প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ হবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, সব জায়গায় চ্যালেঞ্জ থাকে। চ্যালেঞ্জের সাথে সুযোগ-সুবিধাও থাকে। আমি সুযোগ-সুবিধায় বিশ্বাস করি। সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমেই বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ দেশে ফেরত আসবে বলে আমি আশাবাদী। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
প্রথা অনুযায়ী বাজেট ঘোষণার পরের দিন সংবাদ সম্মেলনে বাজেটের বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করেন অর্থমন্ত্রী। করোনা মহামারির কারণে প্রথা ভেঙে ২০২০-২১ অর্থবছরের ভার্চুয়ালি বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে অর্থ মন্ত্রণালয়। এরপর ২০২১-২২ অর্থবছরে সীমিত পরিসরের পাশাপাশি ভার্চুয়ালি বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলন করা হয়। অর্থাৎ তিন বছর পর গতকাল স্বাভাবিক নিয়মে বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলন করা হয়।
প্রস্তাবিত বাজেটে অনেক কঠিন সময় অতিক্রম করতে হবে বলে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এই অর্থবছরে অনেক চড়াই-উতরাই আসবে। তবে এবারের বাজেট বাস্তবায়ন হলে দেশের অর্থনীতি আগের তুলনায় অনেক শক্তিশালী হবে।
অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিজের চতুর্থ বাজেট প্রস্তাব প্রসঙ্গে মুস্তফা কামাল বলেন, গত তিন বছর তার দেওয়া বাজেটে কেউ ঠকেনি, এবারও কেউ ঠকবে না। তাই সবাইকে এ বাজেট প্রস্তাবের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি জানান, এই বাজেট প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সহায়ক বাজেট। দেশের মানুষের সহায়ক বাজেট। এই বাজেটে যারা ব্যবসায়ী তারাও উপকৃত হবে। যারা গরিব তারাও উপকৃত হবে। সবাইকে উপকৃত করার জন্য আমরা এই বাজেট তৈরি করেছি। গত তিন বছর যা বলেছি, তা-ই করেছি। আমি আবারও বলছি, গরিব হওয়া যে কত কষ্টের সেটা আমি ভালোভাবেই জানি। প্রত্যকটা গরিব মানুষের কথা আমরা চিন্তা করি।
এর আগে বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন। এতে তিনি মাত্র ৭ শতাংশ কর দিয়ে বিনা প্রশ্নে পাচারের টাকা দেশে ফিরিয়ে এনে বৈধ করার প্রস্তাব দেন।
এরপর গতকাল সকালে সংবাদ সম্মেলনে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাবের সমালোচনা করে বলেছে, পাচার হওয়া টাকা দেশে আনার উদ্যোগ অনৈতিক। এই টাকা কেউ দেশে ফেরত আনবে না বলেও জানানো হয় ওই সংবাদ সম্মেলনে। এছাড়া বাজেট ঘোষণার পর দেশের সব অর্থনীতিবিদ একই কথা বলেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা সিপিডির কালো টাকা সাদা করার সমালোচনা নিয়ে অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন। এ সময় অর্থমন্ত্রী উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, পাচারের টাকা ফিরিয়ে আনতে আপনারা বাধা দিয়েন না। বিদেশে পাচার করা টাকা দেশের মানুষের হক, সেগুলো ফেরত আনার চেষ্টা করছি। আমরা (সরকার) পাচার হয়ে যাওয়া টাকা দেশে ফেরত আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা করব। আশা করছি, টাকা ফেরত আসবে। তাছাড়া বাধা দিয়ে আপনাদের কী লাভ? তার চেয়ে এই অর্থ দেশে ফেরত এলে তা উন্নয়নে ব্যবহার করা যাবে।
এ বিষয়ে উত্তর দেওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রী প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরকে আহ্বান জানান। গভর্নর অবশ্য টাকা পাচারের অভিযোগই অস্বীকার করেন। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় পাচার করা টাকার কথা বলেননি। তিনি (অর্থমন্ত্রী) বলেছেন, বিদেশে অর্জিত টাকার কথা। দেশে অর্থ পাচার রোধে আইন আছে। বিএফআইইউসহ একাধিক এজেন্সি আছে। তারা সবসময় এ বিষয়ে কাজ করছে। এখন পর্যন্ত টাকা পাচারের কোনো প্রমাণ পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিএফআইইউ।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমাকৃত অর্থ সম্পর্কে যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, দেখা গেছে তার ৯৫ ভাগই বিদেশে অর্জিত। কিছু আছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেন নিষ্পন্নের অপেক্ষায় থাকা অর্থ।
তবে সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী অর্থপাচারের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, টাকার ধর্ম হচ্ছে, যেখানে রিটার্ন বেশি, সেখানে চলে যাওয়া। নানা কারণে দেশ থেকে টাকা চলে গিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু এই টাকা ব্রিফকেসে করে কেউ নিয়ে যায়নি। হুন্ডি বা অন্য কোনো উপায়ে নিয়ে গেছে। তাই অনুমান করা গেলেও প্রমাণ করা যায় না। এ কারণে এসব অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়াও সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, বিদ্যমান বাস্তবতায় বিদেশে পাচার হওয়া টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে এই টাকা জাতীয় অর্থনীতির স্রোতে এক হতে পারে। এমনও অনেকে আছে, টাকা পাচার যে অপরাধ তা-ও জানতো না। পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনলে ওই টাকার উৎস সম্পর্কে কেউ প্রশ্ন করবে না মর্মে যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সরকার তা নিশ্চিত করবে। কারণ প্রশ্ন করলে কেউ টাকা আনতে চাইবে না।
মুস্তফা কামাল বলেন, আমরা দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে কাজ করার চেষ্টা করি। এটা নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়। মালয়েশিয়াও এটি করেছে। তাছাড়া বিদেশ থেকে টাকা ফিরিয়ে আনার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, নরওয়ে, মালয়েশিয়াসহ একাধিক দেশ বিভিন্ন সময়ে এমন সুযোগ দিয়েছে। সব দেশই করে, আমরা কেন করব না। তাছাড়া, সব টাকাই ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা নয়। সিস্টেমের কারণেও টাকা কালো হতে বাধ্য হয়। ইন্দোনেশিয়ায় ২০১৬ সালে এমন একটি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তখন তারা ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশ থেকে নিয়ে এসেছিল। সব টাকা কালো টাকা নয়। কিছু টাকা বিভিন্ন কারণে কালো টাকা করতে হয়। আমরা বিশ্বাস করি এবার আমরা সফল হবো। তাই সুযোগ-সুবিধা দিলে টাকা কিন্তু আসবে, কেন আসবে না। এ সময় অর্থমন্ত্রী কালো টাকাকে ভিন্ন নামে উল্লেখ করে বলেন, কালো টাকা না বলে আমরা অপ্রদর্শিত টাকা বলছি। সেই টাকাগুলোর জন্যই আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি।
অর্থমন্ত্রী জানান, ডিজিটাল মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে। নানা কারণে টাকা পাচার হয়, কোনো প্রমাণ ছাড়া এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে প্রমাণসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পি কে হালদারের সম্পদ বা অর্থ ভারত সরকার ফেরত দেবে। কানাডা সরকারও আমাদের জানিয়েছে সেখানে পাচারকৃত টাকা ফেরত পাঠাতে সহযোগিতা করবে।
পাচার করা টাকা দেশে আনা প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ট্রুথ কমিশনের কার্যক্রম কোনো আইন দ্বারা বৈধ ছিল না। এবার বিদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার সিদ্ধান্ত সংসদে প্রণীত আইন দ্বারা নেয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম, রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, এনবিআরের চেয়ারম্যান, অর্থ সচিব, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবরা।





