ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অবস্থা সব সময়ই বাংলাদেশের মানুষের কৌতূহলের অন্যতম বিষয়। কারণটাও কারোই অজানা নয়। বাঙালি জাতিসত্তার একই রক্ত উভয় বাংলার মানুষের শিরা-উপশিরায় বহমান। বাংলাকে সোনার বাংলা গড়তে এপার-ওপার দুই বাংলাই সংগ্রাম করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কালক্রমে বাঙালির সোনার বাংলা গড়ার প্রতি এই দুর্বলতাকেই রাজনীতির অন্যতম হাতিয়ার বানিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সোনার বাংলা গড়ার প্রতিশ্রুতিদান তাই বাঙালির কাছে নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু সচেতন নাগরিকরা যথারীতি তাকিয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর প্রতিশ্রুতি এবং তা বাস্তবায়নের কলাকৌশল সম্পর্কে অবগত হতে।
৩৪ বছর সরকারে থাকা বামফ্রন্টের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে বিগত ১০ বছর ধরে একক জনপ্রিয়তায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। কিন্তু ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির (ভারতীয় জনতা পার্টি) অভাবনীয় সাফল্য তৃণমূল কংগ্রেসের একক জনপ্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। মোদি-অমিত জাদুতে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে ১৮টি আসন পায়। হিন্দুত্ববাদের ওপর ভিত গেড়ে গড়ে ওঠা বিজেপির পশ্চিমবঙ্গে এই অভাবনীয় সাফল্য পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্ব দখলে তাদের মনে আশার সঞ্চার ঘটিয়েছে। আর এ জন্যই নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে দিল্লি থেকে মোদি-অমিত বার বার ছুটে এসেছেন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে, সভা-সমাবেশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বক্তৃতায় সুযোগ পেলেই কট্টর সমালোচনা করছেন মমতার নেতৃত্ব এবং নির্বাচনের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে। মমতাও পিছিয়ে নেই, তিনিও কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করা বিজেপির নানা ব্যর্থতা এবং ধর্মের দোহাই দিয়ে আমাবস্যার রাজনীতিকে যথারীতি তুলাধুনা করে ছাড়ছেন।
সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করলেও পশ্চিম বাংলার মানুষের ভাবাবেগ বুঝতে সমর্থ হয়েছে মোদি-অমিতের বিজিপি এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আর এজন্যই তারা পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনে, ১০ বছর পূর্বে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিয়ে ক্ষমতায় আসা তৃণমূল কংগ্রেসকে প্রশ্নের আঘাতে জর্জরিত করছে। তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকালীন সময়ে পশ্চিমবঙ্গে জনগণের উন্নয়নের বদলে কেবল যে মমতার কাছের লোকদের ঝুলিটাই পূর্ণ হচ্ছে, এমনটাই নির্বাচনি প্রচারণায় বলে বেড়াচ্ছেন বিজেপির বড় বড় নেতা। ‘লক্ষ্য সোনার বাংলা’ গড়ার একই কৌশলকে অধিকন্তু প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই অঞ্চলের নাগরিকদের আকৃষ্ট করতে চাইছে বিজেপি মহল, একই সাথে দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা মোদির ‘ম্যাই ভি চৌকিদার’ কথাটি প্রচার করে বেড়াচ্ছেন সাধারণ মানুষদের মধ্যে। এমতাবস্থায় সোনার বাংলা গড়তে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি দল নাকি অন্য কোন দলের অপর কেউ পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নেতৃত্বে বসবেন, তা জানার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে ২ মে অবধি, বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা পর্যন্ত।
এ বছরের জানুয়ারি মাসের ‘সি ভোটার’ ‘এবিপি আনন্দ’-এর একটি সমীক্ষায় তৃণমূলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার ইঙ্গিত দেখা যায়। সেখানে তৃণমূলের সম্ভাব্য আসন ছিল ১৫৪ থেকে ১৬২। বিজেপির ছিল ৯৮ থেকে ১০৬। বাম-কংগ্রেস জোটের ঝুলিতে ২৬ থেকে ৩৪ আসন পড়তে পারে বলে বলা হয়েছিল। এক মাসের ব্যবধানে জনমত জরিপের সমীক্ষায় বেশ তারতম্য লক্ষ করা যায়। আসন্ন নির্বাচনে কোন দল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নেতৃত্বে আসতে পারে তা জানার জন্য ২৩ জানুয়ারি থেকে ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ‘এবিপি আনন্দ’ ‘সিএনএক্স’ পশ্চিমবঙ্গে জনমতের সমীক্ষা করেছে। মহিলা ও পুরুষ মিলিয়ে তারা কথা বলেছে ৮ হাজার ৯৬০ জনের সঙ্গে। সমীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, তৃণমূল জয় পেতে পারে ১৪৬ থেকে ১৫৬ আসনে। কিন্তু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠন করতে প্রয়োজন কমপক্ষে ১৪৮টি আসনের। সমীক্ষা থেকে আরো জানা যায়, বিজেপি ১১৩ থেকে ১২১ আসন পেতে পারে; বাম-কংগ্রেস জোটের সম্ভাব্য আসন হতে পারে ২০ থেকে ২৮। জনমত সমীক্ষাটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নেতৃত্বে আসতে তৃণমূল কংগ্রেসের বেশ বেগ পেতে হবে। নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে দলে ভাঙন দেখা দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে অনেক বড় বড় নেতা থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের নেতাদের বিজেপিমুখী হওয়ার খবরে মাঝেমধ্যেই সরগরম হয়েছে ভারতের গণমাধ্যমেগুলো। নির্বাচন আগমুহূর্তে বিভিন্ন দলছুট নেতাকর্মী, বাম-কংগ্রেসের ঐক্য এবং বিজেপির বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে নির্বাচন জয়ের পূর্ব অভিজ্ঞতা আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য হতে যাচ্ছে অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জ।
পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভোটব্যাংককে নির্বাচনে জয়ের অন্যতম হাতিয়ার। বিগত নির্বাচনগুলোতে দেখা যায় এ রাজ্যের মুসলিমদের ভোট মূলত তৃণমূল কংগ্রেসের ঝুলিতে পড়ে, কিন্তু এবার পরিস্থিতি একটু ভিন্ন দেখা যাচ্ছে। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে দেখা গিয়ছে সম্পূর্ণ মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামেও ভোট পড়েছে পদ্মফুলে। মুসলিম ভোটের একটা অংশ কংগ্রেস-সিপিএম জোটের ঝুলিতে যাওয়ার বড় সম্ভাবনা আছে। শুধু তাই নয়, এ রাজ্যের ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটারের ভোটের দিকে গুরুত্বসহকারেই নজর রাখছে বিজেপি। তৃণমূল কংগ্রেসের মুসলিম ভোটব্যাংকে ভাগ বসাতে বিজেপি বেশ সতর্কভাবে কৌশল অবলম্বন করছে। যার কিছুটা আচ পাওয়া যায় বিজেপির নির্বাচনের প্রচারের মাধ্যমে, বেশ কয়েকদিন আগে মেদিনীপুর জেলা পরিষদের প্রাক্তন সদস্য, তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে আসা সিরাজ খানকে পাশে বসিয়ে বিজেপির ভোটে পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বে থাকা কৈলেশ বিজয়বর্গীয় বেশ উঁচু গলাতেই বলেছিলেন, ‘বিজেপি হলো সেই দল, যেখানে সিরাজ খান আর শ্রীরাম পাশাপাশি বসে থাকে।’
তবে পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক রাজনীতির মারপ্যাঁচ যে একটু ভিন্ন তা গত বিধানসভার নির্বাচনেই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল বিজেপি। তাছাড়া দিল্লির দাঙ্গা, মুসলিমদের ধর্মীয় আইন সংশোধন এই অঞ্চলের মুসলিম ভোটব্যাংককে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছে, এতে করে আখের লাভ হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের। সাম্প্রতিক ভারতের আলোচিত কৃষক বিদ্রোহ এবং কৃষকদের বিরুদ্ধে মারমুখী আচরণ এ অঞ্চলের কৃষক মনেও বিজেপি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করছে। আর এ বিশাল কৃষকসমাজকে সামপ্রদায়িক সংঘাতের মাধ্যমেও লেলিয়ে দেওয়া এই মুহূর্তে বিজেপির পক্ষে সম্ভব হবে না। এছাড়া মোদি সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতাও ইদানীং ভারতের সাধারণ মানুষের সামনে চলে আসছে। করোনাকালীন মোদির অনেক বক্তব্য এবং সিদ্ধান্ত তরুণ সমাজে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তবে বিজেপি একটা বিষয়ে স্বস্তিতে আছে, ভারতে সাম্প্রতিক ঘটে চলা কৃষক আন্দোলনে পশ্চিমবঙ্গের কৃষকরা শরিক হয়নি, নতুবা এই নির্বাচন বিজেপির বাংলা দখনের স্বপ্ন একেবারেই ফিকে হয়ে যেত বলেই ধারণা বিশেষজ্ঞ মহলের।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন এবং অনেক নতুন নতুন পদক্ষেপ নিয়েছেন এ অঞ্চলের মানুষদের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য। কেন্দ্রীয় সরকারের অনেক অসহযোগিতার কথা অবলীলায় বলে বেড়াচ্ছেন লোকসম্মুখে। বিজেপি যে শুধু হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে তা নয়, বিজেপি হিন্দুদের মধ্যেও বিভেদের জন্ম দিচ্ছে, এমনটাই বলা হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনি প্রচারণায়। এতে করে তিনি মুসলিমদের যেমন কাছে টানতে পারছেন একইভাবে জাত-পাত নিয়ে যে হিন্দুদের মধ্যে বিভেদ রয়েছে তা সমাধানের একটি বার্তা মানুষের মাঝে পৌঁছে দিতে পারছেন।
অমিত-মোদি জুটি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিভিন্ন চাতুর্যতায় নাজেহাল করতে চাইলেও, মমতা দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং দর্শন তাকে এখনো পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় মুখ হিসেবে অদ্বিতীয়া করে রেখেছে। সোনার বাংলা গড়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তিনি যে এখনো পশ্চিমবঙ্গের মানুষদের ভরসার জায়গা তাই ফুটে উঠেছে ‘সি ভোটার’-এর জনমত সমীক্ষায়। সি ভোটারের জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে জনপ্রিয়তার নিরিখে এখনো শীর্ষে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো। সমীক্ষা অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পছন্দ করছেন ৫৫ শতাংশ মানুষ। এরপরই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের নাম, ২৫ শতাংশ মানুষ তাকে পছন্দ করেছেন। মুকুল রায়কে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পছন্দ করছেন ৯ শতাংশ, সুজন চক্রবর্তীকে ৩ শতাংশ, অধীর চৌধুরীকে ২ শতাংশ ও অন্যান্য ৬ শতাংশ।
জনমত সমীক্ষা, ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনে জয়লাভের বিষয়টা অনেকটা পরিষ্কার। তবে বিজেপির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতা গ্রহণের পথকে বাম-কংগ্রেস জোটের দ্বারস্থ পর্যন্ত গড়াতে পারে। সেক্ষেত্রে আমরা একসময়ের পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি দলকে একই কাতারে দাঁড়িয়ে মিলেমিশে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নেতৃত্ব দিতেও দেখতে পারি, যা উপমহাদেশের রাজনীতিতে বিরল কোনো ঘটনা নয়।
লেখক : আকিজ মাহমুদ
নিবন্ধকার





