বাড়বে দীর্ঘস্থায়ী উৎপাদন কমবে খরচ

সংগৃহীত ছবি

কৃষি অর্থনীতি

আগ্রহ বাড়ছে জৈব কৃষিতে

বাড়বে দীর্ঘস্থায়ী উৎপাদন কমবে খরচ

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ২৮ এপ্রিল, ২০২১

বিগত দুই দশকে জৈব কৃষির গতিশীল প্রসারের পরও পুরো পৃথিবীর মাত্র এক শতাংশ কৃষি জমি জৈব কৃষিবিদ্যার আওতাধীন। সমালোচকদের মতে, জৈব কৃষি পদ্ধতিতে সমপরিমাণ শস্য উৎপাদনের জন্য প্রচলিত ব্যবস্থার চেয়ে অধিক কৃষি জমি প্রয়োজন। তবে গবেষণাপত্রটি স্পষ্টত দেখিয়েছে, কেন জৈব পদ্ধতি প্রচলিত কৃষি পদ্ধতির চেয়ে এগিয়ে। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও জৈব উপায়ে উৎপাদিত পণ্যকে অরগ্যানিক পণ্য বলে অভিহিত করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক খাবার, ভেষজ ও প্রাকৃতিক ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে রোগবালাই দমন করা হয়। বিপণন পদ্ধতিতেও অনুসরণ করা হয় জৈব প্রযুক্তি। বিশ্বব্যাপী অরগ্যানিক পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকৃত পোলট্রি, ডেইরি, মৎস্য ও কৃষিজ পণ্যের ভোক্তা চাহিদা বাড়ছে। মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর উপাদানমুক্ত ও অধিক পুষ্টিসমৃদ্ধ অরগ্যানিক খাদ্যপণ্যের চাহিদা মেটানোয় এর উৎপাদন পদ্ধতিরও সম্প্রসারণ হচ্ছে।

জৈব চাষাবাদ আসলে কী

ষাটের দশকে সবুজ বিপ্লবের নাম করে দেশে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার সূচনা হয়। কিন্তু এই কৃষিকাজে অবিবেচকের মতো অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ও বিষ ব্যবহার করে মাটির উপকারী অণুজীবগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছে। কৃষি জমির উর্বরতা শক্তি কমেছে। এইসব বিষ জলাশয়ে জমে ধ্বংস করে ফেলেছে সুস্বাদু দেশি মাছ এবং জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ। এই ক্ষতি আমাদের নিরাপদ খাদ্যের জন্য অন্যতম হুমকি। এ কারণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে  জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদের জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা দরকার। জৈব কৃষি এমন একটি আদর্শ পদ্ধতি, যা প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বিত ও টেকসই। জৈব কৃষিতে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে  জৈবসার ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের জৈবসারের উৎস হচ্ছে খামারজাত সার, কম্পোস্ট সার, আবর্জনা সার, কেঁচো সার, উদ্ভিদ ও  জৈব উৎস থেকে পাওয়া অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, শুকনো রক্ত, হাড়ের গুঁড়া, সবুজ সার, অ্যাজোলা, ছাই। জৈব কৃষি পদ্ধতিতে মাটি সবসময় উর্বর থাকে। জৈব কৃষিতে কিছু কিছু পাতা, কাণ্ড, ডাল, মূল বা বাকলের রস কীটনাশক হিসেবে ব্যবহূত হয়। অনেক প্রকার গাছগাছড়া আছে যেগুলো পশুপাখির নানা চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশে জৈব চাষাবাদের সম্ভাবনা অনেক বেশি

বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও অরগ্যানিক পণ্য উৎপাদনকারী সংস্থাগুলো বলছে, জৈব চাষের জন্য বাংলাদেশের জমি সবচেয়ে উপযুক্ত। তাদের মতে, বাংলাদেশের মাটির ভলিউম এবং সূর্যালোকের প্রাচুর্যের কারণেই খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি সমানুপাতিক হারে বায়োমাস তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। ডব্লিউডব্লিউওওএফ-বাংলাদেশের ওই উপস্থাপনায় বলা হয়, বাংলাদেশের আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ হওয়ায় এখানে প্রাকৃতিক কৃষি চাষাবাদের সম্ভাবনা অনেক বেশি। এখানে তাপমাত্রা কখনো মাইনাসের নিচে নামে না। ফলে সারা বছর প্রকৃতিতে জৈব উপাদানের প্রাচুর্য বজায় থাকে। এর ফলে গাছপালাও পুষ্ট হয়, প্রকৃতিও সতেজ ও সবুজ থাকে। এ আবহাওয়া কাজে লাগিয়ে ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে প্রাকৃতিক চাষাবাদে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ, যা সারা বিশ্বের জন্য মডেল হতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার পালডাংয়ের জানজিতে অনুষ্ঠিত ১৭তম বিশ্ব অরগ্যানিক সম্মেলনে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড অপরচুনিটিস অন অরগ্যানিক ফার্মসের (ডব্লিউডব্লিউওওএফ-বাংলাদেশ) পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জমির এ সম্ভাবনাময় দিকটি তুলে ধরা হয়। অরগ্যানিক পণ্য উৎপাদনের উপযুক্ত জমি হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল, নদী ও উপকূলীয় চরাঞ্চল এবং বসতভিটার আঙিনা ও চারপাশ এবং নগর এলাকার বাড়িঘরের ছাদগুলোকে নির্বাচন করা যেতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, দেশের মোট জমির অন্তত ১০ শতাংশ অরগ্যানিক পণ্য উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত।  বিশেষজ্ঞগণের মতে, অরগ্যানিক পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অরগ্যানিক সুগন্ধি চাল, শাকসবজি, ফল, মাশরুম, চা, অরগ্যানিক পাট, অরগ্যানিক মাছ ও অরগ্যানিক মাংস উৎপাদনের ক্ষেত্রেই বেশি নজর দিতে হবে। এ জন্য প্রথমেই প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও আইনকানুন তৈরির জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ জৈব কৃষি

কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ফসলি জমির পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৫২ লাখ হেক্টর। আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ সাড়ে ৮৫ লাখ হেক্টর। প্রায় দেড় কোটি কৃষি পরিবার এই জমির প্রায় শতকরা ৮৮ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। এদের অধিকাংশই প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক। বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি আদর্শ জমিতে জৈব পদার্থের মাত্রা ৩.৫ শতাংশ থাকা বাঞ্ছনীয় হলেও এ দেশের বেশির ভাগ জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১-১ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং কিছু কিছু জমিতে এর পরিমাণ ১ শতাংশের চেয়েও কম। এর মধ্যে ৩৭ লাখ হেক্টর জমিতে ফসফরাস, ২৭ দশমিক ২ লাখ হেক্টর জমিতে পটাশিয়াম, ৩৩ দশমিক ১ লাখ হেক্টর জমিতে গন্ধক, ২৭ দশমিক ৫ লাখ হেক্টর জমিতে দস্তা, ২৪ দশমিক ৯ লাখ হেক্টর জমিতে বোরন, ৩৫ দশমিক ৬ লাখ হেক্টর জমিতে অত্যাধিক থেকে অধিক অন্তের অভাব রয়েছে। এ ছাড়া অনেক জমিতে রয়েছে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের অভাব। রাসায়নিক সারের পরিবর্তে উচ্চ পুষ্টি মানসম্পন্ন প্রযুক্তিতে উৎপাদিত জৈবসার সবজি ও ধানগাছে প্রয়োজনীয় ইউরিয়া, পটাশ ও ফসফেট সারের জোগান দেয়। আধা-কম্পোস্ট গোবর, মুরগির বিষ্ঠা, ধানের কুঁড়া, মাছ-মুরগির পাখনা ও পরিপাকতন্ত্র তথা পরিত্যক্ত অংশ একসাথে করে জৈব কম্পোস্ট সার তৈরি করা হয়। জৈবসার প্রয়োগ করলে আর অতিরিক্ত ইউরিয়া, পটাশ ও টিএসপি সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। এ ছাড়া মাটির উর্বরতা ও স্বাস্থ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়। উৎপাদিত ফসল হয় স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ। অরগ্যানিক ফার্মিং জমির জীব ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য বাড়ায়, জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি জমির প্রবল বৃষ্টিপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলা করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, যে জমিতে সর্বশেষ রাসায়নিক সার ব্যবহার করে চাষাবাদ করা হয়েছে সেই জমি ন্যূনতম তিন বছর পতিত অবস্থায় ফেলে রাখলে বা পুনরায় রাসায়নিক সার প্রয়োগ ছাড়া চাষ করলেই অরগ্যানিক খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব। কারণ চাষাবাদে ব্যবহূত বহুল প্রচলিত রাসায়নিক সারের অবশিষ্টাংশ তিন বছরে ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। অরগ্যানিক ফার্মিংয়ে বা জৈব কৃষিতে কৃত্রিম কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না বটে; কিন্তু সমালোচকরা বলেন, বহু প্রকৃতিদত্ত কীটনাশক পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকর নয়। জৈবসার দিয়ে চাষ করলে প্রথম এক থেকে দুবছর ফলন কিছুটা কম হবে।  তবে চার থেকে পাঁচ বছর পর রাসায়নিক সার দিয়ে চাষ করা জমির তুলনায় ফলন বেশি হবে।

দীর্ঘস্থায়ী উৎপাদন বাড়বে ও ফসল উৎপাদন খরচ কমবে

অনুসন্ধানে জার্মানির মতো দেশে অনেকেই বিশ্বাস করেন, অরগ্যানিক ফার্মিং হলো সেই মহৌষধি, যা দিয়ে একাধারে জলবায়ু ও পরিবেশকে বাঁচানো যাবে, অন্যদিকে ব্যাপক জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যার সমাধান করা যাবে। বিশ্বব্যাপী অরগ্যানিক ও প্রথাগত কৃষির মধ্যে উৎপাদনের ফারাক গড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ। এর মূল কারণ অরগ্যানিক কৃষি বিভিন্ন প্রকৃতিদত্ত উপাদানের ওপর অনেক বেশি নির্ভর। গিসেন-এর ইউস্টুস লাইবিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে অরগ্যানিক কৃষি বিষয়ের অধ্যাপক আন্ড্রেয়াস গাটিংগারের মতে, খাদ্যের অপচয় বন্ধ করে ও প্রকৃতিদত্ত কীটনাশক ব্যবহার করে শুধু হাজার কোটি কেন, বারোশ কোটি মানুষকেও খাওয়ানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে গাটিংগার ‘ল্যান্ড শেয়ারিং’-এর ওপর জোর দেন, যার মূলমন্ত্র হলো একই জমি কৃষি, বন্যপ্রাণী ও জলবায়ু সুরক্ষার কাজে ব্যবহার করা। তার মতে, অরগ্যানিক ফার্মিং ঠিক সেই কাজই করে। জৈবসার প্রয়োগ ও জৈব কীটনাশক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধানসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল এবং সবজির উৎপাদন খরচ শতকরা ২৫-৩০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। জৈবসার ব্যবহার করলে ফসলের উৎপাদন খরচ রাসায়নিক সারের চেয়ে শতকরা ৫০-৬০ শতাংশ কম হয়। জৈব পদ্ধতিতে জমিতে দীর্ঘ মূল ও স্বল্প দৈর্ঘ্যের মূল বিশিষ্ট সবজির সমন্বয় ঘটিয়ে মাটির উর্বরতা সংরক্ষণ করা সম্ভব। কম খরচে শস্যে এ ধরনের জৈব কীটনাশক ব্যবহার করে কৃষকদের অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যও রক্ষা করা সম্ভব।

আগ্রহ বাড়ছে জৈব চাষাবাদে

অরগ্যানিক কৃষি পদ্ধতিতে সাফল্য পেয়েছে আফ্রিকার দেশ উগান্ডা। দেশটির কৃষকরা সমসাময়িক আবহাওয়া ও মাটির গঠন নিয়ে অরগ্যানিক কৃষি আবাদে বিপ্লবের ডাক দেন। বর্তমানে দেশটির কৃষকরা ৭০-৮০ কোটি ডলারের অরগ্যানিক কৃষিপণ্য রপ্তানি করছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার পালডাংয়ের জানজি এলাকা। এলাকাটি জৈব কৃষি চাষের জন্য বিখ্যাত। জানজির কৃষকদের সফলতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সামগ্রিক কৃষির টেকসই উন্নয়নে অরগ্যানিককে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সিউল। একটি ছোট্ট এলাকায় অরগ্যানিক পদ্ধতিতে আবাদ-সাফল্য গোটা দক্ষিণ কোরিয়ার সামগ্রিক কৃষি পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।

‘দ্য ওয়ার্ল্ড অব অরগ্যানিক এগ্রিকালচার স্ট্যাটিসটিকস অ্যান্ড এমার্জিং ট্রেন্ড ২০১৮’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অরগ্যানিক এগ্রিকালচার এফআইবিএল। এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান হতাশার। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের পর থেকে বাংলাদেশে অরগ্যানিক চাষাবাদের জমি বাড়ছে না। ২০১৬ সালে ১০১টি অরগ্যানিক চাষাবাদের প্রকল্প চালু ছিল বাংলাদেশে; যাতে ৯ হাজার ৩০৩ জন উদ্যোক্তা সম্পৃক্ত রয়েছেন। তবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার অরগ্যানিক চাষাবাদ বাড়াতে ‘ন্যাশনাল অরগ্যানিক এগ্রিকালচার পলিসি-২০১৬’ বাস্তবায়ন ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘ন্যাশনাল অরগ্যানিক স্ট্যান্ডার্ড বোর্ড’ গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছে, যদিও সেটি এখনো পরিকল্পনা পর্যায়েই রয়ে গেছে। বাংলাদেশে মাত্র ছয় হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে অরগ্যানিক পণ্যের চাষাবাদ হচ্ছে, যা মোট আবাদি জমির মাত্র দশমিক ১ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে বর্তমানে ৫৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন জমিতে অরগ্যানিক চাষাবাদ হচ্ছে, যা মোট জমির ১.২ শতাংশ। এশিয়া মহাদেশে অরগ্যানিক চাষাবাদের হার দশমিক ৩ শতাংশ। অরগ্যানিক চাষাবাদে এ অঞ্চলে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে চীন ও ভারত। আর সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে শ্রীলঙ্কা। অরগ্যানিক কৃষি প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি একবারে কম নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রত্যাশা ভবিষ্যতে বিজ্ঞানভিত্তিক অরগ্যানিক পণ্যই বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে এবং বিদেশে রপ্তানি করে কোটি কোটি ডলার আয় করবে। এতে কৃষক পণ্যের অধিক মূল্য পাবেন এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশও থাকবে দূষণমুক্ত। বাংলাদেশ অরগ্যানিক প্রডাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশন (বিওপিএমএ)-এর  মাধ্যমে ইতোমধ্যে দেশের এক লাখ একর জমিকে অরগ্যানিক কৃষির আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। আগামী ২০২০ সালের মধ্যে পুরো দেশকে অরগ্যানিক কৃষির আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নিয়ে সংস্থাটি কাজ করছে।

সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ

বাংলাদেশে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘আইপিএম কার্যক্রম’ জৈব কৃষির বিস্তারে বিপ্লব ঘটিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের কৃষি বিভাগ ‘আইপিএম’ পদ্ধতিতে চাষাবাদের জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এ পদ্ধতিতে বিশেষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফসলের ক্ষেতের পোকা দমন করা হয়, যাতে করে রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর কৃষকের নির্ভরতা কমে আসে। ‘আইপিএম পদ্ধতি’ বা ‘সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা’র মাধ্যমে বালাই দমন ব্যবস্থাপনায় যেসব উপাদান পণ্য রয়েছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো উপকারী বন্ধু পোকার লালন ও পোকার সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করা। জৈব কৃষিতে উৎপন্ন শাকসবজি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশের বাজারে রপ্তানির কার্যক্রম আমাদের কৃষিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে, বয়ে আনতে পারে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। এ লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশে চলছে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা সহযোগিতামূলক গবেষণা সহায়তাকারী কার্যক্রম। বাংলাদেশের বিএআরসি, বারি, ব্রি, বিজেআরআই, বিএসআরআই, বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন এ প্রকল্পের আওতাভুক্ত। জানা গেছে, ২০০৫ সালের গোড়ার দিকে ‘উজবেকিস্তান সায়েন্টিফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট’র কৃষিবিজ্ঞানীরা বাংলাদেশের কয়েকজন কৃষিবিদের কাছে ‘উপকারী বন্ধু পোকা’র বাণিজ্যিক উৎপাদন কৌশল হস্তান্তর করেন। একই সময়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহায়তায় একজন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী কিছু পোকার সেক্স ফেরোমন উৎপাদন কৌশল হাতে-কলমে শিখিয়ে দেন। তখন থেকেই যাত্রা শুরু হলো বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে উপকারী বন্ধু পোকা ও পোকার সেক্স ফেরোমন ফাঁদ উৎপাদন। সফল গবেষণার পর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘আইপিএম’ কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন ফসল উৎপাদন এলাকায় উপকারী বন্ধু পোকা ওপোকার সেক্স ফেরোমন কৃষকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। কৃষকরা সানন্দে এগুলো গ্রহণ করেছেন এবং এর সুফল পেতে শুরু করেছেন।

সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেও জৈব কৃষি দ্রুত প্রসার লাভ করছে। বেসরকারি উদ্যোগগুলোর মধ্যে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), উবিনীগ, হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড, শিসউক ও বিসেফ ফাউন্ডেশন এই পাঁচ সংগঠনের যৌথ প্রচেষ্টা বাংলাদেশ ফুড সেফটি নেটওয়ার্ক (বিএফএসএন)। এই নেটওয়ার্ক জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সহযোগিতায় ২০১০ সালে গঠিত হয়। বর্তমানে এফএওর কারিগরি সহযোগিতায় ও বাংলাদেশ সরকার ও নেদারল্যান্ডস সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় দেশব্যাপী নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে তারা বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো জৈব কৃষি আন্দোলন অন্যতম।

 লেখক : কৃষি-অর্থনীতি বিশ্লেষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads