শিক্ষক সংকটের কারণে সারা দেশে জোড়াতালি দিয়ে চলছে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো। গত সাত বছর ধরে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগ বন্ধ থাকায় দুই হাজার ৩২৭ শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ফলে এসব বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে দিয়ে একাধিক বিষয়ের ক্লাস নেওয়া হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে দুই শিফটে মোট শিক্ষক থাকার কথা ৫০ জন। অথচ রয়েছেন ৩৮ জন। বিদ্যালয়টিতে দীর্ঘদিন ধরে ১২ শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ঢাকার নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে মোট ৫২ শিক্ষকের পদ থাকলেও আছেন ৪২ জন। ১০ শিক্ষকের পদ খালি। শুধু ঢাকায় নয়, সরকারি হাইস্কুলে শিক্ষক সংকট সারা দেশে বিদ্যমান।
জানা গেছে, সারা দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে (নতুন জাতীয়করণসহ) মোট ৩৫৮টি। টানা সাত বছর এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ ছিল। গত কয়েক বছর ধরে বিসিএস নন-ক্যাডারদের মধ্য থেকে হাইস্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করা হয়। কিন্তু তাতেও চলমান সংকট কাটছে না। গত সাত বছরে মৃত্যু অথবা অবসরজনিত কারণে প্রায় দুই হাজার ৮৭৫ শিক্ষকের পদ শূন্য হয়েছে।
এছাড়া ২০১২ সাল থেকে কারিকুলাম ও সিলেবাস পরিবর্তনের কারণে বিদ্যালয়গুলোতে গত সাত বছরে চারটি নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে। এগুলো হলো- তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি), শারীরিক শিক্ষা, কর্মমুখী শিক্ষা, চারু ও কারুকলা। এসব ক্ষেত্রেও কোনো বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে নেই। এক বিষয়ের শিক্ষক পড়াচ্ছেন অন্য বিষয়। তথ্যপ্রযুক্তির মতো মৌলিক ও বিশেষ বিষয়ও পড়ানো হচ্ছে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে।
ঢাকার বাইরে শিক্ষক সংকট অতিমাত্রায়। মফস্বলে এ সংকট চরম পর্যায়ে। দেখা গেছে, শরীয়তপুর সদরের শরীয়তপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫০ শিক্ষকের পদ সৃজন থাকলেও আছেন মাত্র ২৩ জন। শূন্য রয়েছে ২৭টি পদ। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ নাজির উদ্দিন পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৩টি পদের মধ্যে সাতটি পদই শূন্য। মফস্বলের অনেক হাইস্কুলে এমন চিত্র দেখা গেছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে জানা গেছে, সারা দেশে ৩৫৮ সরকারি হাইস্কুলে ১০ হাজার ৬৪৮ জন সহকারী শিক্ষকের মধ্যে এক হাজার ৯৬৯টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে বাংলা বিষয়ে ৫৪৮ জন, ইংরেজিতে ১৭৯ জন, গণিতে ৭৭ জন, সামাজিক বিজ্ঞানে ৪৭ জন, ইসলাম ধর্মে ২৭৬ জন, ভৌত বিজ্ঞানে ২৫৩ জন, জীবন বিজ্ঞানে ২৬৮ জন, ব্যবসায় শিক্ষায় ৭৫ জন, ভূগোলে ১২৯ জন, কৃষিশিক্ষায় ৭১ জন, শারীরিক শিক্ষায় ১০০ জন, চারুকলায় ১৯১ জন এবং অন্যান্য বিষয়ে ১৫১ শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে ২৩৬ জন ও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদেও ১২২টি পদ শূন্য রয়েছে। সবমিলিয়ে পদ সৃষ্টির পরও সারাদেশে মোট দুই হাজার ৩২৭ শিক্ষক সংকট রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১২ সালের ১৫ মে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তায় উন্নীত করেন। এতে শিক্ষক নিয়োগের মূল ক্ষমতা চলে যায় মাউশির বদলে সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) হাতে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পিএসসিকে শিক্ষক নিয়োগের জন্য বারবার অনুরোধ করা হলেও এতদিন তাতে রাজি হয়নি পিএসসি। পিএসসি জানিয়ে দেয়, নিয়োগবিধি গেজেট আকারে জারি না হলে এ পদে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ সম্ভব নয়। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত বিধিতে সংশোধন আনা হয়। দুই মাস আগে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা শেষ করে পিএসসি। বর্তমানে ফলাফল প্রকাশের অপেক্ষায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শূন্য পদের সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে। শিক্ষক সংকটের কারণে এক বিষয়ের শিক্ষক অন্য বিষয়ে ক্লাস নিচ্ছেন। মহানগরীর বিদ্যালয়গুলোতে তেমন সংকট না থাকলেও উপজেলাপর্যায়ের স্কুলগুলোতে এ সংকট তীব্র। এছাড়া এসব সরকারি বিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তিসহ নতুন চালু করা বিষয়গুলোর শিক্ষকও নেই। আবার বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে লাইব্রেরিয়ানের পদ থাকলেও সরকারি বিদ্যালয়ে পদটি এখনো সৃষ্টি হয়নি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক বলেন, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম পিএসসির আওতাভুক্ত। এ কারণে পর্যাপ্ত শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিনিয়ত শিক্ষকদের পদ শূন্য হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নন-ক্যাডার থেকে হাইস্কুলে নিয়োগের জন্য যে সংখ্যায় সুপারিশ আসছে তা দিয়ে সংকট কাটছে না। এ কারণে আলাদাভাবে এক হাজার ৩৭৮ শিক্ষক নিয়োগের জন্য পিএসসিতে চিঠি দেওয়া হয়। তার ভিত্তিতে পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ফলাফল প্রকাশ হলে সেখান থেকে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় গত ৬ সেপ্টেম্বর। দুই ক্যাটাগরিতে ১৩৭৮টি সহকারী শিক্ষক পদের জন্য মোট আবেদনকারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল দুই লাখ ৩৫ হাজার ২৯৩ জন।
দেড় হাজার শিক্ষক নিয়োগ পেলে মাধ্যমিকের শিক্ষক সংকট কেটে যাবে- আশা করেন সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক।
তিনি আরো বলেন, সরকারি স্কুলগুলোতে মামলা জটিলতা আছে। এ কারণে শিক্ষকদের পদোন্নতি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। এ সময় সারা দেশে প্রায় আড়াই হাজারের বেশি শিক্ষকের পদ শূন্য হয়। এখন পদোন্নতি কার্যক্রম প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। আশা করি, দ্রুত সেটাও দেওয়া হবে।





