মুক্তমত

তারুণ্যের শক্তিতেই এগিয়ে যাবে দেশ

  • প্রকাশিত ১১ মার্চ, ২০২১

মুশফিকুর রহমান ইমন

 

 

 

বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বে অপার সম্ভাবনার একটি দেশ। বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি এ দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে বিশ্বের দরবারে এক নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে উন্নয়ন শব্দটির সাথে বাংলাদেশ নতুন করে নাম লিখিয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক থেকে বিশ্বের দেশগুলোকে উন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত হিসেবে বিভাজন করা হয়ে থাকে। জাতিসংঘের উদ্যোগে বাংলাদেশকে ১৯৭৫ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ইতোমধ্যে বিশ্বের অনেক দেশ স্বল্পোন্নত দেশের এই তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হয়েছে। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা- এই তিন সূচকের ভিত্তিতে একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে পারবে কিনা, সেই যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে ৩২ পয়েন্ট বা এর নিচে, মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ বা এর বেশি পয়েন্ট এবং মাথাপিছু আয় সূচকে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার থাকলেই সে দেশটি উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করে। ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা- এই তিন সূচকেই মান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ করেছে সিডিপি। সত্যিই বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য অর্জন! কিন্তু বাংলাদেশের এমন ইতিবাচক অর্জনের মাঝেও বৈশ্বিক করোনা মহামারী বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অনেকটাই ওলট-পালট করে দিয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য চিত্রটা আরেকটু ভিন্ন। কারণ করোনার পাশাপাশি নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও বৈষম্য এর সাথে যুক্ত হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ও পিপিআরসির একটি জরিপে দেখা গেছে, ২০২০ সালের জুলাই শেষে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে ছিল ২০ শতাংশ। অন্যদিকে সিপিডির ভাষ্যমতে, দারিদ্র্যের হার এখন ৩৫ শতাংশ। সেইসাথে দেশে বর্তমানে আয়বৈষম্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৫২ পয়েন্ট যা ২০১৬ সালে ছিল দশমিক ৪৮ পয়েন্ট। করোনা অতিমারীর আগে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপে দারিদ্র্য বিমোচনের যাত্রায় বাংলাদেশ অনেকটাই এগিয়ে ছিল। কিন্তু করোনার ধাক্কায় দেশে মানুষের আয় কমে গেছে, অনেকে কাজ হারিয়েছেন। বহু মানুষ নতুন করে বেকার হচ্ছেন। তবে দেশের মোট জিডিপি ৫ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে একদিকে কিন্তু কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি তেমন বাড়ছে না। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০০২-০৩ থেকে ২০০৫-০৬ অর্থবছরের মধ্যে প্রতিবছর ২ দশমিক ২৫ শতাংশ হারে কর্মসংস্থান বেড়েছে। পরের ৫ বছরে বেড়েছে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ হারে। ২০১০-১৩ ও ২০১৩-১৭ তে যথাক্রমে তা কমেছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ ও ১ দশমিক ৩০ শতাংশ হারে। উক্ত পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে, বাংলাদেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশ হলেও তা কর্মসংস্থানহীন। ফলে বাংলাদেশে বেকার সমস্যা প্রধান সমস্যাগুলোর একটি বর্তমানে। ২০১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। অর্থাৎ বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ। আবার বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রতিবছর ২২ লাখ নতুন মুখ যুক্ত হচ্ছে। করোনার কারণে আবার তরুণদের বেকারত্বের হার দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে চাকরিপ্রত্যাশী তরুণরা জীবন ও জীবিকার লড়াইয়ে হতাশাগ্রস্ত জীবন পার করছে। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাদের মধ্যে হতাশার মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে আত্মহত্যার মতো ঘটনা দেশে বাড়ছে।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশই তরুণ। বর্তমান লোকসংখ্যার হিসাবে দেশে সাড়ে চার কোটির বেশি তরুণ রয়েছে। একটি দেশের প্রধান চালিকাশক্তি ও ভবিষ্যৎ নির্মাতা হিসেবে তরুণরাই অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই এই বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ব্যতীত একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নতি আশা করা যায় না। তাই একটি দেশের অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন সাধনে তরুণরাই অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করতে পারেন। এজন্য তরুণদেরকে তাদের মেধা ও মননের সর্বোচ্চ প্রয়োগের পাশাপাশি দেশের জন্য কাজ করার তাড়না থাকতে হবে। তরুণদের অদক্ষ ও সস্তা শ্রমের বাজার থেকে বেরিয়ে নিজেদের দক্ষ, জ্ঞান-বিজ্ঞানসমৃদ্ধ ও শিল্প-সাহিত্যে উন্নত স্মার্ট একটি জাতিতে পরিণত হতে হবে। এজন্য শুধু গ্রন্থগতবিদ্যা বা প্রচলিত শিক্ষার মধ্যে নিজেদের আটকে না রেখে বাক্সের বাইরে চিন্তা করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক ও যুগোপযোগী আসন্ন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদামাফিক নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। এছাড়াও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন আইডিয়ার ওপর ভর করেই এগিয়ে যেতে হবে। তরুণদের সব ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের সাথে খাপখাইয়ে চলার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বর্তমান পৃথিবীর এই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে টিকে থাকতে হলে তরুণদের পুরনো ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন নতুন আইডিয়া কাজে লাগিয়ে বিশ্বে নিজেদের পরিচিত করে তুলতে হবে। পরিবর্তিত এই পৃথিবীতে দক্ষতা দিয়েই টিকে থাকতে হবে।

বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক অর্জন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে এসে দেশ গড়ার দায়িত্বে আত্মনিয়োগ করতে হবে। কারণ আজকের তরুণই আগামী দিনের কান্ডারি, আগামীর সোনালি স্বপ্ন বাস্তবায়নের রূপকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যে বলেছেন, আগামী ২০ বছরে যাতে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হতে পারে, তার জন্য বিস্তারিত পরিকল্পনা ও কর্মসূচি তৈরি করে রাখা হয়েছে। তরুণ প্রজন্মকেই সেগুলো বাস্তবায়নের রূপকার হিসেবে কাজ করতে হবে। কারণ, পৃথিবীতে যত উন্নত রাষ্ট্র আমরা দেখি, তারুণ্যের হাত ধরেই আজ সাফল্যের এই চূড়ায় তারা আরোহণ করেছে। তাই তরুণদের বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার সোনার মানুষ হয়ে জাতির নেতৃত্বে আত্মনিয়োগ করতে হবে। তারুণ্যের হাত ধরেই এগিয়ে যাক আমাদের প্রাণের এই বাংলাদেশ। তারুণ্যের জয় হোক!

 

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads