মঈনুল হক খান
আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার সবচেয়ে বেশি জরুরি। সেক্ষেত্রে আমরা কতটা পিছিয়ে আছি সেটা তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু এই প্রযুক্তি নির্ভরশীলতা অনেকাংশেই সহজ করে দিয়েছে আমাদের জীবনযাত্রা। মহামারির অস্থির এই সময়টা সেই নির্ভরশীলতাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা সকলেই বুঝতে পেরেছি আমার চাইলেই দূরে থেকেও কাছাকাছি থাকতে পারি। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, পড়াশোনা, দাপ্তরিক কাজকর্মসহ সবক্ষেত্রেই প্রযুক্তির সফল ব্যবহার প্রশংসা কুড়িয়েছে। খুব নির্দিষ্ট করে বললে, অনলাইনে অডিও-ভিডিও কলিং প্ল্যাটফরমগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। গুগল ক্লাসরুম, গুগল মিট, জুম, স্কাইপিসহ অনেক অ্যাপস এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।
এসব প্ল্যাটফরমের কল্যাণে অন্যান্য সেবার মতো শিক্ষাব্যবস্থাও অনেকাংশেই সচল রয়েছে। করোনা মহামারির এই সময়টা বেশ দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রাথমিক, মাধ্যমিকসহ সকল স্তরের শিক্ষার্থীরাও যুক্ত হয়েছে অনলাইনের এই শিক্ষা কার্যক্রমে। পড়াশোনার সুবিধার্থে অভিভাবকরা বাধ্য হচ্ছেন সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ ও ইন্টারনেট তুলে দিতে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-বিটিআরসির ২০১৬ তথ্যমতে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৩৫ শতাংশ হচ্ছে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। মানে এদের বেশিরভাগই শিশু-কিশোর। এই করোনা পরিস্থিতি সেই সংখ্যাটা হু হু করে বাড়িয়েছে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী পর্যন্ত। আমাদের শিশু-কিশোররা এসবের সদ্ব্যবহার করতে পারছে কি? সেটা নিয়ে ভাবার এবং বিকল্প কিছু ভাবারও সময় এসেছে।
প্রযুক্তির প্রতি আমাদের নির্ভরতায় সুফলের কথা বলতে গেলে বেশকিছু ক্ষেত্রের কথাই বলা সম্ভব। কিন্তু আমরা খুব সম্ভবত দীর্ঘমেয়াদি বড় এক বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে চলেছি। যার কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে এর অপব্যবহারের কথা। শিশু-কিশোর, তরুণদের কাছে মোবাইল, ইন্টারনেটের এই সহজপ্রাপ্যতা তাদের শুধু পড়াশোনাতেই সীমাবদ্ধ রাখেনি। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা তাদের হাত পাকাতে সাহায্য করছে স্মার্টফোনের নানাবিধ ব্যবহারে। এরই বহিঃপ্রকাশ টিকটক, লাইকি নামক অ্যাপসগুলোতে তাদের পদচারণা। অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, বিষয়বস্তু আর সবচেয়ে ভয়ংকর কিশোর গ্যাংয়ের ছড়াছড়ি। এসবের আড়ালে যৌনতা আর মাদকের ভয়াবহতার কথা সামনে আসছে। তাতে অতি অল্প বয়সেই তারা ঝুঁকে পড়ছে অপরাধ জগতে, যা আমরা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেই দেখতে পাচ্ছি। এদের একটা অংশ আশংকাজনক হারে আসক্ত হচ্ছে পর্নোগ্রাফিতেও। আর এসবেরই অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার দরুণ বিবাদ, প্রতিশোধ পরায়ণতা, হত্যার মতো ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে।
এছাড়াও বিভিন্ন গেমিং অ্যাপসগুলোতে তাদের আসক্তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনাকালীন দীর্ঘ ছুটিতে অফুরন্ত সময় তাদের হাতে। যার অধিকাংশই ব্যয় হচ্ছে মোবাইল, ট্যাব আর ল্যাপটপে। যাদের খেলার মাঠে পাওয়া যেত, তাদেরই এখন পাওয়া যাচ্ছে খেলার মাঠের পাশের রাস্তায়; যেখানে সারিবদ্ধ বা গোল হয়ে বসে তারা মোবাইল গেমসে নিমগ্ন। ফ্রি ফায়ার অথবা পাবজি নিয়ে ব্যস্ত তারা। তাদের সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে আপনি শুনতে পাবেন, ‘এই মার মার...হেল্প হেল্প..,জলদি কর জলদি কর’ এমন সব বাক্য। কিন্তু এসবের সবই এই গেইমগুলোকে কেন্দ্র করে। দলবদ্ধ হয়ে মাঠের খেলাধুলায় শারীরিক, মানসিক সুস্থতার বিষয়টি এখন অনলাইন গেমসের হিংস্রতায় বন্দি। ফলে এই শিশু-কিশোররা সুস্থ বিনোদনের ঘাটতি নিয়ে বেড়ে উঠছে বলে বিশেষজ্ঞ মত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে ভিডিও গেমসের প্রতি আসক্তি একটা মানসিক অসুখ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন গেমসের প্রভাবে তাদের মধ্যে হঠাৎই অতিরিক্ত রেগে যাওয়া, মারমুখী হয়ে ওঠা, প্রতিশোধ পরায়ণতা, উদ্ভট অঙ্গভঙ্গি সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহতা সামনে আসার পর এসব ভিডিও গেমসের প্রভাব এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথা বলতেই আমরা ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম— এসবই বুঝি। এসব মাধ্যম আমাদের একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ সহজতর করেছে। কিন্তু আমাদের আবেগ, অনুভূতির সঠিক প্রকাশও সীমিত করে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা সকলেই প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে নিমগ্ন থাকছি। সর্বক্ষণই এসব মাধ্যম হতে নতুন কিছু জানার তাগিদ আমাদের মধ্যে কাজ করছে। যেটা এই করোনা মহামারী পরিস্থিতিতে আশংকাজনক হারে বেড়েছে। সেক্ষেত্রে বেড়েছে গুজব রটনার পরিমাণও। গণপরিবহনে চড়ার সময়, রাস্তাঘাটে হাঁটার সময় আমরা ফোন হাতে সেসব নিয়েই ব্যস্ত হয়ে যাই। এর ফলে আমরা রাস্তাঘাটে চলাচল করার সময় প্রায়ই নানাবিধ দুর্ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছি। ঘরোয়া, সামাজিক কিংবা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডায়ও আমরা ফোন হাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিমগ্ন থাকি। এসব কিছু থেকে শিশু-কিশোররাও মুক্ত নয়। তারাও অধিক পরিমাণে সময় ব্যয় করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। মা-বাবারাও অনেক সময় ধরে ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মগ্ন থাকছেন। যার প্রভাব সন্তানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে স্বাভাবিক মানসিক ভারসাম্যও লোপ পাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অধিক পরিমাণে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের নানা সমস্যায়ও জর্জরিত হচ্ছে অনেকে।
এসব ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবারা সন্তানদের হাতে ফোন তুলে দেওয়ার আগে কিছু বিষয়ে যথেষ্ট ধারণা থাকা উচিত। যেমন— কোন কোন গেমস সন্তানের কৌতূহল থেকে নেশায় পরিণত হতে পারে সে-সম্পর্কিত ধারণা রাখা। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ট্যাব সে কতটা ব্যবহার করছে, কতটা তার জন্য নিরাপদ— সে বিষয়েও অবগত থাকতে হবে। সন্তানের সৎসঙ্গ নিশ্চিত করা এবং সে সম্পর্কিত ব্যপারে সচেতন থাকাও আবশ্যক। সন্তান ও পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে খেয়াল রাখা অভিভাবকদের দায়িত্ব। কেননা কেউ যদি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়, তাকে সঙ্গ দিতে হবে। আমাদের সচেতনতা আর যত্নশীল আচরণই কমাতে পারে প্রযুক্তির অপব্যবহার। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার আমাদের আগামী প্রজন্মকে সমৃদ্ধ করুক, এটাই আমাদের কাম্য।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া





