মিশকাত বিন আমির হোসেন
একটি সুন্দর সুষ্ঠু সমাজ গড়ে তোলার জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে আসা সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত পর্দার প্রকৃতরূপ অজানা থাকার কারণেই এর বাস্তবতা উপলব্ধি করতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। অনেকেই বলেন, মনের পর্দাই আসল পর্দা। বস্তুত তারা চরম বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত রয়েছেন। দেহকে অনাবৃত রেখে মনের পর্দা রক্ষার ব্যাপারটা অবাস্তব। আল্লাহ নারী-পুরুষকে তৈরি করেছেন। আর তাদের মধ্যে দিয়েছেন পরস্পরকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা। বিষেশ করে নারীকে কমনীয় সুন্দর অঙ্গ-প্রতঙ্গ দিয়ে আল্লাহ তৈরি করেছেন। একটি নারী যখন সুন্দর পোশাকে সাজ সজ্জিত হয়ে বাইরে বের হয়, তখন স্বভাবতই অন্যের দৃষ্টি তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। মানুষকে তো আল্লাহতায়ালা জড় পদার্থ দোষ-ত্রুটির ঊর্ধ্বে ফেরেশতা করে তৈরি করেননি। কামনা-বাসনা উদ্রেককারী উপায়-উপাদান দিনরাত সামনে থাকার পর মানুষ নির্লিপ্ত থাকবে; এটা সম্ভব নয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াতের দ্বাদশ বর্ষে হিজরতের প্রাক্কালে ইসলামী রাষ্ট্র গড়ার মূলনীতি পেশ করতে গিয়ে সুরা বনী ইসরাইলে বর্ণিত ১৪টি মূলনীতি পেশ করেছেন। তারমধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হলো-‘তোমরা জিনার ধারে কাছেও যেয়ো না।’ এ আয়াতে আল্লাহপাক জিনা করো না, এই কথা বলেননি; বরং জিনার কাছেও যেয়ো না বলে এমন এক সমাজ গড়ার ইঙ্গিত করেছেন যেখানে পুরুষ এবং নারী পুত-পবিত্র, পরিচ্ছন্ন এক সমাজ গড়ে তুলবে। জিনা-ব্যভিচার সংঘটিত হওয়ার কোনো পরিবেশই সেখানে থাকবে না।
নারী-পুরুষ স্বাভাবিকভাবেই একজন অন্যজনের প্রতি আকৃষ্ট হবে। এই আকর্ষণ যদি বিবাহ বহির্ভূত হয় তবে তা কোরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে ব্যভিচার। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বলা হয়েছে, ‘চক্ষুদ্বয় ব্যভিচার করে, দৃষ্টি তাদের ব্যভিচার, হস্তদ্বারা ব্যভিচার করে, স্পর্শ তাদের ব্যভিচার, পদদ্বয় ব্যভিচার করে, পথে চলা তাদের ব্যভিচার, কথোপকথন তাদের জিব্বাহর ব্যভিচার, কামনা-বাসনা তাদের মনের ব্যভিচার, অবশেষে যৌনাঙ্গ এসবের সত্যতা এবং অসত্যতা প্রমাণ করে।’ দৃষ্টির অনিষ্টতা সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেন, ‘হে নবী! মুমিন পুরুষদেরকে বলে দিন তারা যেন নিজেদের চোখকে বাঁচিয়ে চলে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানসমূহ হেফাজত করে। এটা তাদের পক্ষে পবিত্রতম নীতি। যা তারা করে আল্লাহপাক সে বিষয়ে পরিপূর্ণ অবগত। আর হে নবী! মুমিন স্ত্রীলোকদের বলুন, তারা যেন নিজেদের চোখকে বাঁচিয়ে রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানসমূহ হেফাজত করে। (সুরা নুর, আয়াত-৩০,৩১) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত আলী (রা.) কে বলেন, ‘হে আলী! প্রথম দৃষ্টির পর দ্বিতীয় দৃষ্টি নিক্ষেপ করো না। প্রথমটি ক্ষমারযোগ্য কিন্তু দ্বিতীয়টি নয়।’ ‘হজরত জাবের (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, হঠাৎ যদি দৃষ্টি পড়ে যায় তাহলে কি করব? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিও।’ (আবু দাউদ)
জিব্বা মানুষের কথাবার্তা বলার মাধ্যম। নারীদের পুরুষের সাথে প্রয়োজনীয় কথা বলা নিষেধ নেই। কিন্তু কোনো খারাপ ইচ্ছা বা নিজেকে অপরের কাছে মোহনীয় করে তোলার বাসনাই যদি কোনো কথা বলা হয় সেটা অন্যায়। এ সম্পর্কে কোরআনের ঘোষণা, ‘তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর তবে বাক্যলাপ কোমলতা অবলম্বন করো না যাতে দুষ্টমনের কোনো ব্যক্তি লালসা করতে পারে; বরং সোজা সোজা ও স্পষ্ট বলো।’ (সুরা আহজাব, আয়াত-৩২) কথা বলার সময় হয়তোবা যে বলছে তার মনে খারাপ চিন্তা নাও থাকতে পারে। কিন্তু যাকে বলা হচ্ছে সে হয়তো খারাপ চিন্তা করতে পারে। এজন্যই কোরআন সর্তকতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে।
নির্লজ্জতা রোধের জন্য এবং কারো প্রতি (নারী হোক বা পুরুষ) খারাপ ধারণা পোষণ থেকে বিরত থাকার জন্য ইসলাম কোনো স্ত্রীলোককে অনুমতি দেয়নি যে, সে তার স্বামীর কাছে অন্য কোনো স্ত্রীলোকের অবস্থা বর্ণনা করবে বা দাম্পত্য জীবনের গোপন কথা কাউকে বলবে। না অন্যের কাছ থেকে শুনবে। হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, ‘নারী-পুরুষকে নিষেধ করা হয়েছে যে, তারা যেন তাদের দাম্পত্য সম্পর্কিত গোপন অবস্থা অপরের কাছে বর্ণনা না করে। কারণ, এতেও অশ্লীলতার প্রচার হয় এবং মনের মধ্যে প্রেমাসক্তির সঞ্চার হয়।’ (আবু দাউদ) আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা ইচ্ছা করে যে, মুসলমানদের মধ্যে নির্লজ্জতার প্রচার হোক, তাদের জন্য পৃথিবীতেও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ও আখিরাতেও।’ (সুরা নুর, আয়াত-১৯) অনেক সময় কথা না বলেও গতিবিধির সাহায্যে অন্যকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালার নির্দেশ, ‘তারা যেন পায়ের দ্বারা মাটিতে আঘাত করে না চলে। নতুবা যে সৌন্দর্য তারা গোপন রেখেছে তার অবস্থা জানতে পারবে।’ (সুরা নুর, আয়াত-৩১)
ইসলাম একটা সুন্দর পুতপবিত্র সমাজ গড়ার লক্ষ্যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দিকেও লক্ষ রেখেছে। সুগন্ধি একটি দুষ্টমন থেকে অন্য দুষ্টমনে সংবাদ পরিবহনের এক অতি সূক্ষ্ম মাধ্যম। সাজ সজ্জিত হয়ে পথ চলতে অথবা কোনো সভাস্থলে যেতে কোনো মুসলিম নারীকে ইসলাম অনুমতি দেয়না। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে নারী আতর বা সুগন্ধি দ্রব্যাদি ব্যবহার করে লোকের মধ্যে যাবে সে একটা ভ্রষ্টা নারী।’ ইসলাম মানুষের লজ্জা শরমের যে সঠিক ব্যাখ্যা দিয়েছে, পৃথিবীর ইতিহাসে তা বিরল। আজকাল পৃথিবীর সুসভ্য জাতিগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই, তারা সৌন্দর্যের জন্য বেশভূষা করে, সতরের জন্য নয়। এমনকি পশু প্রবৃত্তি চরিতার্থের জন্যে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হতেও তাদের বাধে না। ব্যক্তিগতভাবেই শুধু নয় বরং collectively তারা পশুত্বকে উপভোগ করে। পবিত্র কোরআনুল কারীমে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে আদম সন্তান! আমি তোমাদের জন্য পোশাক নাজিল করেছি যেন তোমাদের দেহের লজ্জাস্থানসমূহকে ঢাকতে পারো। এটা তোমাদের জন্য দেহের আচ্ছাদন ও সুতা বর্ধনের উপায় আর সর্বোত্তম পোশাক হলো তাকওয়ার পোশাক।’ (সুরা আরাফ, আয়াত-৩৬)
পোশাক শুধুমাত্র সৌন্দর্যই বাড়ায় না এবং তৃপ্তি আনয়ন করে না; বরং এটা মানুষের দেহকে ঢেকে রাখে। এটা মানুষের লজ্জাস্থানকে ঢেকে রাখে। লজ্জাস্থান ঢাকার তাগিদেই মানুষ প্রথম পোশাক ব্যবহার শুরু করে। এটা মানব চরিত্রের কৃত্রিম দাবি নয়। কারণ, মানব প্রকৃতির ঐকান্তিক গুরুত্বপূর্ণ দাবি। লজ্জা-শরম মানুষের সহজাত অনুভূতি। আল্লাহ সৃষ্টিগতভাবেই মানব প্রকৃতিকে অনুভূতি দিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃতিগত এই সত্যকে অপেক্ষা করে আধুনিকতার নামে তথাকথিত উন্নত বিশ্বের মানুষ এমন পোশাক পরছে, যা লজ্জাস্থানসমূহক ডাকতে অক্ষম। মানুষের লজ্জাস্থানসমূহকে কোরআনে ‘সতর’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। এই আরবি শব্দটি শরীরের এমন স্থানকেই নির্দেশ করে, যা প্রকাশ করা মানুষ পছন্দ করে না। এই স্বাভাবিক লজ্জা-শরমের দাবি পূরণের জন্য প্রাকৃতিক পোশাক জন্মগতভাবেই মানুষকে দেওয়া হয়নি; বরং মানুষের প্রকৃতিতে পোশাক পরার প্রয়োজনবোধ জাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোরআন শরীফে আল্লাহপাক ‘আন যালনা আলাইকুম লেবাসান’ বাক্যটিতে মানুষের জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে প্রকৃতিগত এই দাবি বুঝার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। স্বভাবগত এই প্রয়োজনকে সামনে রেখে মানুষের জন্য পোশাকের নৈতিক গুরুত্বকে বুঝতে হবে। পোশাক যেমন মানুষের লজ্জাস্থানকে আবৃত করবে তেমনই হবে তাদের জন্য সৌন্দর্যবর্ধক।
আর সর্বোত্তম পোশাক হচ্ছে তাকওয়ার পোশাক। পোশাক কেবল লজ্জাস্থান ঢাকার উপকরণ এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধির উপায়ই নয় বরং মানুষের পোশাক হতে হবে আল্লাহর ইচ্ছামাফিক। মানুষ এই দুনিয়াতে আল্লাহর প্রতিনিধি। অতএব যে মানুষের মধ্যে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতি বিদ্যমান তার পক্ষে কেমন করে এমন পোশাক পরা সম্ভব, যা তার ঈমানের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে? কুরুচিপূর্ণ পোশাক, পুরুষের মেয়েলী পোশাক কি কখনো সুস্থ রুচিবোধের পরিচয় বহন করে? আল্লাহপাকের নির্দেশ, ‘তোমার যে পোশাকের ভেতর দিয়ে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখা যায় এবং সতর প্রকাশ হয়ে পড়ে, ইসলামের দৃষ্টিতে তা কোনো পোশাকই নয়।’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যেসব নারী কাপড় পরিধান করেও উলঙ্গ থাকে, অপরকে তুষ্ট করে এবং অপরের দ্বারা নিজে তুষ্ট হয়, যুবতি উটের মতো বাঁকা করে চলে তারা কখনো বেহেশতে প্রবেশ করবে না। এমনকি বেহেশতের গন্ধও পাবে না।’ সবশেষে কথা হলো আমরা পর্দার আমল বেশি বেশি করব, যাতে আমার দ্বারা অন্য কেহ গুনাহের মধ্যে লিপ্ত না হয়।
লেখক: শিক্ষার্থী, মেখল হামিউচ্ছুন্নাহ মাদরাসা





