা। কিন্তু সরকার মাত্র কয়েকজনকে ৫-৬ লাখ টাকা করে দিয়েছে। আর অন্য যারা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন তা খুব সামান্য।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads