গণপরিবহন খাতে চলছে চরম বিশৃঙ্খলা। এ জন্য মূল্য দিতে হচ্ছে যাত্রীদের। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির পর বাস ভাড়া বাড়ানো হলেও এখনো আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। কিন্তু বাড়েনি যাত্রীসেবা। বাসে মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। আর অধিকাংশ বাসের ভেতরে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশ। সেইসাথে চালকরা সড়কের যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী তুলতে গিয়ে সৃষ্টি করছে যানজট। আর খোদ ট্রাফিক পুলিশের সামনেই চলছে ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং। যাত্রীদের শত প্রতিবাদকেও পাত্তা দেয় না বাসচালক, হেলপার বা কন্ডাক্টর।
রাজধানীর প্রগতি সরণির বসুন্ধরা গেট থেকে মালিবাগের আবুল হোটেল মোড় পর্যন্ত দীর্ঘ পথে বাস স্টপেজের সংখ্যা তিনটি। অথচ এ পথে চলাচলকারী বাসে যাত্রী ওঠানামা করছে আট থেকে ১১টি স্থানে। এর বাইরে ইচ্ছামতো যেকোনো জায়গায় থামিয়ে যাত্রী তুলতে দেখা যায় এসব গণপরিবহনকে। আর ভেতরে উঠতে হচ্ছে ধাক্কাধাক্কি করে। কেউ মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি। এছাড়া এই রুটে চলাচলকারী সব বাসের সিট কভারগুলো নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত। ভেতরটাও পরিষ্কার করা হয় না দীর্ঘদিন। ফলে আবারো করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন যাত্রীরা।
এছাড়া মাঝরাস্তায় গতি কমিয়ে চলন্ত অবস্থায় যাত্রী ওঠানামা করছে এসব বাসে। সেই সঙ্গে কার আগে কে যাবে, চলছে তার প্রতিযোগিতা। যাত্রী ওঠানামার নাম করে স্টপেজে বাসগুলো থামানো হয় আড়াআড়ি, যাতে পেছনের অন্য বাস পেরিয়ে যেতে না পারে। ফলে পুরো সড়কে যান চলাচল আটকে যায়। অন্যদিকে একই সড়কে ‘ওয়ে বিলের’ নামেও চলেছে স্টপেজের বাইরে বাস থামানো। প্রগতি সরণিতে এ তালিকায় আছে রাইদা, আলিফ, ইকবাল, ইউনিক, ভিক্টর, আকাশসহ আরও কয়েকটি পরিবহন।
এই দৃশ্য শুধু প্রগতি সরণির নয়; রাজধানীর গাবতলী থেকে যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর থেকে রামপুরা, এয়ারপোর্ট রোড থেকে মহাখালী-মগবাজার-মৌচাকসহ ২৯১টি রুটে এ চিত্র নিত্যদিনের।
এদিকে ভাড়া বৃদ্ধির পরও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে নেয়া হয়নি বিশেষ কোনো পদক্ষেপ। বাড্ডা লিংকরোড থেকে মহাখালী আমতলির দূরত্ব প্রায় ২ কিলোমিটার। ২ কিলোমিটারের রাস্তায় আগের ভাড়া ১০ টাকার স্থলে এখন নেয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। অথচ এই ২ কিলোতে ডিজেল খরচ হচ্ছে ১ লিটার। এই রুটে চলা বাসগুলোতে যাত্রীসংখ্যা দাঁড়ানো আর বসা মিলিয়ে ৫০ এর ওপরে। প্রতি জনে ৫ টাকা বেশি দিলে অতিরিক্ত নিচ্ছে ২৫০ টাকা। লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধির ডিজেলে ২৫০ টাকা লাভে চলছে বাসগুলো।
বনানী সৈনিক ক্লাব থেকে মেয়েকে নিয়ে মিরপুর-১২ তে যান পারভিন আক্তার। মেয়ে পড়ে শহীদ আনোয়ার স্কুলে। প্রতিদিন মেয়েকে নিয়ে আসা-যাওয়া করতে হয় তাকে। আগে প্রতিদিন আসা-যাওয়ায় দুজনে ৮০ টাকা দিতে হলেও এখন দিচ্ছেন ১০০ টাকা করে। পারভিন তার ভোগান্তির কথা উল্লেখ করে বলেন, আমার মেয়েকে নিয়ে প্রতিদিন বনানী সৈনিক ক্লাব আসা লাগে। আসা যাওয়ায় আগের থেকে ২০ টাকা বেশি ভাড়া গুণতে হচ্ছে। একটু কম ভাড়া দিতে চাইলেই বলে এটা সরকার বাড়িয়েছে আমাদের কি!! বাসের হেলপার দোষ চাপিয়ে দিচ্ছেন সরকার এবং বাস মালিকের ওপর।
প্রতিদিন বনানী থেকে কালশী যাতায়াত করেন নিজাম উদ্দিন। তিনি জানান, আগে বাস ভাড়া ২০ টাকা নিলেও এখন নিচ্ছে ২৫ টাকা। প্রতিদিন আসা-যাওয়ায় বাড়তি ১০ টাকা যেন তার গলার কাঁটা। নিজাম উদ্দিন ১২ হাজার টাকার বেতনে একটা চাকরি করেন কালশীতে। নিজাম বলেন, সরকার বাস ভাড়া বাড়ালেও বাড়েনি আমাদের বেতন। আমি একটা দোকানে কাজ করি। বেতন বাড়ানোর কথা বললে মালিক বলবে, চাকরি ছেড়ে দাও! তখন আমার কি হবে। অপরদিকে আগে খেয়ে কিছু টাকা বাড়িতে পাঠালেও এখন থেকে গুণতে হবে মাসে অতিরিক্ত ৩শ টাকা, যা আমাদের মতো গরিবের জন্য সহনীয় না।
ট্রাস্ট ওয়ান গাড়ির হেলপার বলেন, এটাতে আমাদের করার কিছু নেই। আমাদের ৫ টাকা করে বেশি নেওয়ার কথা আর তাই আমরা নিচ্ছি।
এদিকে ৫ টাকা করে বাড়তি ভাড়ার সাথে ডিজেলের মূল্য হিসাবে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ বাস মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, এটা অন্যায়, এদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। সুযোগ বুঝে এরা বাড়তি লাভ করে যাত্রীদের হয়রানি করছে। যারা এগুলো করছে তাদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। আমরা এদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাচ্ছি বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বেশি কেউ চাইলেই সাথে সাথে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, জরিমানা হচ্ছে। সুতরাং এদের দৌরাত্ম্য থাকবে না।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে চলা বাস-মিনিবাসের ৮৭ শতাংশ এ ধরনের নৈরাজ্যে শামিল। সারা দেশে ৭০ লাখ চালকের মধ্যে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) লাইসেন্স আছে মাত্র ১৬ লাখ চালকের। বাকিরা অদক্ষ। এদের সড়ক আইন বা ট্রাফিকব্যবস্থা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নেই।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৩১ লাখ। বাংলাদেশ বাস মালিক সমিতির তথ্য বলছে, শুধু রাজধানী ছাড়া সারা দেশে এক লাখের বেশি বাস চলাচল করে। আর রাজধানীতে চলাচল করে আড়াই হাজার কোম্পানির প্রায় ৩০ হাজার বাস।
রাজধানীর গণপরিবহনের বিশৃঙ্খল চলাচলের কারণে দেশকে বিরাট মূল্যও দিতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের জরিপ প্রতিবেদন বলছে, রাজধানীতে যানজটে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং এতে বছরে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার।
রাজধানীর বাস সার্ভিস সিস্টেমে বিশৃঙ্খলার জন্য দুটি বিষয়কে দায়ী করেন বাংলাদেশ বাস মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। তিনি বলেন, একটি হচ্ছে রাজধানীর বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের কাজটি এখনও সম্পন্ন না হওয়া। অন্যটি দক্ষ চালকের অভাব। এসব বিষয়ে তারা কাজ করছেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের কাজটি শেষ হলে সড়কে সৃষ্ট এ ধরনের বিশৃঙ্খলা আর থাকবে না। তিনি বলেন, রাজধানীতে যেসব চালক গাড়ি চালান, তারা বেশির ভাগই দক্ষ না। সমিতির পক্ষ থেকে তাদের বিআরটিএর মাধ্যমে একটা সময় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বছরখানেক এই ব্যবস্থা ছিল। এখন সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। এটি আবার চালু করতে তারা আবার উদ্যোগ নিয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা আনার দায়িত্ব ট্রাফিক পুলিশ, বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন এবং বাস মালিক সংগঠনের, তবে সড়কে গাড়ি চলাচলের ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থে তাদের কারোরই তেমন কোনো এনফোর্সমেন্ট ব্যবস্থা নেই। ফলে সড়কে প্রায়ই যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা হয় বা ট্রাফিক পুলিশের নিয়মিত মামলা-জরিমানার যে উদ্যোগ আছে, তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপির) যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক উত্তর) আবু রায়হান মোহাম্মদ সালেহ বলেন, আমরা ট্রাফিক সিস্টেমকে নিয়মের মধ্যে রাখতে যেখানে-যেখানে আইন প্রয়োগ করা উচিত, যেখানে আইন ভাঙা হয়, সেখানে আমরা আইন প্রয়োগ করি।
তিনি আরও বলেন, প্রতি মাসে ঢাকার পুলিশ কত টাকার মামলা দেয়, কতগুলো মামলা হয়, তার সংখ্যা ও পরিমাণ দেখলেই বুঝবেন, সেখানে আমাদের তৎপরতা কতটুকু। আমাদের সার্বিক তৎপরতা ও বিবেচনার লক্ষ্যই থাকে রাজধানীর ট্রাফিকব্যবস্থাকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা।





