মো: বাবুল আক্তার:
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনীতিতে টালমাটাল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিরোধী দলগুলো সরকার হটানোর এক দফা দাবি আদায়ে টানা কর্মসূচি দিয়ে মাঠে অবস্থান করছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিরোধী দলগুলোকে মোকাবিলায় রাজপথে অবস্থান করছে। এরমধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ না মিটলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশিন (ইসি)।
অন্যদিকে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট সংকট নিরসনে বিদেশিদের জোরালো চাপও আছে। দেশের ভেতরেও বিভিন্ন মহল সমঝোতার কথা বলছেন। কিন্তু সমঝোতার লক্ষ্যে সরকার ও বিরোধীপক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে বসানোর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। সার্বিক পরিস্থিতিতে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা সংঘাতের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
রেওয়াজ অনুযায়ী গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে অন্যান্য কমিশনার বঙ্গভবনে যান রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে। এরপর কমিশন ভোটের দিনক্ষণ নির্ধারণ করবে। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশনের সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনের সকল প্রস্তুতির কথা রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছি। তিনি সব শুনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এখন আমরা কমিশনে বসে চ‚ড়ান্ত তালিকা ঠিক করে তফসিল ঘোষণা করব এবং সেটা খুব দ্রæত সময়ের মধ্যে। যেকোনো মূল্যে নির্ধারিত সময়, ২৯ জানুয়ারির আগেই নির্বাচন করতে হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর ডাকা সরকার পতনের একদফা দাবিতে টানা ৪৮ ঘণ্টা অবরোধ শেষ হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। চতুর্থ বারের মতো ফের ‘৪৮ ঘণ্টার অবরোধ’ কর্মসূচি ডেকেছে বিএনপি। আগামী রোববার সকাল ৬টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত সারাদেশে সর্বাত্মক এই অবরোধ কর্মসূচি পালন করবে দলটি।
দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিরতি দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন তারা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, চলমান অবরোধ কর্মসূচির সমর্থনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যে ঝটিকা মিছিল হচ্ছে, তাতে বড় নেতাদের পাওয়া যাচ্ছে না। তৃণমূলের কিছু নেতা মহাসড়কগুলোতে কিছুক্ষণের জন্য মিছিল করে, টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সফল করার চেষ্টা করছে। যে কারণে মহাসড়কে অবরোধ কিছুটা কার্যকর হলেও শহরগুলোতে এর প্রভাব তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না বলে তারা স্বীকার করেন। তবে তারা বলছেন, সামনের কর্মসূচিগুলোতে বড় নেতারা মাঠে নামবেন।
বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা বলেন, হামলা, মামলা ও গ্রেপ্তারের কারণে নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে চলে গেছেন। খুঁজে খুঁজে নেতাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। প্রতিদিনই চলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান। গ্রেপ্তার এড়ানোর নির্দেশনা থাকায় প্রকাশ্যে আসার সুযোগ পাচ্ছেন না নেতাকর্মীরা। তাই হরতাল, অবরোধের বিকল্প আপাতত ভাবছেন না তারা। নির্বাচন কমিশন (ইসি) একতরফা তফসিল ঘোষণা করলে লাগাতার কর্মসূচিতে যাওয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে দলের হাইকমান্ডের।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, আমরা যে কর্মসূচির মধ্যে আছি এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে জনগণের ভোগান্তি লাগবে ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে বিরতি দিয়ে কর্মসূচি পালন করছি। পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণে দলের হাইকমান্ড স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সরকারবিরোধী আন্দোলনে শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, সরকার পতনের এক দফার দাবি আদায়ে চ‚ড়ান্ত আন্দোলন চলছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলে শুরু হবে আন্দোলনের শেষ ধাপ। তার আগে নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলবেন। যখন হাইকমান্ডের সিগন্যাল আসবে, তখন একযোগে সবাই মাঠে নামবেন।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমরা সংবিধান-স্বীকৃত শান্তিপূর্ণ আন্দোলনেই থাকব। এখনই বলা যাচ্ছে না কী কর্মসূচি আসবে।
গত ২৮ অক্টোবর রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক দফা দাবি আদায়ে মহাসমাবেশ করে বিএনপি। মহাসমাবেশ ঘিরে সহিংস ঘটনা ঘটে। পরদিন দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করে দলটি।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের এখন প্রধান টার্গেট বাধা অতিক্রম করে জাতীয় নির্বাচন করিয়ে নেয়া। বিরোধী দলের নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে করা আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সামনে এগোচ্ছে দলটি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় বসতে হলেও সংবিধানের বাইরে যাওয়ার কোনো চিন্তাই করছে না। কারণ, আওয়ামী লীগ মনে করে, নির্বাচন কমিশন এখন আগের চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং স্বাধীন, ফলে কমিশন সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানে সক্ষম। এই যুক্তিকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ দলীয় সরকারের অধীনে ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, বিএনপি-জামায়াতসহ অন্য বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন-সংগ্রাম মোকাবিলায় রাজপথে পাল্টা প্রস্তুতিই যথেষ্ট। বিগত দিনে রাজপথে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে যত কর্মসূচি দেয়া হয়েছে সব কর্মসূচির দিনেই পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে মাঠে ছিল ক্ষমতাসীনরা। আগামী দিনেও বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে মাঠে যত ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে সব কর্মসূচির দিন মাঠে সক্রিয় থাকবে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। যাতে বিরোধী দলগুলো বড় ধরনের কোনো গণজমায়েত করতে না পারে সে বিষয়ে দলটি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে সংকট সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে এগিয়ে আসা দরকার বলে মনে করছেন কেউ কেউ। আর সেটা দেশ ও দেশের জনগণের স্বার্থেই। সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগকেও এগিয়ে আসার কথা বলছেন তারা।
দুই দলের একাধিক নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যেকোনো কারণেই হোক অনমনীয় অবস্থানে চলে গেছে। রাজনৈতিক দিক থেকে সেখান থেকে দুই দলেরই আর ফেরার সুযোগ নেই। ফিরে আসতে গেলে দুই দলকেই দুর্বলতার সমালোচনা শুনতে হবে। ফলে সংলাপে বসার জন্য আগ বাড়িয়ে কোনো দলই এগিয়ে আসার কথা বলছে না।
অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও বলেন, সংলাপের সুযোগ তারা দেখছেন না। সরকারের সঙ্গে থাকা একাধিক দলের নেতারা বলেছেন, নির্বাচনের আগে সংলাপের সুযোগ তারা দেখছেন না। কেন দেখছেন না তা জানতে চাইলে সেসব নেতা বলেন, দুই দলের ‘ফাইনাল খেলায়’ চলে যাওয়াই সংলাপ না হওয়ার অন্যতম কারণ। বিএনপিও অনমনীয় অবস্থানে, আওয়ামী লীগও তাই। ফলে নির্বাচনের অল্প কয়েক দিন সময় রয়েছে। আগে আর কীভাবে সংলাপ হবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিএনপি যেদিকে নিয়ে গেছে, তাতে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনের দিকে ব্যস্ত। বিএনপি আন্দোলন নিয়ে। কেউ কি মধ্যবর্তী জায়গায় আছে? অনমনীয় অবস্থান মূলত জটিলতা। তাছাড়া বিএনপির আন্দোলনে বড় জনসম্পৃক্ততা ঘটছে না। ফলে সরকার কেন তাদের দাবি মানতে যাবে। এ ধরনের নানা হিসাব রাজনীতিতে থাকে।





