সাভারে স্কুলছাত্রী নীলা রায় হত্যা ও তার আগে রাজধানীর উত্তরখানের সাকিব হত্যার পর এখন আবারো আলোচনায় এসেছে কিশোর গ্যাং। মনে করা হচ্ছে কিশোর গ্যাং গ্রুপ ক্রমেই ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। পরপর এমন দুটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর এ নিয়ে একদিকে যেমন উদ্বিগ্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, অন্যদিকে অভিভাবকরাও। আর এ কিশোর গ্যাং শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক বলা হলেও এখন তা সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু রাজধানীতে অন্তত ৪০টি গ্রুপ রয়েছে। যারা সক্রিয় থেকে নানা ধরনের অপরাধ করে যাচ্ছে।
নীলা হত্যার মূল আসামি মিজানুর রহমান ও তার দুই সহযোগীকে পুলিশ এরই মধ্যে আটক করেছে। দীর্ঘদিন ধরে মিজানুরের নেতৃত্বে ওই এলাকায় একটি কিশোর গ্যাং অপরাধ করে আসছিল। তারা মাদক ব্যবসায়ও যুক্ত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর নীলাকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়।
এর আগে রাজধানীর উত্তরখানে সাকিব নামের এক যুবককে এলোপাতাড়ি ছুরি মেরে হত্যা করা হয়। নিহতের নাম সোহাগ (২০)। গত ২৮ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর উত্তরখানের রাজাবাড়ি খ্রিস্টানপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত তরুণ উত্তরা কমার্স কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। হত্যায় জড়িতরা এলাকায় মাদকের কারবারে যুক্ত বলে দাবি করেছেন নিহতের স্বজনরা। এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারজনকে আটক করে পুলিশ।
উত্তরখান থানার ওসি হেলাল উদ্দিন বলেন, তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে মর্মান্তিক এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে যায়। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জড়িতদের শনাক্ত করতে কাজ শুরু হয়েছে। শিগগিরই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
জানা গেছে, শুধু ঢাকায়ই বিভিন্ন এলাকায় ৪০টির মতো কিশোর গ্যাং রয়েছে। পুলিশ সূত্র জানায়, গত এক বছরে তারা ঢাকায় অন্তত পাঁচটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এর মধ্যে উত্তরার কিশোর গ্যাং সবচেয়ে আলোচিত। সেখানে একাধিক গ্যাং রয়েছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে উত্তরায় ডিসকো এবং নাইন স্টার গ্রুপের দ্বন্দ্বে নিহত হয় কিশোর আদনান কবির। তার পরের মাসে তেজকুনিপাড়ায় দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে খুন হয় কিশোর আজিজুল হক। নারায়ণগঞ্জের বন্দরের ইস্পাহানী ঘাটে স্থানীয় দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে প্রাণ হারায় দুই স্কুলছাত্র। ১৫ জুলাই রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর পূর্ব রসুলপুর ৬ নম্বর গলিতে ছুরিকাঘাতে খুন হয় সজীব নামের এক তরুণ। সজীবের দূরসম্পর্কের চাচা সোহেল মিয়া বাংলাদেশের খবরকে জানান, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে তার ভাতিজাকে হত্যা করা হয়।
২৩ ফেব্রুয়ারি হাতিরঝিলে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে খুন হয় হাসনাত শিপন নামের এক তরুণ। গত বছরের ২০ ডিসেম্বর সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বের জের ধরে মুগদায় মান্ডার ল্যাটকার গলি বালুর মাঠে ছুরিকাঘাতে খুন হয় তরুণ মাহিন হোসেন। ১৮ নভেম্বর মিরপুরের শাহ আলী স্কুলের পেছনে কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে আহত হয় শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন রিফাত ও শাহেদ।
জানা গেছে, গত বছর ঢাকায় র্যাব-পুলিশের ব্যাপক অভিযানে অন্তত ৩০টি কিশোর গ্যাংয়ের দুই শতাধিক সদস্য গ্রেপ্তার হয়। তখন শনাক্ত হওয়া ৬২টি গ্রুপের মধ্যে অন্তত ৪০টি এখনো সক্রিয়। করোনা মহামারীর মধ্যেও হামলা, সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আলোচনায় আসছিল কিশোর গ্যাং।
বরগুনার আলোচিত নয়ন বন্ড গ্রুপও একটি কিশোর গ্যাং। তারাও মাদকসহ নানা অপরাধে জড়িত ছিল। তাদের আলাদা ফেসবুক গ্রুপও ছিল। সেই গ্রুপে আহ্বান জানিয়েই তারা রিফাতকে হত্যা করেছিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিজেদের বড় ও প্রভাবশালী বলে উপস্থাপন করতে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো, বাইক রাইডিং, অনলাইন ক্যাম্পিং, দেয়াল লিখনের মাধমে গ্যাংগুলো গড়ে উঠছে। এরপর মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, দল বেঁধে মাদকসেবন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, এমনকি মাদক কারবারেও জড়িয়ে পড়ছে এসব গ্রুপ। প্রতিটি দলে ১৪ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে অন্তত ১০-১৫ জন করে থাকছে। তবে দলনেতার বয়স তাদের চেয়ে বেশি, ১৮ থেকে ২৫ বছর। স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করে অপরাধ করতে মহল্লার বড় ভাই এবং রাজনৈতিক দলের নেতারা এসব দলনেতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তাদের হয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে এবং দখল ও চাঁদাবাজিতে দল ভারী করে উঠতি বয়সি এই অপরাধীরা। বস্তির দিনমজুর থেকে শুরু করে ধনীর দুলালরা এই চোরাবালিতে নিজের অজান্তেই পা দিচ্ছে।
মানবাধিকার, আইন, অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, কিশোর বয়সেই ক্ষমতাধর হয়ে ওঠার প্রবণতা থেকে গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে অনেকে। বড়রা তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে তৈরি করেন। অনলাইন কালচারের কারণে এখন দল গঠনের ধরন পাল্টাচ্ছে। গ্যাংগুলোকে যারা ব্যবহার করছে, তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করার পাশাপাশি ওই কিশোরদের সংশোধনেও গুরুত্ব দেন তারা।
ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষক ও বিশ্লেষক ড. কুদরাত-ই খুদা বাবু বলেন, শিশু-কিশোররা অপরাধী হয়ে ওঠার পেছনে হিরোইজম বা নিজেকে বড় মনে করা একটি বড় কারণ। এ ছাড়া অভিভাবকদের উদাসীনতা, বেড়ে ওঠার অসুস্থ পরিবেশ এবং অনলাইনের অপব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয় দায়ী। তবে এর প্রতিকারে আইনের প্রয়োগের চেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতনতা। সংশোধনব্যবস্থাও উন্নত করতে হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার নানা উপাদান এখন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে বিদ্যমান। দেশের সামাজিক অবস্থা, দুর্নীতি, অপরাধ, রাষ্ট্রীয় এবং পরিবারের মধ্যে যে অপরাধের বীজ রয়েছে কিশোররা তার বাইরে নয়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘কিশোররা দেখে অপরাধীরা হিরো। তারা দেখে বড়রা নানা অপরাধ করে ক্ষমতাবান হচ্ছে। ফলে তারাও সেই পথে যায়। তারা গ্যাং গঠন করে। নিজেকে ক্ষমতাবান করতে চায়। হিরো হতে চায়। গড়ে তোলে কিশোর গ্যাং।’
মানবাধিকার কর্মী ফিরোজ আলম সুমন বলেন, ‘এখানে পরিবার ও সমাজের সঙ্গে রাষ্ট্রেরও দায় আছে। রাষ্ট্র ও সমাজে ঘুষ, দুর্নীতি থাকলে আপনি ভালো সমাজ আশা করতে পারেন না। যেখানে ন্যায়বিচার নেই, সেখানে আপনি কিশোরদের কাছে আলাদাভাবে কীভাবে মূল্যবোধ আশা করেন, ভালো আচরণ আশা করেন?’
তবে তারা মনে করেন, এসব ক্ষেত্রে পরিবারেরও একটি বড় ভূমিকা আছে। কিন্তু চারপাশের পরিবেশ ঠিক না থাকলে শুধু পারিবারিক মূল্যবোধ দিয়ে কাজ হয় না। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবখানে মূল্যবোধ, সততা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, নিজেদের সিনিয়র বলে প্রতিষ্ঠার প্রবণতা থেকেই এই গ্রুপগুলো তৈরি হয়েছে। লেখাপড়া না করা কিশোরদের সঙ্গে স্কুল-কলেজের ছেলেরাও রয়েছে। দলগুলোর প্রধানরা বয়সে বড় থাকেন। উত্তরার বিগ বস, মাইরা ফালাইমুসহ কয়েকটি গ্রুপের লিডার বড় দেখা গেছে। আবার অনেকে স্বার্থ হাসিলের জন্য এদের ব্যবহার করে। হাতে ইয়াবা দিয়ে, বাইক দিয়ে জমি দখলে নিয়ে যায়। লোকবল বাড়ায়। এসব কারণেই কিশোর গ্যাং পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা যায়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি-মিডিয়া) ওয়ালিদ হোসেন বলেন, ‘লাগাতার অভিযানে এখন আর আগের মতো কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা শোনা যায় না। তারপরও পাড়া-মহল্লায় এদের সহযোগীরা গোপনে কার্যক্রম চালাতে পারে, এটাও অস্বীকার করা যাচ্ছে না। তবে এ ব্যাপারে আমরা সজাগ আছি।’





