সম্পাদকীয়

মানব উন্নয়ন সূচকে ধাবমান বাংলাদেশ

  • প্রকাশিত ৮ জানুয়ারি, ২০২১

ইমরান হুসাইন

 

 

 

পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশের নাম। অনেক শোষণ-বঞ্চনায় শত শত বছর থাকার পর বিজয়ের ঊনপঞ্চাশ বছর শেষে অর্ধশত বছরে যাত্রা শুরু করেছে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থাপতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে একদল স্বার্থবাদী স্বাধীনতাবিরোধী শত্রু, যা স্বাধীনতাবাদী, মুক্তিকামী মানুষের জন্য একটি কালো অধ্যায়। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় দেশ চলে যায় স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির কাছে। স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিগুলো গভীর ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে শেষ করতে চেয়েছিল স্বাধীনতার সব অর্জনকে। তাদের দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের প্রভাবে দেশ ও জনগণের অবস্থা হয়ে উঠেছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। ঠিক সেই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে দমন করে হাল ধরেন বাংলাদেশের। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে আবারো ফিরে আসে স্বাধীনভাবে  মুক্তচিন্তার পরিবেশ। সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে দেশ এগিয়ে চলছে দুর্বার গতিতে। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ উন্নয়নের এক রোল মডেল হিসেবে পরিচয় লাভ করেছে। সামগ্রিকভাবে দেশ ও জনগণের কাছে পরিপূর্ণ আস্থা রেখে বৈশ্বিক পর্যায়ে দ্যুতি ছড়াচ্ছে বাংলাদেশ।

শুধু সামাজিক-অর্থনৈতিক নয়, সার্বিক দিক থেকে দেশ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। জনমানুষের জীবনযাত্রার মান আরো বেশি উন্নত হয়েছে। মানুষের মাথাপিছু আয় দুই হাজার ডলার অতিক্রম করেছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা ২০ শতাংশেরও কম। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে উন্নয়নের শীর্ষে। অসাধ্যকে সাধন করে বিজয়ী হয়ে উঠছে। যেমন পদ্মার ওপর সেতু নির্মাণের বিষয়টি একসময় ছিল কল্পনাতীত, কিন্তু তা এখন বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। বিদ্যুতে দেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। জনগণের মাথাপিছু আয় ও জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে, যার বাস্তব প্রমাণ আমরা দেখতে পাই  মানব উন্নয়ন সূচকে চলতি বছর দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২০ প্রকাশ করা হয়। এবারের প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ১৮৯টি দেশ। এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩তম। আগের বছর যা ছিল ১৩৫তম। এখান থেকে আমরা বুঝি দেশ ও জনগণের জীবনপ্রণালি আরো অধিকতর উন্নত হচ্ছে।

প্রতি বছর বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আয় ও সম্পদের উৎস, বৈষম্য, লৈঙ্গিক সমতা, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও আর্থিক প্রবাহ, যোগাযোগ, পরিবেশের ভারসাম্য ও জনমিতির তথ্য বিশ্লেষণ করে মানব উন্নয়ন সূচক তৈরি করে থাকে ইউএনডিপি। এসব মানদণ্ডে এবার বাংলাদেশের মানব উন্নয়ন সূচকে স্কোর দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৬৩২, যা গত বছর ছিল শূন্য দশমিক ৬১৪। যে দেশের স্কোর পূর্ণ সংখ্যা ‘এক’-এর যত কাছাকাছি, সে দেশ মানব উন্নয়ন সূচকে তত উন্নত। ১৯৯০ সাল থেকে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে ইউএনডিপি। প্রতিবেদনে বলা হয়, মানব উন্নয়নে বাংলাদেশের অর্জন অসাধারণ। ১৯৯০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরে মানব উন্নয়ন সূচক শতকরা ৬০ দশমিক চার শতাংশ বেড়েছে দেশটিতে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সূচকের মান মধ্যম সারির দেশগুলোর গড় মানের চেয়ে বেশি ছিল। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখানো হয়, বাংলাদেশ মানব উন্নয়ন সূচকে গত কয়েক বছর ধরে দুই থেকে তিন ধাপ করে এগুচ্ছে। ২০১৬ সালে ১৩৯তম অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। গত বছর এক ধাপ এবং তার আগের বছর তিন ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। এবারের মানব উন্নয়ন সূচকে আগের বছরের মতোই শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে নরওয়ে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছে যথাক্রমে আয়ারল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড। এরপর রয়েছে হংকং, আইসল্যান্ড, জার্মানি, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্ক। আর সবার পেছনে রয়েছে ঘানা, লাইবেরিয়া, গিনি বিসাউ, কঙ্গো ও নাইজার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও ভুটান। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের আগে আরো চারটি দেশ থাকলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

১৯৯০ থেকে ২০১৯ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়েছে ১৪ দশমিক চার বছর, গড় শিক্ষাকাল বেড়েছে তিন দশমিক চার বছর এবং প্রত্যাশিত শিক্ষাকাল বেড়েছে ছয় বছর। এছাড়া এ সময়ে মাথাপিছু আয়ের পরিমাণও বেড়েছে প্রায় ২২০ শতাংশ। সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার নেমে এসেছে ২০ শতাংশে। অর্থাৎ স্বাধীনতার পরে প্রায় পাঁচ দশক সময়ে দেশে দারিদ্র্য কমেছে ৬০ শতাংশেরও বেশি। দারিদ্র্য নিরসনে বাংলাদেশের এই সাফল্যকে অনুকরণীয় ও প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করে আসছে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো। দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল এমন আখ্যাও দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আর দেশের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের প্রশংসনীয় ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই। তবে এই পরিস্থিতির আরো উত্তরণ ঘটাতে হবে। দারিদ্র্য বিমোচনের গতি আরো বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দারিদ্র্যসীমার কিছুটা উপরে যাদের অবস্থান, তাদের আয়ের বিষয়টি স্থিতিশীল ও টেকসই হওয়া জরুরি। করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতি বিবেচনায় সামনের দিনে দারিদ্র্য বিমোচনের এই ক্ষেত্রটিই বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাসের এই মহামারী সময়েও উন্নতির গতিধারার স্বাক্ষর রাখছে বাংলাদেশ সরকার, যার সম্পূর্ণ অবদান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। যার বলিষ্ঠ ও দক্ষ হাতে বাংলাদেশ একের পর এক অবিস্মরণীয় ইতিহাসের সাক্ষী হচ্ছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়াও উন্নয়নের দ্যুতি ছড়াচ্ছে চারদিকে। বিশ্ব এখন অবাক চোখে তাকিয়ে আছে এই বাংলার দিকে।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

imranhossain64.bd@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads