নিমতলীর পর এবার অগ্নিকাণ্ডের শিকার একই এলাকার (পুরান ঢাকা) চকবাজারের চুড়িহাট্টা এলাকা। গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে এ অগ্নিভস্ম অঘটনে অন্তত ৭১ জন পুড়ে মারা গেছেন। এর আগে ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলী এলাকায় রাসায়নিকের গোডাউন থেকে আগুনের সূত্রপাত হলে সেদিন মাত্র তিন ঘণ্টায় ভস্মীভূত হয়ে প্রাণ হারান ১২৪ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ২৬২টি পরিবার। এত অল্প সময়ের আগুনে এত বেশি মানুষের পুড়ে মরার ঘটনা সেটাই ছিল দেশে প্রথম।
এবার দাহ্য-রাসায়নিকের কারণে পুড়ে কয়লা হয়েছে অন্তত ৭১ জনের দেহ। নিমতলী অঘটনে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা এড়ানো যায়, সেজন্য তদন্ত কমিটি বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে কমিটি ঘটনার কারণও নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছে।’ এছাড়া ওই ঘটনায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘সরকার ইতোমধ্যে পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক পদার্থের দোকান ও গুদাম সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ আসলে মন্ত্রীদ্বয়ের এ বক্তব্য কাজের কাজ কি কিছু করতে পেরেছে? যদি কাজ হয়েই থাকে, তাহলে আজ কেন চকবাজারের ঘটনায় মানুষ কাঁদছে?
রাজধানীর চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডে নিহত স্বজনের কান্নায় ধুঁকছিল ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল মর্গ। সেই কান্নার হূদয়াহত শব্দ হয়তো শুনতে পারেনি কেউ। কিন্তু স্বজনহারা দুঃসহ বেদনায় কাতর মানুষের ব্যথিত অবয়ব সংবাদমাধ্যমে ঝড় তুলেছে। তেমনি একটি ছবি আমার হূদয়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। ছবিটির ক্যাপশনে বলা হয়- ‘চকবাজারে নিহত কাওসার আহমেদের যমজ শিশুর একজন আবদুল্লাহ। মৃত্যু কী বোঝার বয়স হয়নি তার। বৃহস্পতিবার ঢামেক মর্গের সামনে সবার কান্না দেখে কাঁদছিল সেও।’ যমজ এই শিশুটি সবার কান্নায় নিজেও কাঁদছিল অঝোরে। এর জন্য দায়ী কে বা কারা? বলতে হয়, এর জন্য দায়ী রাষ্ট্র।
২০১০ সালের নিমতলীর ঘটনা আজো মনে রেখেছে দেশবাসী। নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১২৪ জনের আপনজনদের মাঝে সর্বস্ব হারানো তিন কন্যা রুনা, রত্না ও শান্তার কথা হয়তো কেউ ভোলেনি। বিয়ের মেহেদি রাঙা অভিভাবকহীন তিন কন্যার বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া তার নির্দেশে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই ক্ষতিপূরণ এবং একজন মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রীর মাতৃসম সহযোগিতা কি কারো স্বজনহারা শোক সরিয়ে দিতে পেরেছে। সেদিন যে কারণে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল, সেগুলোর ব্যাপারে যদি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো তাহলে হয়তো আজকের চকবাজার ও সেখানকার মানুষ অক্ষত থাকত।
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত নিমতলীর ঘটনায় সেদিনকার ১৭ দফা সুপারিশে বলা হয়েছিল, জরুরি ভিত্তিতে আবাসিক এলাকা থেকে গুদাম বা কারখানা সরিয়ে নেওয়া, অনুমোদনহীন কারখানার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, রাসায়নিক দ্রব্যের মজুত, বাজারজাতকরণ এবং বিক্রির জন্য লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া জোরদার করা, ‘অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ২০০৩’ ও ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করা, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক বা বিস্ফোরক দ্রব্যের মজুত বা বিপণনের বিরুদ্ধে জনমত গঠন, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক দ্রব্য বা বিস্ফোরক জাতীয় পদার্থ মজুতকরণ বা বিপণন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা, ঘরবাড়িতে ব্যবহূত বৈদ্যুতিক তারের গুণগত মান নিশ্চিত করা, রাস্তায় স্থাপিত খোলা তারের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন, সম্ভাব্য দুর্ঘটনা পরিহার করতে প্রতি মাসে অন্তত একবার বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার সরেজমিনে গিয়ে পরীক্ষা করা, দ্রুত অগ্নিনির্বাপণের জন্য স্থানীয়ভাবে পৃথক পানির লাইনসহ হাইড্রেন্ট পয়েন্ট স্থাপন করা প্রভৃতি।
নিমতলীর অগ্নি বীভৎস অঘটনের নয় বছরে তদন্ত কমিটির ১৭ দফা সুপারিশের একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। এর মধ্যে ওই সুপারিশের চিহ্নিত কারণগুলো আবারো চকবাজারে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ডেকে এনেছে। চকবাজারের ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে ফের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি আবারো হয়তো কিছু সুপারিশ তুলে ধরবে। কিন্তু কাজের কাজ কি কিছু হবে?
লেখক : সাংবাদিক
নরংযধি৮৫—মসধরষ.পড়স





