জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক স্যারের একটা কথা দিয়ে শুরু করি। তিনি বলেছিলেন, ‘একটা সমাজ কোন দিকে যাইতাছে সেইটা বুঝনের লাইগা আপনি দেখবেন তারা কী খায় আর কী পড়ে। কী খায় সেটা দেখার জন্য যাইবেন কাঁচাবাজারে। আর কী পড়ে সেইটা দেখার জন্য যাইবেন লাইব্রেরিতে (আহমদ ছফা : যদ্যপি আমার গুরু)।’ মোটামুটি ভাব এটাই, ভাষা কিছুটা ভিন্ন। রাজ্জাক স্যারের কথাটাকে মানদণ্ড ধরে বাংলাদেশর মানুষের বিশেষ করে যুবা-তরুণদের চিন্তার বিকাশ, দিক ও গতির অবস্থা কী সেটা বোঝার জন্য এবারের বইমেলায় এবং রকমারিতে বেস্ট সেলার বই ও বেস্ট সেলার লেখকদের তালিকাটাই যথেষ্ট। ১৫ এপ্রিল সকালে রকমারিতে ঢুকে তাদের বেস্ট সেলার বই ও লেখকের তালিকাটা দেখলাম। তাতে একজন মাত্র লেখক রয়েছেন যাকে প্রকৃতই লেখক বলা যায় এবং যার বই পড়ে জ্ঞানগত উন্নতি হবে। তিনি হচ্ছেন মুহিউদ্দীন আহমদ। দুঃখজন সত্য হচ্ছে, তিনি তালিকার ৪ নম্বরে আছেন। তার ওপরে আছেন আরিফ আজাদ। আমি আরিফ আজাদের বই পড়েছি। কিনে পড়ার মতো রুচি নেই। আরজ আলী সমীপে বইটা পিডিএফ পড়েছি। প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ বইটা হাতে নিয়ে পুরোটা পড়ার রুচি হয়নি। এত নড়বড়ে ও দুর্বল গদ্য পড়তে সাধারণত আমার রুচি হয় না। এ ছাড়া তার ‘বেলা ফুরাবার আগে’ বইটা একজন উপহার দিয়েছিল সেটাও খানিকটা উল্টে দেখেছি। বলতে গেলে ‘পরকালের মোটিভেশনাল’ বই একটা। পরকালের মোটিভেশনাল বইকে খারাপভাবে দেখার সুযোগ নেই। আরিফ আজাদের বইয়ের জনপ্রিয়তা এটাই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের মুসলমান সমাজ ইসলামের বেসিক জ্ঞানার্জনের জন্য কোরআন-হাদিস তো পড়েই না, এমনকি ইসলামের প্রাথমিক যুগে রচিত মৌলিক কিতাবাদিও তারা পড়ে না। বলতে গেলে নামই শোনেনি। আর তার বড় প্রমাণ এই লেখক নিজেই। আল-হাদিসে অনার্স করছে; কিন্তু ড. মুহাম্মদ ত্বহানের তাইসিরুল মুস্তালাহাল হাদিস বইটা ‘টপ টু বটম’ পড়েনি। এমনকি হাদিস শাস্ত্র নিয়ে বেসিক ক্লিয়ার না। আরিফ আজাদের বই বিক্রি এত হওয়ার বড় একটা কারণ বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে ইসলাম নিয়ে বেসিক ক্লিয়ার নেই। বাঙালি মুসলিম সমাজ যখন দেখছিল আধুনিকতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ইসলাম প্রশ্নবাণে জর্জরিত তখন তাদের বিশ্বাসের দরজা দারুণ আঘাতের শিকার হয়েছে। যখন আরিফ আজাদ সেই আহত ঈমানের পাশে তার একেবারেই নড়বড়ে যুক্তি নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন তখন তাকে গিলে খেয়ে ঈমান তাজা করতে চেষ্টার কসুর করেনি।
তালিকার তিন নম্বরে আছেন মিজানুর রহমান আজহারী নামে একজন প্রসিদ্ধ ওয়াজেন। যিনি বেশ ভালো ওয়াজ করেন, তবে প্রচুর বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে বক্তার বক্তব্যে সম্মোহনী ক্ষমতা বেশি থাকা মানেই সে সঠিক, বিষয়টা এমন নয়। মিজানুর রহমান আজহারীর বক্তব্যের ভ্রান্তির দিক হলো তিনি যখন কোরআন বা হাদিসের আরবি এবারত বাংলায় বলেন সেটা বিকৃত করে ফেলেন। বলতে গেলে রং চড়িয়ে অনুবাদ করেন, যেটা করা ঠিক নয়। কারণ এতে কোরআন ও হাদিসের অর্থের ভুল ব্যাখ্যার সূচনা হয়। তা ছাড়া বক্তব্যের মধ্যে যখন কোরআন বা হাদিস থেকে তার বলা কথার প্রমাণ দেওয়া দরকার তখন তিনি ইসলামী সংগীত গেয়ে সেটার জরুরত মিটিয়ে দেন। এটা পুরোপুরিই ভুল। এবার আসি তার বই নিয়ে। তার বইটিও ইসলামী মোটিভেশনাল বই। তিনি বইয়ে কী বিষয়ে লিখেছেন, তার লেখার ধরন কী হতে পারে এবং তার জ্ঞানগত গভীরতা কত, তা বোঝার জন্যই তার ওয়াজ নিয়ে ওপরের পর্যালোচনা করলাম। জনাব আজহারীর ভক্ত মূলত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া যুবা-তরুণ।
তার মানে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম ইসলাম জানার জন্য কোরআন-হাদিস সরাসরি অধ্যয়ন ও ইসলামের প্রাথমিক যুগে সালফে সালেহিনদের রচিত কিতাবাদি অধ্যয়নের চাইতে বেশি নির্ভরশীল হচ্ছেন উক্ত বইগুলোর ওপর। তারা যে স্পিরিট থেকে উক্ত বইগুলো পড়ছেন সেটা হচ্ছে ধর্মকে ভালোভাবে জানা। কিন্তু তারা সত্য উদ্দেশ্য নিয়ে যা পড়ছেন এতে তারা ধর্মের বিশ্বাসকে যৌক্তিকতা থেকে অন্ধত্বে পরিণত করবেন, যা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। কোরআনের প্রথম নির্দেশ ইকরা (সুরা আলাক)। এই পড়া বলতে কেবল ধর্মীয় পড়া নয়; পড়াটা ব্যাপকার্থে পড়া। তার একটা উদাহরণ হচ্ছে, বদর যুদ্ধে (ইসলামের প্রথম যুদ্ধ) যেসব অমুসলিম আটক হয়েছিল মহানবী তাদের কিছু লোকের মুক্তিপণ হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন মুসলিম যুবকদের শিক্ষা দেওয়া। তার মানে জ্ঞান শিক্ষা সেটা অমুসলিমের কাছে হলেও করতে হবে। বিশ্বাসের মৌলিক যে ভিত্তি সেটাকেও জেনে করতেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই বাঙালি মুসলিম তরুণদের মধ্যে ধর্মকে জানার যে স্পিরিট সেটা দারুণ ইতিবাচক। কিন্তু তারা যে মাধ্যম থেকে জানছেন সেটা তাদের নির্মম নেতিবাচক বিশ্বাসী করে তুলছে এবং তুলবে। কারণ তারা ধর্মকে জানতে গিয়ে বিজ্ঞান, যুক্তি, অনুভূতি ও ধর্মের ভেদ ভুলে একেবারে জল-কাদা করে ফেলছেন। আরিফ আজাদ বা এই ধরনের লেখকদের বই পড়ে সেই জল-কাদার দশা করাটা খুবই স্বাভাবিক। এই লেখকরা বিশ্বাসকে সবসময়ই বিজ্ঞান ও যুক্তির নিরিখে মাপতে চেষ্টা করেছেন। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, বিজ্ঞান ও যুক্তি অনুভূতিশূন্য। আর ধর্ম হচ্ছে অনুভূতি ও বিশ্বাসের বিষয়। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, মহানবী মেরাজে গিয়েছেন এর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। বরং এটা নবীদের মোজেজা এটাই হচ্ছে বিশ্বাস। একইভাবে ‘হাতের ইশারায় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করা’ এটাও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ সম্ভব নয়; কিন্তু মোজেজাগত দিক থেকে এটা একটা বিশ্বাস।
এরপর তালিকায় আছে সাদাত হোসাইন। তার লেখায় একদমই মুখ দেওয়া প্রায় অসম্ভব আমার কাছে। এ কথায় সাদাত ভক্তরা রাগান্বিত হবেন। সাদাত হোসাইন কিংবা তার সমকালীন আর যে সমমনা লেখকরা যা লিখছেন, সেখানে আসলে জীবন বলে কিছু নেই। নিরেট ফ্যান্টাসিই তাদের লেখার উপাদান। এই ফ্যান্টাসি মানুষের মধ্যে আছে; কিন্তু সেটা কালের খুবই ক্ষুদ্র সময়। অনেকটা সাময়িক নেশার। ঘোর কেটে গেলে যেটা আর থাকে না। সাদাত হোসাইনদের লেখার মান এটাই। নড়বড়ে গদ্য, অসংলগ্ন স্টোরি, সংলাপ, বাস্তবতা বিবর্জিত চরিত্রের সমন্বয়ে লেখা তার বই। তিনিও আছেন সেরা লেখকের তালিকায়।
গত কয়েক বছরে বই মেলার ‘পরিবেশদূষণ’ হচ্ছে এই ধরনের বইয়ের দরুন। কেবল সেই সেলিব্রেটির জনপ্রিয়তা থেকেই মানুষ বই কিনছেন। এই বইয়ের ক্রেতাও হচ্ছেন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া যুবা-তরুণরা। এই বই কেনার দুটি দিক রয়েছে-এক. তরুণ প্রজন্ম নিজের বিষয়ে হতাশ, তাই মোটিভেশনাল স্পিকারের বই পড়া তার জন্য প্রয়োজনীয়। যদি এটা হয়ে থাকে তাহলে সামনে আরেক নতুন বিপদ আসছে। কারণ এই বই পড়ে তো ডিপ্রেশন কমবেই না বরং বইয়ের প্রতি মন উঠে যাবে এবং তারা একটা বিপজ্জনক প্রজন্ম হয়ে উঠবে। দুই. এই বইগুলো কিনে নিরেট ব্যক্তির জনপ্রিয়তা ও শো অফ করার প্রবণতা থেকে। অন্যদিকে তালিকায় মুনজেরিন শাহেদ নামে একজন লেখক আছেন টপে। তিনিও মৌলিক কোনো লেখক নন। ভোকাবুলারি নিয়ে বই লিখেছেন। এই বইয়ের দরকার আছে এবং প্রয়োজনীয়ও বটে। কিন্তু এই বইগুলো যখন সর্বোচ্চ বিক্রীত বই হয় তখন একটু ভাবনার কারণ আছে। এই হলো বাঙালির তরুণ প্রজন্মের পাঠের তালিকা। এটা সংখ্যাগরিষ্ঠের হিসাব।
এই প্রজন্ম ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, অর্থনীতি, রাজনীতি নিয়ে দারুণ ‘অশিক্ষিত’ ও অসচেতন। উক্ত বিষয়ে অশিক্ষিত একটা প্রজন্ম মূলত জড়বস্তু। তাদের চেতনা বলে আসলে কিছু থাকে না। যাহোক, বই মেলা ও রকমারি ডটকমের এই বেস্ট সেলার বই ও লেখকদের নিয়ে যে আলাপটা—বিশেষ করে কেন এই প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটা নিয়ে নতুন করে আলাপ-আলোচনা দরকার রয়েছে। কিন্তু এই গতিটা যে বিপজ্জনক দিকে যাচ্ছে সেটা একটু বুদ্ধি খাটালেই বুঝতে পারা যায়।
লেখক : সাংবাদিক





