জাতীয়

দুর্নীতি ঢাকতে ফাইল গায়েব

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৪ অক্টোবর, ২০২১

কাস্টমের চোখের সামনেই দিনের পর দিন মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানির ঘটনা ঘটছে। সংঘবদ্ধ একটি জালিয়াতিচক্র নানা অপকৌশলে একদিকে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে, অন্যদিকে দেশ থেকে হচ্ছে বিপুল অঙ্কের অর্থপাচার। শুধু তাই নয়, সরকারও প্রতি বছর মোটা অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। আর অসৎ ব্যবসায়ীদের রক্ষায় সরকারি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা গায়েব করে ফেলছে সকল ফাইল। দুর্নীতি প্রমাণের পরও এখন পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি শক্ত কোন পদক্ষেপ।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, একটি শক্তিশালীচক্র পণ্য আমদানিতে মূল্যের অবমূল্যায়ন, অতিমূল্যায়ন, পণ্যের বিবরণ, এইচএস কোড, ওজন, পরিমাণ, গুণগতমান প্রভৃতি বিষয়ে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে প্রতারণা করে আসছে প্রতিনিয়ত। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪২৯টি মিথ্যা ঘোষণা শনাক্ত করে চট্টগ্রাম কাস্টম কর্তৃৃপক্ষ।

সর্বশেষ চলতি বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরে দুটি কন্টেইনারভর্তি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি সিগারেট জব্দ করে কাস্টমস। ‘বাংলাদেশ টেক্সটাইল অ্যান্ড কেমিক্যাল ফাইবার ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড’ নামের প্রতিষ্ঠানটি চীন থেকে কাপড় ও কাপড়ের সরঞ্জাম আনার ঘোষণা দিয়ে এক কোটি ১৩ লাখ সিগারেট (শলাকা) আমদানি করে। যেখানে শুল্ক-করসহ ২৭ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা হয় বলে জানায় কাস্টম কর্তৃপক্ষ। আর এসব কাজের সাথে জড়িত বন্দরেরই কিছু অসৎ কর্মকর্তা। এদের দ্বারা বিভিন্ন সময় নথি গায়েবের ঘটনাও ঘটেছে। আবার এজন্য বড় কোনো শাস্তির উদাহরণও কখনো দেখা যায়নি। ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর নয়াবাজারে ‘আল-আমিন মেরিটাইম ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেলস ফ্যাশন’ নামের এক পোশাক কারখানা থেকে ৬৫টি গোপন নথি উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সূত্র অনুযায়ী, আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিং-এর মাধ্যমে অর্থপাচারের হার সবচেয়ে বেশি। আমদানিযোগ্য পণ্য বা সেবার মূল্য বৃদ্ধি করে বিশেষত যেসব পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক কম যেমন-মূলধনী যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, কম্পিউটারসামগ্রী ইত্যাদি বা যেসব পণ্য বা সেবার দাম নির্ধারণ করা কঠিন সেসব পণ্য বা সেবা আমদানির মাধ্যমে অর্থপাচার হয়ে থাকে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, পাচার হওয়া অর্থের ৮০ শতাংশেরও বেশি বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে হয়ে থাকে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গোয়েন্দা অনুসন্ধানে নথি গায়েব ও মিথ্যা ঘোষণার সঙ্গে কাস্টম কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরাসরি যোগসাজশের বেশকিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে। আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও কাস্টম কর্মকর্তাদের পারস্পরিক যোগসাজশে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হাতিয়ে নিচ্ছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র।

এর আগে ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে বেশকিছু সুপারিশ পাঠায় দুদক। মন্ত্রিপরিষদে পাঠানো সুপারিশে কাস্টম হাউসগুলোর ব্যাপক প্রচলিত অনিয়মের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, পণ্য আমদানিতে এর মূল্য অবমূল্যায়ন, অতিমূল্যায়ন, পণ্যের বিবরণ, এইচএস কোড, ওজন, পরিমাণ, গুণগতমান ইত্যাদি বিষয়ে মিথ্যা ঘোষণা, প্রতারণা এবং একই প্রকার পণ্যের একাধিক চালান প্রস্তুতের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আদায় থেকে সরকারকে বঞ্চিত করছে কাস্টম হাউসগুলো। তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয় ওই সুপারিশে।

দুদকের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বল হয়, চট্টগ্রাম বন্দরে বিভিন্ন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে মালামাল আমদানিতে প্রতারণা ও জালিয়াতি করে। বিষয়টি ধরা পড়ার পর এর দায় থেকে রক্ষা পেতে বন্দরের অসৎ কর্মকর্তাগণের যোগসাজশে নথি গায়েব করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার জন্য দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাগণের যোগসাজশে রিপোর্ট পরিবর্তন বা স্বাক্ষর জাল করে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে নয়টি বিল অব এক্সচেঞ্জ (বি.ই) এর বিপরীতে নয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নথি গায়েব এবং পাঁচটি বি.ই-এর বিপরীতে তিন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক স্বাক্ষর জাল এবং রিপোর্ট পরিবর্তনের প্রমাণে পাওয়া গেছে। বেশি শুল্ক পরিশোধযোগ্য মালামাল আমদানি করে কম শুল্কের পণ্যের কোড ব্যবহার করে আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও কাস্টম কর্মকর্তারা পরস্পর যোগসাজশে সরকারের লাখ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪২৯টি মিথ্যা ঘোষণা শনাক্ত করেছে চট্টগ্রাম কাস্টম কর্তৃপক্ষ।

দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) মো. মোজাম্মেল হক খান বলেন, মিথ্যা ঘোষণায় রাজস্ব ফাঁকি কিংবা বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচারের অভিযোগ নতুন নয়। সরকারি অর্থ আত্মসাতের যে কোনো ঘটনা তফসিলভুক্ত অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে দুদক অনুসন্ধান করে থাকে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads