গণপরিবহেন বাড়তি ভাড়া নামে প্রায় দেড়গুণ বেশি ভাড়া আদায় করছে বাস-মিনিবাসের মালিক শ্রমিকরা। যাত্রীদের কোনো প্রতিবাদ কাজে লাগছে না। বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়ায় গন্তব্যে যেতে হচ্ছে তাদের। এই সুযোগে শুধু ডিজেল চালিত যানবাহন নয়। গণহারে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে সিএনজিচালিত সব ধরনের গণপরিবহন। এতে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী। এদিকে ভাড়া বৃদ্ধির দুই দিন পর কিছুকিছু জায়গায় মনিটরিংয়ে মাঠে দেখা গেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ)।
রাজধানীর গাবতলী বাস কাউন্টারগুলোতে সরেজমিনে দেখা যায়, দূরপাল্লার পরিবহনে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদয় করা হচ্ছে। অতিরিক্ত ভাড়া নিলেও দেখার যেন কেউ নেই। যার কাছে যেভাবে পারছে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। দু-একটি কাউন্টারের সামনে নতুন ভাড়ার চার্ট টাঙানো থাকলেও অধিকাংশ কাউন্টারে দেখা যায়নি। বাড়তি ভাড়া আদায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে এ নৈরাজ্য বন্ধে সরকারের মনিটরিং দরকার বলে মনে করছেন যাত্রীরা।
গাবতলীতে সৌখিন পরিবহন থেকে ৩০০ টাকার টিকিট ৪০০ টাকায় কেনার পর ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় খালিদ হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে। তিনি বলেন, ফরিদপুরের টিকিট প্রথমে ৫৫০ টাকা চেয়েছিল, দামাদামি করে সেটি ৪০০ টাকায় নিয়েছি। অথচ সরকার নির্ধারিত নতুন ভাড়া অনুযায়ী ফরিদপুরের ভাড়া আসে ৩৮০ টাকা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সৌখিন পরিবহনের টিকিট বিক্রেতা বলেন, মালিক যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে সেভাবেই দাম রাখা হচ্ছে। আবার কুষ্টিয়া যেতে সোহাগ নামে এক ব্যক্তি গ্রীন এক্সপ্রেস পরিবহনের টিকিট কাউন্টার থেকে ৪০০ টাকার টিকিট কিনেন ৫৫০ টাকায়। গ্রীন এক্সপ্রেসের টিকিট বিক্রেতা জাহাঙ্গীর বলেন, সরকার নির্ধারিত নতুন ভাড়ার চাইতে কম রাখা হয়েছে। নতুন তালিকা অনুযায়ী ৬০০ টাকার বেশি ভাড়া আসে বলেও জানান তিনি।
ডিজেল-কেরোসিনের দাম বাড়ানোয় গণপরিবহনেও ভাড়া বাড়ায় বিআরটিএ। সংস্থাটি বলেছিল, এ বর্ধিত ভাড়া সিএনজিচালিত গণপরিবহনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তা কার্যকর হচ্ছে না।
গত রোববার ডিজেলচালিত গণপরিবহনে ভাড়া সমন্বয়ের পর এ বিষয়ে এক প্রশ্নে বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার বলেছিলেন, সিএনজিচালিত গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় হচ্ছে কি না, এ বিষয়টি বিআরটিএ মনিটরিং করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে তা মানা হচ্ছে না। স্বয়ং বিআরটিএ কর্তৃপক্ষকেও এ বিষয়ে বাস মালিকদের সুরেই কথা বলতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএর একজন পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, আসলে শুধুমাত্র ডিজেলের দাম বাড়ানোর জন্য ভাড়া বাড়ানো হয়েছে, তা নয়। ডিজেল বড় একটা কারণ। এছাড়াও গত ৬/৭ বছরে পরিবহনে নানাবিধ ব্যয় বাড়লেও ভাড়া বাড়ানো হয়নি। সড়ক পরিবহন মালিকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সব বিষয় বিশ্লেষণ করেই ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে খরচ কিন্তু সিএনজিচালিত গাড়িরও বেড়েছে। তাদের শুধু সিএনজির দাম বাড়েনি, বাকি সব খরচই বেড়েছে।
বিআরটিএর আরেকজন কর্মকর্তা জানান, সিএনজিচালিত গাড়িরও খরচ বেড়েছে। তাদের শুধু সিএনজির দাম বাড়েনি, বাকি সব খরচই বেড়েছে। এছাড়া বর্তমানে সিএনজিচালিত গাড়ির সংখ্যা বড়জোর ১ থেকে ২ শতাংশ হতে পারে। এক্ষেত্রে ডিজেল-সিএনজিচালিত গণপরিবহন প্রভেদের সুযোগ খুব কম।
অপরদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি বলছে, সড়কে এখন মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ গাড়ি সিএনজিচালিত। বেশিরভাগ গাড়িই এখন তেলে কনভার্ট হচ্ছে। তবে কত সংখ্যক গাড়ি তেলে আর কতগুলো গ্যাসে চলে, এর কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই বলে জানিয়েছে বিআরটিএ।
এদিকে বর্ধিত ভাড়ার চেয়েও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়টি বিআরটিএ তদারকি করছে বলে দাবি করলেও প্রয়োজনের তুলনায় সে মনিটরিং অনেক কম। সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ, ভাড়া সমন্বয়ের ঘোষণার পরই বাসগুলো যাচ্ছে তাই স্টাইলে পকেট কাটছে।
এ বিষয়ে বিআরটিএ পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) সারওয়ার আলম বলেন, আমাদের মনিটরিং টিম গত সোমবার থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে কাজ করছে। এর বাইরে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনও তদারকি করছে। তিনি বলেন, সোমবার বিআরটিএ ১৩টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২২০টি গাড়ি মনিটরিং করেছে। এরমধ্যে ৫৯টি সিএনজিচালিত পরিবহন ছিল। এরমধ্যে ডিজেলচালিত ৩৮টি গাড়ি ও ২৯টি সিএনজিচালিত গাড়িকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের দায়ে জরিমানা করা হয়েছে। ওইদিন মোট আদায় করা জরিমানার পরিমাণ এক লাখ ৫৪ হাজার ১০০ টাকা।
জানা যায়, সরকার নির্ধারিত নতুন ভাড়ার অতিরিক্ত আদায়ের অভিযোগে বিভিন্ন রুটের বাসে জরিমানা করছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ- বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত। বাসভাড়া বাড়ার দুদিন পর গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালীসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় দুপুরের পর থেকে পরিচালিত হয় বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম। অভিযানের নেতৃত্ব দেন বিআরটিএর পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) সারোয়ার আলম।
এসময় বিআরটিএ কর্মকর্তারা বাসের যাত্রীদের অভিযোগের বিষয় সম্পর্কে অবহিত হন। যাত্রীরা এ সময় অভিযোগ করেন, সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ টাকা আদায় করছে বিভিন্ন পরিবহন।
অভিযান চলাকালে বাসের যাত্রীরা আরো অভিযোগ করে বলেন, উইনার ও দেওয়ান পরিবহনে যে কোনো জায়গা থেকেই উঠা হোক না কেন ১০ টাকার পরিবর্তে ২০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা হওয়ার পরও স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের কাছ থেকেও তারা বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন। চালক ও তার সহকারীসহ পরিবহন সংশ্লিষ্টরা তাদের মনমতো ভাড়া নির্ধারণ করে যাত্রীদের পকেট কাটছেন বলেও অভিযোগ করেন যাত্রীরা। অতিরিক্ত ভাড়া না দেওয়া হলে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে, নয়তো বাসে উঠতেই বাধা দেওয়া হচ্ছে।
বিআরটিএর পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) সরোয়ার আলম বলেন, যাত্রীদের কাছ থেকে যে পরিমাণ অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে তা ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাড়তি আদায়ের বিষয়ে প্রয়োজনে আরো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হচ্ছে। নির্ধারিত ‘ওয়ে বিলের’ নামে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় চলবে না। অভিযান চলমান রয়েছে।
উল্লেখ্য, আর্ন্তজাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে ঊর্ধ্বগতির কারণে ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ডিজেল-কেরোসিনের দাম পুনর্নিধারণ করে সরকার। গত ৩ নভেম্বর রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করে। নতুন দাম ভোক্তা পর্যায়ে ৬৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা করা হয়েছে, যা বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হয়। এ নিয়ে পরদিন বৃহস্পতিবার পরিবহন খাতের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে পূবঘোষণা ছাড়াই শুক্রবার সকাল ছয়টা থেকে সারা দেশে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়। ধর্মঘটের তৃতীয় দিন রোববার দুপুরে ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা আসার পর বিকেলেই গণপরিবহন চলাচল শুরু হয়। একইসঙ্গে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের চিত্র দেখা যায় সর্বত্র।





