জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক:
বান্দরবানের থানচি ও রুমায় কয়েক দফা সন্ত্রাসী হামলা ও ব্যাংক ডাকাতির মধ্য দিয়ে নতুন করে অলোচনায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এই কেএনএফ তাদের অস্ত্রের মজুত বাড়িয়েছে। শক্তি বৃদ্ধি করেছে তাদের সশস্ত্র শাখার। কয়েকটি গ্রুপে ভাগ হয়ে তারা ধারাবাহিকভাবে হামলা করছে। আগের তুলনায় ৩-৪ গুণ সদস্য বাড়িয়ে এখন আরও শক্ত অবস্থানে কেএনএফ। তাদের সক্রিয় নারী সদস্যরা ব্যাংক ডাকাতি ও থানচি থানা হামলায় সরাসরি অংশ নেয়। সংগঠনটির সশস্ত্র সন্ত্রাস দমাতে কম্বিং অপারেশন শুরু করেছে যৌথ বাহিনী। বিভিন্ন বাহিনীর সম্মিলিত এ কার্যক্রমের নেতৃত্বে রয়েছে সেনাবাহিনী।
এদিকে, কেএনএফের সশস্ত্র গ্রুপের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক চেওসিম বমসহ (৫৫) দুইজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। চলমান অভিযানে র্যাব-১৫ এর একটি দল তাকে গ্রেপ্তার করে।
এদের মধ্যে চেওসিম বম জেলার ৪নং সুয়ালক ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের শারণ পাড়ার মৃত রোয়াল খুব বমের ছেলে। আর গ্রেপ্তার অপরজনের নাম রোয়াল লিন বম (৫৫)। র্যাব-১৫ এর কোম্পানি কমান্ডার লে. কর্নেল এসএম সাজ্জাদ হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
র্যাব বলছে, রোয়াল লিন বম এবং চেওশিম বম বান্দরবানে প্রথম কেএনএফ গঠন করে। তাদের সঙ্গে কেএনএফ প্রধান নাথান বমের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিতে জঙ্গি নেতা শামীম মাহফুজের সঙ্গে কেএনএফের যে চুক্তি হয়েছিল সেটি হয়েছিল চেওশিম বমের বাসায়।
জানায়, চওশিমকে তার বাড়ির একটা লোহার লকারে পাওয়া গেছে। তিনি সেখানে লুকিয়ে ছিলেন। সেটা বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল। তালা ভেঙে তাকে বের করা হয়।
গতকাল দুপুরে বান্দরবান ৬৯ সেনা রিজিয়ন মাঠে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ। সেনাপ্রধান এদিন বেলা ১১টায় বান্দরবান সেনা জোনে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি জরুরি বৈঠকে বসেন। পরে তিনি চলমান পরিস্থিতিতে পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
সেনাবাহিনী প্রধান এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বান্দরবানে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার, অস্ত্র উদ্ধার ও এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে সমন্বিত অভিযান শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার ও দুটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। সন্ত্রাসীরা নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলমান থাকবে।
তিনি আরো বলেন, সংগঠনটির সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের শান্তি আলোচনা চলছিল। আলোচনা চলাকালে তাদের বিরুদ্ধে আমরা কোনো অভিযান করিনি। তারা দুইবার শান্তি আলোচনায় বসেছে। তৃতীয় বার বসার কথা বলেছে। তাদের স্টার সানডেতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রুমার গির্জায় উপহার পাঠানো হয়েছে। আমরা তাদের বিশ্বাস করেছিলাম। তাদের ষড়যন্ত্র আমরা বুঝতে পারিনি।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার কাছে প্রধানমন্ত্রীর পরিষ্কার নির্দেশনা রয়েছে। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য, জনগণের শান্তির জন্য যা করণীয় তা করতে।
যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে কিছু সন্ত্রাসীকে আটক করেছে, অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সেনাবাহিনী সক্ষম। ইনশাআল্লাহ জনগণের মাঝে শান্তি ফিরে আসবে। জনগণ দেখবে কোনো সন্ত্রাসীদের জায়গা বাংলাদেশের মাটিতে নেই।
পরবর্তী সময়ে এই সংগঠনটির সঙ্গে সব শান্তি আলোচনা বন্ধ সহ অপতৎপরতা কার্যক্রম নির্মুলে কঠোর অভিযান পরিচালনার ঘোষণা আসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সামরিক বাহিনীর পক্ষ হতে।
ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেনাপ্রধানকে অভিযান পরিচালনার বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন।
কেএনএফের স্থানীয় প্রধান সমন্বয়ক চেওসিম বমকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন র্যাব-১৫-এর অধিনায়ক লেফটেনেন্ট কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ বলেন, অভিযান চলমান রয়েছে। নাথান বমের সঙ্গে আত্মীয়তা সম্পর্ক রয়েছে চেওসিম বমের। বান্দরবানের শারণ পাড়ার মৃত রোয়াল খুব বমের ছেলে চেওসিম। আমরা চেওসিমকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অন্যদের অবস্থান ও পরিকল্পনা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছি।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, বান্দরবানের থানচি ও রুমায় ব্যাংক ডাকাতি ও অস্ত্র লুটের ঘটনার পর পাহাড়ি সন্ত্রাসীগোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) বিরুদ্ধে সম্মিলিত কার্যক্রম চলমান। বর্তমানে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো অবস্থা নেই। কুকি-চিন যে আক্রমণ করেছে আমরা সবাই মিলে তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা করে কার্যক্রম চলমান রেখেছি। ইতোমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কিছু কার্যক্রমের খবর আসছে, আগামীতে আরও ভালো খবর আসবে। আমরা সবাইকে আশ্বস্ত করতে চাই কুকি-চিনের বিরুদ্ধে আমরা সবাই মিলে কাজ করছি। এখন আতঙ্কিত হওয়ার মতো অবস্থা নেই।
তিনি আরো বলেন, সবাইকে আশ্বস্ত করতে চাই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। এ কারণে আমরা যেভাবে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণে করেছি, পাহাড়ে সন্ত্রাসবাদ বিরুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীসহ সকলে একসঙ্গে কাজ করছি। পাহাড়ের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যারা পাহাড়ে অপরাধ সংঘটনে জড়িত রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থাগ্রহণ হবে।
উল্লেখ্য, পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠন কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) জেলার রুমা ও থানচি উপজেলায় ব্যাংকে হামলা চালিয়ে টাকা লুট, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের অস্ত্র লুটসহ সোনালী ব্যাংক রুমা শাখার ম্যানেজারকে অপহরণ করে। পরে র্যাবের মধ্যস্থতায় অপহৃত ব্যাংক ম্যানেজারকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।





