জাতীয়

ভেঙে পড়ছে স্বাস্থ্যবিধি

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

করোনার মহামারী প্রতিরোধে এখনো সন্তোষজনক অবস্থানে পৌঁছায়নি দেশ। তাই সচেতনতা বাড়াতে প্রতিদিনই স্বাস্থ্য বিভাগ ও গণমাধ্যম সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচারণা চালাচ্ছে। তারপরও শপিংমল, হাটবাজার, গণপরিবহন এবং রাস্তাঘাটে অধিকাংশ মানুষই মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি। শুধু মাস্কের ব্যবহার নিয়ে সরকার এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এমনকি সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে ঢাকাসহ বেশ কিছু স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে জরিমানাও করা হয়। এতকিছুর পরও মাস্ক ব্যবহারে অনীহা উল্টো বেড়েছে।

এরই মধ্যে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দেশজুড়ে চলছে করোনার গণটিকাদান কর্মসূচি। কিছু মানুষ চেষ্টা করছেন করোনাভাইরাস থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে। কিন্তু বেশিরভাগ সব স্বাস্থ্যবিধি ভেঙে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পরছেন না মাস্ক, নিয়ম মেনে হাতও ধুচ্ছেন না। কোথাও কোথাও সামাজিক দূরত্বেরও বালাই নেই। গণপরিবহনেও মানা হচ্ছে না কোনো স্বাস্থ্যবিধি। অধিকাংশ পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রী ব্যবহার করছেন না মাস্ক। শুধু তাই নয়, গণপরিবহনে দাঁড়িয়ে যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ করা হলেও সেটিও মানছেন না কেউ। সরকারের নির্দেশনায় কোনো গুরুত্বই দিচ্ছেন না গণপরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। স্বাস্থ্যবিধি তো দূরের কথা, ঝুঁকি নিয়ে বাস-মিনিবাসে চলাচল করছেন সাধারণ মানুষ। নৌপরিবহন ব্যবস্থায়ও একই চিত্র। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খুললেও বিভিন্ন চাকরিদাতা সংস্থাগুলো চাকরিপ্রার্থীদের পরীক্ষাও নিচ্ছে। এমনকি সরকারি দপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষাও চলছে। এতে ভিড় করছেন হাজারো প্রার্থী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা নেওয়ার পাশাপাশি মাস্ক পরা, ঘনঘন সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়া, জনসমাবেশ এড়িয়ে চলার মতো স্বাস্থ্যবিধিগুলো আগের মতোই মানতে হবে। সংক্রমণ কমে এসেছে তা স্বস্তির খবর। কিন্তু আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো সুযোগ নেই। বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর মিছিল ওঠানামা করছে।

রামপুরা এলাকার রিকশাচালক জসিম মিয়া বলেন, মাস্ক পরে রিকশা চালাতে সমস্যা হয়। তাই পকেটে মাস্ক রেখেছেন। ট্রান্স সিলভা পরিবহনের কন্ডাক্টর শামছুল বলেন, সারাক্ষণ যাত্রীরা ওঠানামা করছে। মাস্ক পরলেও করোনা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। তাই মাস্ক খুলে রেখেছেন। রাজধানীর বেশ কটি বিপণিবিতান ও অফিসপাড়ায় দেখা গেছে ভবনে প্রবেশের আগে তাপমাত্রা পরিমাপের কোনো ব্যবস্থা নেই। হাত ধোয়ার বেসিনও নেই। কোথাও বেসিন থাকলেও সাবান কিংবা পানির ব্যবস্থা নেই।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, অজানা সংক্রমণের উৎসটিকে বন্ধ করতে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। সাধারণ মানুষ যদি মনে করেন গরিব মানুষের করোনা হয় না, করোনা হয় বড়লোকের, তাহলে বড়লোকের জীবন বাঁচাতে গরিব লোকের পকেটের পয়সা খরচ করে কেন মাস্ক কিনবেন। যারা পকেটে টাকা থাকার পরও মাস্ক কিনে পরছেন না তাদের জরিমানা করতে হবে। এতে করে সচেতনতা বাড়বে। মাস্ক পরা যেহেতু স্বাস্থ্যবিধির অংশ, তাই প্রচারের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ভলান্টিয়ারের মাধ্যমে মাস্ক পরানো, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ইত্যাদি বিষয় মেনে চলার ব্যবস্থা করতে হবে। এলাকা বা ওয়ার্ডভিত্তিক জনপ্রতিনিধিদের আবারো ব্যবহার উপযোগী মাস্ক বিতরণ করতে হবে। ধুয়ে মাস্ক ব্যবহার করতে বলতে হবে। এভাবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে আমাদের যেতে হবে। জরিমানা করলাম অথচ মানুষ মানল না। শেষে বিরক্ত হয়ে যেন বসে না যায়। সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমাদের সংক্রমণটা কমাতে হবে।

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, দেশে গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের কম। আমরা একটি স্বস্তির পরিবেশে আছি। এর মানে এই নয় যে, সংক্রমণ কমে গেছে। বিশ্বের অনেক দেশেই সংক্রমণের হার কমার পরে আবারো বেড়েছে। তাই আমাদের ঢিলেমি দিলে চলবে না। টিকা নেওয়ার পাশাপাশি মাস্ক পরা, ঘন ঘন সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়া, জনসমাবেশ এড়িয়ে চলার মতো স্বাস্থ্যবিধিগুলো মানতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে টিকা মৃত্যু কমাবে। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকা একটি অন্যতম পন্থা। একমাত্র পন্থা নয়।

স্বাধীনতা চিকিৎসা পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান বলেন, সংক্রমণ কমলেও ঝুঁকিমুক্ত হইনি। ভবিষ্যতে ঝুঁকির আশঙ্কা আছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন জনসমাবেশ হচ্ছে। ভবিষ্যতে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে নিরাপদ থাকতে এই জনসমাবেশ বন্ধের বিষয়ে সরকারের মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, মাস্ক ব্যবহার করতে যত বেশি নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, তত বেশি তা লঙ্ঘনের প্রবণতা বাড়ছে। সরকার থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্টজনরা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেই যাচ্ছেন। রাস্তাঘাট, হাটবাজার ও জনাকীর্ণ স্থানগুলোতে মানুষের চলাফেরা অনেকটাই করোনা পূর্বের স্বাভাবিক সময়ের মতোই। জনগণ কথা শুনছে না বা স্বাস্থ্যবিধি মানছে না, এটা বলে কিন্তু দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্যবিধি মানানোর দায়িত্বটা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগ ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের। এ ক্ষেত্রে সরকারের কঠোরতা ও আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ একান্তই কাম্য বলে তারা মনে করেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads