জাতীয়

পলিথিন বন্ধে নেই কোনো উদ্যোগ

  • সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
  • প্রকাশিত ২১ জানুয়ারি, ২০২২

দেশে পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধের কথা ভুলেই গেছে সকলে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এর ব্যবহার বন্ধে নেই দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ। তাই দিনকে দিন ভয়ানক পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনছে পলিথিন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সস্তা ও সহজলভ্যতার কারণে ক্ষতিকর জেনেও জনপ্রিয় হয়েছে পলিথিন। যতদিন পর্যন্ত এর বিকল্প তৈরি না হবে ততদিন এর ব্যবহারও বন্ধ হবে না। এ ক্ষেত্রে পাট কিংবা কাপড়ের ব্যাগ বিকল্প হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা হচ্ছে না।

জানা যায়, বাংলাদেশে পলিথিনের ব্যবহার শুরু হয় আশির দশকে। পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশে অনেক পরের দিকে পলিথিন ব্যবহার শুরু করে। কিন্তু অল্প সময়েই তা বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে। পরিবেশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আর্থ ডে নেটওয়ার্ক এক প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্বে প্লাস্টিক দূষণকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ১০ নম্বরে। তাই ব্যবহার শুরুর ১৫ থেকে ২০ বছরের মাথায় ২০০২ সালের জানুয়ারি থেকে এর উৎপাদন, পরিবহন, মজুত ও ব্যবহারকে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়। আইন করার পর শুরুর দিকে বেশ কড়াকড়ি হলেও ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে যায় আইনের প্রয়োগ। বাংলাদেশে এটি যে নিষিদ্ধ এখন আর তা বোঝারই কোনো উপায় নেই। বিশ্বে বাংলাদেশই প্রথম পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন করে। গত বুধবারের ডিসি সম্মেলনে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক বলেন, বাজারে পলিথিন ব্যাগ বন্ধ করে পাটের ব্যাগের ব্যবহার বাড়াতে মোবাইল কোর্টের মনিটরিং জোরদার করতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এরপর আবার আলোচনায় আসে পলিথিন। এর আগের সরকারের সময়ও পলিথিনের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছিল। তখন সাময়িকভাবে এর ব্যবহার কমে আসে। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময়ে পলিথিনের বিকল্প গড়ে ওঠেনি। পরিবেশের তোয়াক্কা না করে মানুষও দেদার ব্যবহার করছে পলিথিন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বাইরে ময়লা ফেলার সময় পচনশীল ও অপচনশীন বর্জ্য আলাদা করা হয়। এতে যিনি ময়লা ফেলছেন তিনি প্রথমেই পলিথিন ও প্লাস্টিক জাতীয় বস্তুগুলো আলাদা করে ফেলেন। আমাদের দেশে গৃহস্থালির বর্জ্য আলাদা না করে একসঙ্গেই ফেলা হয়। ডাস্টবিনে গিয়েও সেটি আলাদা করে না সিটি করপোরেশন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যাগ এখন বাজারেই পাওয়া যায় না। দেশের সরকারি পাটকলগুলোরও উৎপাদন বন্ধ। বেসরকারি পাটকলও উৎপাদন করছে না। ব্যাগ পাওয়াই কঠিন। পাটের ব্যাগের দামও এখন ২০-৫০ টাকা। অন্যদিকে এক কেজি পলিথিন পাওয়া যায় ১৫০-১৮০ টাকায়।

আবার পাটের ব্যাগের বিকল্প হতে পারতো কাপড় ও কাগজের ব্যাগ। দেশের বড় বিপণিবিতানগুলো এটি ব্যবহার করলেও প্রান্তিক দোকানিরা পলিথিনেই আটকে আছেন। সবজি, ফল ও মুদি দোকানিরা পলিথিনই ব্যবহার করছেন বেশি। এখানে মনিটরিং জোরদার করলে পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করা যেত।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের আবু নাসের খান বলেন, আমাদের উচিত সস্তা বিকল্প। সঙ্গে কঠোর মনিটরিং। যাতে মানুষ পলিথিন ব্যবহার করতে না পারে। মানুষ ব্যবহার করতে না পারলে নিজেই বিকল্প খুঁজে নেবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. হাফিজা খাতুন বলেন, আমাদের দেশে ব্যবসায়িক ও আর্থিকভাবে লাভজনক না হলে মানুষ কিছু করে না। শুধু সচেতনতা বা সমাজের কল্যাণের জন্য কিছু হয় না। পলিথিন ব্যাগ সাধারণের জন্য অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভজনক কারণ এটি সস্তা ও সহজে পাওয়া যায়। যখন আর্থিকভাবে লাভজনক বিকল্প আসবে শুধুমাত্র তখনই এর ব্যবহার আমি ছাড়ব।

ড. হাফিজা খাতুন বলেন, প্লাস্টিক এমন একটি পদার্থ যার আয়ুস্কাল হাজার হাজার বছর। যা মাটিতে গেলে ক্ষয় হয় না বা মাটির সঙ্গে মিশে যায় না। এটি মাটিতে পানি ও প্রাকৃতিক যে পুষ্টি উপাদান রয়েছে তার চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করে। যার ফলে মাটির গুণগতমান হ্রাস পায়। গাছ তার খাবার পায় না। মাটি ও পানিতে প্লাস্টিক কনা ছড়িরয় পড়ে। যা হয়তো পানি থেকে মাছের শরীরে যাচ্ছে। মাটিতে প্লাস্টিকের তৈরি টক্সিক রাসায়নিক পদার্থ গাছে মিশে যাচ্ছে। আর তা শেষমেশ শুধু পশু পাখি নয় মানুষের শরীরেও এসে পৌঁছায়। প্লাস্টিক মানুষের শরীরে আরো অনেক মরণ ব্যাধির পাশাপাশি ক্যানসারের জন্য দায়ী।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিবেশ দূষণ বিভাগ) কেয়া খান বলেন, প্রকৃতপক্ষে আমরা সস্তা বিকল্প দিতে পারছি না। তবে প্রকল্প হাতে নিয়েছি। আমরা রিসাইকেল করব। পলিথিনের একবারে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তবে বেশি দরকার মানুষকে সচেতন করা। আইনে করে নিষিদ্ধ করার পর সেই আইনের কেন প্রয়োগ হচ্ছে  না-এমন প্রশ্নে তিনি কোনো মন্তব্য করছে চাননি।

তবে একই প্রশ্নে নাম না প্রকাশের শর্তে এই মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, আমাদের একার পক্ষে সারা দেশে এটি থামানোর অভিযান চালানো সম্ভব নয়। তাছাড়া মানুষকে বোঝানো আমাদের জন্য সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads