স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে এখন রোল মডেলে পরিণত হয়ে দিনে দিনে বাংলাদেশ ক্রমেই সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ছে। মাথাপিছু আয়ও বাড়ছে প্রতি বছর। নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাওয়ায় অনেকেই পড়াশোনা শেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্পৃক্ত হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা উদ্যোগে তাদের সম্পৃক্ততা দেশের অগ্রগতির পথকে সুগম করে তুলেছে। অতীতে শুধু ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলেরা ব্যবসায় আসতেন। তবে এখন দেশে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে। গ্রামের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও প্রত্যন্ত এলাকায় বসেই তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারছেন। গ্রামীণ অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে গেছে গত দুই আড়াই দশক সময়ে। উন্নয়নের সব মাপকাঠিতেই প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে। শুধু অর্থনীতিতে নয়, সামাজিক সূচকগুলোতেও এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
পঞ্চাশ বছরের পথপরিক্রমায় অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। বিদেশিদের দৃষ্টিতে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ ছিল এক তলাবিহীন ঝুড়ি। আর এখন সমৃদ্ধ-স্বনির্ভর বদলে যাওয়া এক বাংলাদেশ। সারা বিশ্বে বাংলাদেশ এখন এক উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। যে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল বাংলাদেশ, সেই পাকিস্তানই এখন আর্থ-সামাজিক প্রায় সব সূচকেই পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশের চেয়ে। শুধু তা-ই নয়, পাকিস্তান এবং প্রতিবেশী দেশ ভারত স্বাধীনতা অর্জনের ৭৪ বছরে যে সফলতা অর্জন করতে পারেনি, বাংলাদেশ তা করে দেখিয়েছে ৫০ বছরে। স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতির যাত্রা শুরু হয় ১৯৭২ সালে। সে সময় প্রায় প্রতিটি সূচকেই এগিয়ে ছিল ভারত-পাকিস্তান। এখন এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটিই আমাদের স্বাধীনতার বড় অর্জন। কোন দেশ কতটা এগিয়েছে, তা বোঝার আরেক সহজ উপায় হলো মাথাপিছু আয়। এক্ষেত্রে ভারত-পাকিস্তান উভয় দেশের চেয়েই এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ২০৬৪ ডলার। সেখানে পাকিস্তানের ১ হাজার ৬৪১ ডলার এবং ভারতের ১ হাজার ৮৯৫ ডলার।
স্বাধীনতার সময় তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। সেই কিসিঞ্জার যদি আজ বেঁচে থাকতেন তাহলে তিনিই এখন বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখে বিস্মিত হতেন। এখন আমরা বাংলাদেশকে নিয়ে গর্ব করে বলতে পারি সেই তলাবিহীন ঝুড়ি আজ বিশ্বের বিস্ময়, উন্নয়নের এক রোল মডেল। যেকোনো দেশের উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ধরা হয় মানবসম্পদ, যাতে আমরা শুধু পাকিস্তান নয়, অনেক ক্ষেত্রে ভারত থেকেও এগিয়ে আছি। নারীশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নারীর ক্ষমতায়ন, মা ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশের রিজার্ভ এখন ৪২ বিলিয়ন ডলার, ৮ শতাংশের উপরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি আয়ে অভাবনীয় সাফল্য, বর্তমানে গড় মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৬৪ ডলার, ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে দেশজুড়ে।
দিনে দিনে সামাজিক, রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের সাথে সাথে পাল্টে গেছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো। এটা আরোপিতভাবে নয়, স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থনীতিতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ছিল একসময় এ অঞ্চলে। কিন্তু সেই কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে ক্রমশ বেরিয়ে এসে শিল্প ও সেবা খাতমুখী হয়েছে আমাদের অর্থনীতি। এখন আর আমাদের অর্থনীতিতে কৃষির একচ্ছত্র দাপট নেই আগের মতো। নানা চড়াই-উতরাই পথ পাড়ি দিয়ে আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। মাথাপিছু গড় আয় ও নবজাত ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন প্রাথমিকে শতভাগ ভর্তি মিলিয়ে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। বিস্ময়কর অগ্রগতি ঘটেছে কৃষি খাতে। বাংলাদেশ মাছ, সবজি, ফল, মুরগি, ডিম উৎপাদনে বিশ্ব পর্যায়ে পণ্য হচ্ছে। এর কোনো কোনোটিতে আমাদের অগ্রগতি বিশ্ব পর্যায়ে তৃতীয়-চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। আবার করোনার দুঃসময়ে আমাদের রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হার বেড়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভও বেড়েছে।
একসময় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির পর্যালোচনা করেছিল বিশ্বব্যাংক। ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছিল সত্তর দশকের বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতিচিত্র। যেখানে বলা হয়েছিল, ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিএনপি) কৃষি খাতের অবদান ছিল ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ। আর শিল্প ও সেবা খাতের অবদান যথাক্রমে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ ও ৩৪ শতাংশ। স্বাধীনতার পর বিগত ৫০ বছরে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তিগুলো পাল্টেছে। ক্রমশ শিল্প ও সেবা খাতের বিকাশ হয়েছে। এর ফলে অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো অনেকটাই বদলে গেছে। সময়ের আবর্তনে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারও বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকগুণ।
এখন উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উঠে এসেছে এদেশ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশের নানা দিক বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং তা হলো আমাদের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশেও একটি ছোটখাটো শিল্প বিপ্লব হয়েছে। এখানে শিল্পখাতের অবদান কয়েকগুণ বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তা ছাড়াই বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে সমগ্র বিশ্বে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের পদক্ষেপ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন সন্দেহ নেই।
বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ প্রক্রিয়া অনেকটাই জোরদার হয়েছে। ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীকে নানাভাবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত পদক্ষেপ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। দিনে দিনে দেশে ব্যাংকের সংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনিভাবে ব্যাংকের গ্রাহকের সংখ্যাও বেড়েছে। ব্যাংকের গ্রাহকসেবার ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার চমৎকার বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। অতীতে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেবার পরিধি শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা গ্রামাঞ্চলেও বিস্তৃত হয়েছে। সরকারি আগ্রহ ও তৎপরতায় সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো গ্রামীণ এবং প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকাতেও শাখা স্থাপনের মাধ্যমে বিভিন্ন আর্থিক সেবা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। এখন বেসরকারি ব্যাংকগুলো শাখা খোলার পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে তাদের আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসতে বেশ তৎপর হয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডের অনেক অগ্রগতি ঘটেছে। নানা বাধাবিপত্তি, প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ব্যাংকিং খাত আরো সামনে এগিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।
বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ২০৬৪ ডলার। ১৯৭২ সালে দেশে মাথাপিছু আয় ছিল ১২৯ ডলার। ৫০ বছরে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৬ গুণ। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুসারে পাকিস্তানে বর্তমানে মাথাপিছু আয় ১১৩০ ডলার। পাকিস্তানের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ মাথাপিছু আয় এখন আমাদের। উন্নয়নের মহাসড়কে রয়েছে এখন বাংলাদেশ। নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। এরপর মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ। এখন বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখছে উন্নত দেশ হওয়ার। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য রয়েছে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত দেশে নিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশকে উন্নত দেশের মহাসড়কে নিতে কাজ চলছে ১০টি মেগা প্রকল্পের।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালন করছে এখন গোটা জাতি। বছরব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে। যার মাধ্যমে বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন বাংলাদেশ ও সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ। করোনার ভয়াবহ প্রকোপে গোটা বিশ্বে এক ধরনের অচলাবস্থা, স্থবিরতা নেমে এসেছে। গোটা বিশ্ব চরম এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। করোনার কারণে বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থনীতিতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। করোনার কারণে এখানেও শিল্প কলকারখানার উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকলেও আবার সব সচল হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে এর মধ্যেই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে কৃষি, শিল্প, সেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিটি ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে দেশের সব মানুষকে দলমত নির্বিশেষে সচেষ্ট এবং সক্রিয় হতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে আবার সমৃদ্ধ করে তুলতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন নানাভাবে। এক্ষেত্রে কোনোভাবেই পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই আমাদের। জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির কার্যক্রমকে জোরদার করতে হবে সম্মিলিত এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে।
লেখক : সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা





