ঝালকাঠির সুগন্ধানদীতে বরগুনাগামী যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি অভিযান-১০ এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৪১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন আরো শতাধিক। ঘটনার দ্বিতীয় দিন গতকাল শনিবার সকাল থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে অভিযান চালায় ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড ও নৌপুলিশ সদস্যরা। তবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কোনো মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়নি।
স্বজনহারা ব্যক্তিদের দাবি কমপক্ষে শতাধিক মানুষ প্রাণ বাচাঁতে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে এখনো তারা নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের সন্ধানে সুগন্ধার তীরে অপেক্ষায় আছেন অনেকেই। কেউ আবার ট্রলার ও ছোট ছোট নৌকা নিয়ে নদীর বিভিন্ন প্রান্তে খুঁজে বেড়াচ্ছেন প্রিয়জনকে। কারো হাতে নিখোঁজদের ছবি। তা নিয়ে নদী তীরের বাসিন্দাদের দেখাচ্ছেন, আর বিলাপ করছেন। কেউ আবার সুগন্ধ্যা নদী তীরের মিনিপার্ক, ডিসিপার্ক, লঞ্চঘাট এবং ঘটনাস্থল দিয়াকুল এলাকায় ঘুরছেন। অন্তত নিখোঁজ স্বজনদের মৃতদেহ যেন বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন, সেই অপেক্ষায় আছেন স্বজনরা। এদিকে সকাল ৮টা থেকে ঝালকাঠি ও বরিশালের ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিদল এবং কোস্ট গার্ডের একটি টিম শহরের লঞ্চঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। নিখোঁজদের উদ্ধারে ডুবুরিদল সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করেছেন। ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড ও নৌপুলিশের পাশাপাশি জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সদস্যরা উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করছেন।
এ ঘটনায় কতজন নিখোঁজ রয়েছেন তার সঠিক হিসাব এখনো কেউ দিতে পারছেন না। দুর্ঘটনার পর শুক্রবার সকাল থেকে সুগন্ধা তীরের দিয়াকুল গ্রামে, ঝালকাঠি সদর হাসপাতাল ও বরিশাল শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় হাসপাতালে আসতে থাকেন নিখোঁজদের স্বজনরা। তাদের আহাজারিতে ভারী সুগন্ধা তীর এবং হাসপাতালের পরিবেশ।
ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও নৌ-মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটির সদস্য ও জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান মো. নাজমুল আলম জানান, ৩৭ জনের মরদেহ ইতোমধ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬ জনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৩১ জনের জন্য স্বজনদের সন্ধান চলছে। পোড়া মরদেহগুলোর চেহারার কোনো আকৃতি বোঝা যাচ্ছে না। তাদের স্বজনরাও এসে খুঁজছেন। নদীতে একাধিক টিম উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
স্বজনদের খোঁজে আসা বাবুল জানান, তার ভাইয়ের মেয়ে সোনিয়া (২৫), সোনিয়ার দুই ছেলে জুবায়ের (৬) ও জুনায়েদ (২) এবং তার মা রেখা বেগম দুর্ঘটনা কবলিত অভিযান-১০ লঞ্চে করে বরগুনার তালতলী উপজেলার ছোটবগি গ্রামে যাচ্ছিলেন। লঞ্চে আগুন লাগার পরপরই সোনিয়া তার ছয় বছরের শিশু জুবায়েরকে নিয়ে সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও দুই বছরের জুনায়েদ ও রেখা বেগমকে এখনও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
রগুনার বামনা উপজেলার বুকাবুনিয়া গ্রামের উত্তম হালদার (৩৫) খুঁজছিলেন ভাইয়ের ছেলে কৃষ্ণ হালদারকে (১৪)। নিখোঁজ কৃষ্ণ ঢাকার উত্তরার একটি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। কৃষ্ণ হালদার মা গীতা রানি ও ছোটভাই প্রত্যয়কে নিয়ে বামনার গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিল। উত্তম হালদার বলেন, দুর্ঘটনার পর গীতা রানি প্রত্যয়কে নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেন। তারা তীরে উঠতে সক্ষম হলেও কৃষ্ণ নিখোঁজ।
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার দেউলী গ্রামের বাসিন্দা মো. রনি (১৫) খুঁজছিল মা রীনা বেগম ও বোন লিমাকে। বার বার আহতদের শয্যার কাছে গিয়ে মা আর বোনকে না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে রনি। রনি নিজেও এ ঘটনায় আহত হয়েছে।
এঘটনায় গতকাল সকাল দশটার দিকে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব তোফায়েল হাসানের নেতৃত্বে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ৭ সদস্যের তদন্ত দল ঝালকাঠির লঞ্চঘাট এলাকায় এসে আগুনে পুরে যাওয়া লঞ্চটি পরিদর্শন করেন। লঞ্চের ইঞ্জিনরুমসহ বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখেন তারা। তদন্ত কমিটির সঙ্গে ছিলেন সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী মো. শাহজাহান খান (এমপি)।
সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান বলেন, লঞ্চ দুর্ঘটনার কারন উদ্ঘাটন এবং দোষীদের চিহ্নিত করতে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। এদের রির্পোট অনুযায়ই আমরা বুঝতে পারব দুর্ঘটনার আসল কারণ। যারা এর জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়াও লঞ্চ দুর্ঘটনার কারন উদ্ঘটনের জন্য গতকাল স্থানীয় প্রশাসনের গঠন করা তদন্ত কমিটি, ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটি লঞ্চটি পরিদর্শন করেছে। এছাড়া জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ঝালকাঠি লঞ্চঘাটে একটি কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে।
উদ্বার অভিযানের ব্যাপারে লকাঠির জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী বলেন, কতজন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন আমরা তা সঠিকভাবে জানি না, তাই নিখোঁজদের মৃতদেহ উদ্ধারে আরও কয়েকদিন অভিযান অব্যাহত থাকবে।
যাত্রীবাহী লঞ্চ অভিযান-১০ এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঝালকাঠি থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত শুক্রবার রাতে সদর উপজেলার পোনাবালিয়া ইউনিয়নের দিয়াকুল এলাকার গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার) মো. জাহাঙ্গীর হোসেন এ অপমৃত্যু মামলাটি দায়ের করেন। তিনি লঞ্চ দুর্ঘটনাস্থলের বাসিন্দা।
ঝালকাঠি থানার ওসি মো. খলিলুর রহমান জানান, মামলাটি তদন্তের জন্য ঝালকাঠি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. নজরুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী লঞ্চটিতে আগুন লাগে। খবর পেয়ে বরিশাল, পিরোজপুর, বরগুনা ও ঝালকাঠি ফায়ার সার্ভিসের দমকল বাহিনী শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। র্যাব, নৌপুলিশ, কোস্ট গার্ড ও ফায়ার সার্ভিস উদ্ধারকাজ শুরু করে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ৩৭ জনের বাড়িই বরগুনায়। দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আরো অনেকে। তবে কতজন নিখোঁজ আছে তার সঠিক তথ্য নেই কারো কাছে।





