প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে বলেছেন, প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে বিবাদের বদলে আলোচনার মধ্য দিয়ে সঙ্কটের সমাধান করতে চাই। ভারতীয় সম্প্রচারমাধ্যম টাইমস নাও-কে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার তাগিদ বোধ করেছে বাংলাদেশ। তবে জীবনভর তারা শরণার্থী শিবিরে থাকতে পারে না। সাক্ষাৎকারে রাখাইনে ফেরার ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের আতঙ্কের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির তাগিদ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে ‘মিয়ানমারের পক্ষে থাকা’ ভারতের মধ্যস্থতা প্রত্যাশা করেন শেখ হাসিনা।
গত শনিবার গণভবনে টাইমস নাও-এর সাংবাদিক এই বিপুল পরিমাণ মানুষের (রোহিঙ্গা) চাপ নেওয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান। উত্তরে শেখ হাসিনা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের ১ কোটি শরণার্থীর ভারতে আশ্রয় নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। এ জন্য ভারতের কাছে আবারো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের পক্ষে মানবিক কারণেই রোহিঙ্গাদের উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। প্রত্যাবাসন প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান জানাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে ঝগড়া লাগাতে চাইনি। আমরা বরং আলোচনা চালিয়ে যেতে চেয়েছি। বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় আমরা তাদের (মিয়ানমার) বোঝানোর চেষ্টা করেছি, এরা আপনাদের নাগরিক। আপনারা এদের ফেরত নিন।’
কয়েক প্রজন্ম ধরে রাখাইনে বসবাস করে এলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব স্বীকার করে না মিয়ানমার। গত বছরের আগস্টে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সাত লাখেরও বেশি মানুষ।
কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হওয়া রোহিঙ্গাদের ফেরাতে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের চুক্তি সম্পন্ন হলেও এখনো শুরু হয়নি প্রত্যাবাসন। সেই চুক্তির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাঝে একবার মিয়ানমার তাদের ফেরত নিতে সম্মত হয়েছিল, তবে যারা এখানে আছে তারা ফিরতে চাইছিল না। কারণ তারা এখনো আতঙ্কগ্রস্ত। আমরা যখন এমন দেখলাম, তখন ভাবলাম, আচ্ছা এখন তাহলে বন্ধই থাক (প্রত্যাবাসন)। আগে তাদের ভেতরে আস্থা ফিরে আসুক। আমরা মিয়ানমারকেও বললাম, একটা ভালো পরিস্থিতি তৈরি করুন। যেন তাদের ভেতর থেকে ভয়ভীতি আর সন্দেহ চলে যায়। যেন তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে। কতদিন তারা এভাবে ক্যাম্পে থাকবে?’
বায়োমেট্রিকস পদ্ধতিতে রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা রঙের আইডি কার্ড করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সুযোগ নেই তাদের। প্রত্যেক আইডি কার্ডে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) স্বাক্ষর রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেছেন, তারা যে মিয়ানমারেরই নাগরিক, এখন তার নথিভুক্ত প্রমাণ বাংলাদেশের হাতে রয়েছে। কবে নাগাদ রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা বলেছেন, ওরা তো বলছে নিয়ে যাবে। ভারত মিয়ানমারের পক্ষে আছে, চীনও মিয়ানমারের পক্ষে। এখন ভারত যদি মিয়ানমারকে একটু বলে ওদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে, তাহলে আমার মনে হয় একটু ভালোই হয়।
মিয়ানমারের অধিবাসী হলেও রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগ রাখাইন বৌদ্ধ বাংলাদেশ থেকে সেখানে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী বিবেচনা করে। উগ্র বৌদ্ধবাদকে ব্যবহার করে সেখানকার সেনাবাহিনী ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে স্থাপন করেছে সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের চিহ্ন। বিদ্বেষী প্রচারণার মধ্য দিয়ে রাখাইনের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেখানকার রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ ঘৃণার চাষাবাদ করেছে দীর্ঘদিন। বিদ্বেষের শেকড় তাই দিনকে দিন আরো শক্ত হয়েছে।
৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনে পরিচয়হীনতার কাল শুরু হয় রোহিঙ্গাদের। এরপর কখনো মলিন হয়ে যাওয়া কোনো নিবন্ধনপত্র, কখনো নীলচে সবুজ রঙের রশিদ, কখনো ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড, কখনো আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি নামের কাগজ তুলে দেওয়া হয়েছে তাদের হাতে। রঙ-বেরঙের এসব পরিচয়পত্রে ধাপে ধাপে আরো মলিন হয়েছে তাদের পরিচয়। ক্রমেই তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে রাষ্ট্রহীন বেনাগরিকে।





