দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ হিসেবে মিয়ানমার ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করলেও প্রকৃতপক্ষে সেদেশের জনগণ স্বাধীন হতে পারেনি। তাদের গলায় আটকে আছে সামরিক সরকারের বড়শি! এজন্য স্বাধীনতার এত বছর পরেও সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা উঠলেই সামনে বাধার দেয়াল তুলে দিয়েছে সামরিক সরকার! আশ্চর্যের বিষয় হলো, স্বাধীনতার ৭২ বছরের মধ্যে বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় ছিল মাত্র ১৫ বছর! ১৯৬২-২০১১ পর্যন্ত সামরিক সরকার ক্ষমতায় থেকেও তারা ক্ষান্ত হয়নি। অবশ্য ২০১০-এর শেষের দিকে সামরিক সরকার একটু নমনীয় হতে থাকে। আস্তে আস্তে তাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের মনোভাব কমতে থাকে, যার ফলে তারা ২০১৫ সালে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করে। কিন্তু নির্বাচনে সামরিক সরকারের ইউএসডিপি দলটি অং সান সু চির এনএলডির কাছে করুণভাবে পরাজয় বরণ করে। এই পরাজয় মেনে নিতে না পেরে মূলত তখন থেকেই সামরিক সরকার ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে থাকে। তারা শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। পরবর্তীকালে অং সান সু চি সরকার গঠন করে। ইউএসডিপির পক্ষে সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্যে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের দিন থেকেই যোগাযোগ করতে থাকে কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। সে অং সান সু চির মন গলাতে ব্যর্থ হয়।
সেনা অভ্যুত্থান একদিনের চিন্তায় হয়নি। যখন তারা দেখল একের পর এক পরাজয় এবং জনপ্রিয়তার অবনমন, তখনই তারা এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। গত বছর তাদের কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক নির্বাচনের ফলাফল সেটা আরো তাতিয়ে দেয়। এত বছর দেশ শাসন করেও তারা জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। সেটার বাস্তব প্রমাণ হলো, গত বছরের নির্বাচনটি। সেখানে ভোট হয় মোট ১ হাজার ১৭১টি আসনে কিন্তু সামরিক সরকারের দল পায় মাত্র ৭১টি। অপরদিকে অং সান সু চির দল পায় ৯২০টি। অং সান সু চির দলের এমন অবিশ্বাস্য সাফল্য তারা মেনে নিতে পারেনি। এই নির্বাচনের পরেও সিনিয়র জেনারেল প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্যে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু অং সান সু চি এবারো প্রত্যাখ্যান করে। তারা খুব ভালো মতো বুঝতে পেরেছিল, এই মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে রাজনীতিতে তাদের টিকে থাকা কষ্ট হয়ে যাবে। এজন্য ভোটে কারচুপির অভিযোগ এনে সেনা অভ্যুত্থান ঘটায়। এটা ছাড়া আর বিকল্প কোনো রাস্তা ছিল না তাদের সামনে। ফলে চলতি বছরে ১ ফেব্রুয়ারি সেনা অভ্যুত্থান ঘটে। এখন পর্যন্ত অং সান সু চির রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাকর্মীদের আটক করেছে, গুলি করে মেরে ফেলেছে। এটা অবশ্য তাদের জন্য একটা অশনি সংকেত। নতুন করে কেউ যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে এজন্য এক বছরের জন্যে জরুরি অবস্থাও ঘোষণা করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য নিন্দা জানালেও তাতে কোনো লাভ হয়নি। অনেকের ধারণা, চীন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এই অভ্যুত্থান ঘটেছে। অবশ্য যুক্তিটা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, ভূ-কৌশল এবং চীনের সামরিক সরকারের নীতি এখানে অন্যতম ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু এতে বাংলাদেশের ক্ষতিও কম নয়। সেনা অভ্যুত্থানের প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও নিশ্চিত পড়বে। জটিলতা বাড়তে থাকলে রোহিঙ্গা ইস্যুর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
মিয়ানমার যেহেতু চীন বলয়ের বাইরে নয় তাই সবচেয়ে ভালো হবে, চীনকে সামনে রেখে বিশ্বনেতাদের এগিয়ে আসা। যতই পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিক না কেন তাতে খুব একটা লাভ হবে না। ক্ষতি যা হওয়ার সে দেশের জনগণের ও গণতন্ত্রের হবে। এজন্য সেখানে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যে বিশ্বনেতাদের কৌশলী ভূমিকা পালন করা ছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তা দেখছি না। এদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, মিয়ানমারের তরুণ ছেলেরা গভীর জঙ্গলে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তারা গেরিলা হামলা করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে। আরো অনেকে উৎসাহিত হয়ে সেখানে দলে দলে যোগদান করছে। সেই তরুণদের মধ্যে অধিকাংশই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। তাছাড়া ইয়াঙ্গুনে অধিকারকর্মীরা বসন্ত বিপ্লবের ডাক দিয়েছে। এই বসন্ত বিপ্লবের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে মান্দালয় এবং ওয়েতলেত শহরে মিছিল হলে সেনাবাহিনী গুলি চালায়। এতে প্রায় সাতজন মারা যায়। বোঝা যাচ্ছে, এভাবে তাদের দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সাধারণ জনগণ যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বার্থে হাতে অস্ত্র তুলে নেয় এবং সেনাবাহিনী যদি নমনীয় না হয়ে এই রক্ষণাত্মক ধারা অব্যাহত রাখে, তাহলে গৃহযুদ্ধ এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। তেমন হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি আরও বেহাল দশার সাক্ষী হবে। এখন দেখার বিষয়, পরিস্থিতি আসলে কোনদিকে যায়।
সোহেল দ্বিরেফ
লেখক : শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর





