মুক্তমত

জমিতে প্রয়োগ করা কীটনাশক নারীর জন্য ক্ষতিকর

  • প্রকাশিত ২৫ জানুয়ারি, ২০২১

ইয়াসমীন রীমা

 

 

বাংলাদেশের আধুনিক কৃষিতে নারীদের অসামান্য অবদান রয়েছে। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী এশিয়ার অর্ধেক অঞ্চলজুড়ে অর্থনীতিতে সক্রিয় নারীদের ৮০ শতাংশ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ বেড়ে গেছে। নারী ও পুরুষ উভয়েই এই কীটনাশক প্রয়োগ করছেন জমিতে। পরোক্ষভাবে কীটনাশক চলে আসছে বাড়িতে। রাসায়নিক বিষের ভয়ংকর গ্রাস থেকে নারীকৃষকরাও রক্ষা পাচ্ছে না। আর নারী কৃষকের সংখ্যাটি দিন দিন বেড়েই চলেছে। আইএলও’র এক রিপোর্টে অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে চাকরি বা ভালো সুযোগ-সুবিধার জন্য পুরুষরা বেশি শহরকেন্দ্রিক হচ্ছে। যার ফলে গ্রামাঞ্চলে নারীকৃষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

নারীদের ওপর রাসায়নিক কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু কৃষিকর্মের দ্বারাই হয় না। নারীদের অনেক সময় বিভিন্ন রকমের ওয়াশিং পেস্টিসাইড নিয়ে কাজ করতে হয়। আর আমাদের গ্রামাঞ্চলে একটি সুপরিচিত চিত্র হচ্ছে— রাসায়নিক বিষের বোতল বাড়িতে নিয়ে আসার পর মহিলারা ভালো করে সোডা বা ছাই দিয়ে পরিষ্কার করে এগুলোর ভেতর তেল রাখেন। অধিকন্তু দানাদার বিষ এবং একই সঙ্গে ইউরিয়া, পটাশ, টিএসপি সার একত্রে গামলায় মিশিয়ে জমিতে প্রয়োগ করা হয়। কাজ শেষে যখন ওই গামলা বাড়িতে আনা হয়, তখন বাড়ির মহিলারা এটা পরিষ্কার করেন। কিন্তু ছাই দিয়ে পরিষ্কারের সময় এর থেকে একটি গ্যাস নির্গত হয়। নির্গত গ্যাসটি তাদের দেহের ভেতরে গিয়ে ক্ষতি করে।

এশিয়া জোনের কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. কিউ ইউ চক্রবর্তী বলেন, ‘খবরের কাগজে, সেমিনারে, টেলিভিশনের পর্দায় কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ইত্যাদির পরিমাপ দেখে বুকের মধ্যে থেমে থাকা দমটা টেনে নিই। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় পরিবেশবাদীরা পরিবেশ রক্ষার তাগিদে আন্দোলনে নেমেছেন, কিন্তু প্রজনন ক্ষমতার ওপর পরিবেশ দূষণের প্রতিক্রিয়া বা মা ও শিশু পরিবেশ দূষণে কতটা জর্জরিত বিষয়টি খুব কমই তলিয়ে দেখেন।’

তাছাড়া কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের ডাক্তার সরতাজা বেগম বলেন, যে কোনো শিল্পে ব্যবহূত রাসায়নিক দ্রব্য আমাদের প্রজনন ক্ষমতার ওপর কমবেশি প্রভাব ফেলে। ফলে অন্তঃসত্ত্বা নারী যারা কারখানায় কাজ করেন, তাদের বাচ্চার জন্মগত বিকলাঙ্গ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার যথেচ্ছ পরিমাণে কীটনাশক দ্রব্য ব্যবহারের ফলে জার্মসেল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ডিম্বাণু ও শুক্রাণু তৈরির পরিমাণ কমিয়ে দেয়। রেডিয়েশন বা অণু বিকিরণের ফলেও একই সমস্যা দেখা দেয় স্পার্ম ও ওভারির ক্ষেত্রে। ভারী পদার্থ, যেমন— সিসা, পারদ, স্ত্রী-পুরুষ শ্রমিকের জননেন্দ্রিয়ের ওপর প্রতিক্রিয়া করে। ফলে ক্রোমোজম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে বন্ধ্যাত্ব ও বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয়। নারীদের ক্ষেত্রে রক্তপাত হতে পারে, অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে। চোখে ঝাপসা দেখতে পারে, ব্রেস্ট ক্যানসার হতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু ভেষজ কীট ধ্বংসকারী রাসায়নিক নারীদের অ্যাস্ট্রোজন হরমোন নিঃসরণে সমস্যার সৃষ্টি করে। ফলে নারীদের ঋতুস্রাবজনিত সমস্যা দেখা যায়। কার্বনেট এবং অর্গানোফসফেটযুক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে অপ্রাপ্ত বাচ্চা জন্মের হার এবং গর্ভপাতের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। কীটনাশকের প্রভাবে হাঁচি, কাশি, ফোসকা পড়া বিভিন্ন রকম চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, খাদ্যে অরুচি ইত্যাদি রোগও দেখা দিতে পারে। আগে রাসায়নিক কীটনাশকের মধ্যে ডিডিটির ব্যবহার ছিল সর্বাধিক। ডিডিটির ব্যবহার নারীদের ব্রেস্ট ক্যানসারের অনেকগুলো কারণের অন্যতম। আমাদের দেশে দেখা যায়, রাসায়নিক কীটনাশক কৃষকরা ব্যবহারের আগে বাড়িতেই রেখে দেন। অধিকাংশ নারীকৃষক বোতলের নির্দেশিকা ঠিকমতো না পড়ে উপযুক্ত পোশাক এবং আবরণী না ব্যবহার করেই জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করে, এমনকি এর প্রয়োগের জন্য সঠিক কৃষি যন্ত্রপাতিও থাকে না। আবার জমিতে কীটনাশক প্রয়োগের পর সেখানকার পানিতেই অনেকে হাত-পা ধুয়ে ফেলে যা মোটেই গ্রহণীয় নয়।

তবে আশার কথা এই যে, কীটনাশকের ওপর একক নির্ভরশীলতা পরিত্যাগ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, সহজ, উৎপাদন এবং ভোক্তার জন্যে সবচেয়ে কম ক্ষতিকারক দমন ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবন করা হয়েছে। এক বা একাধিক ভিন্ন ধরনের কৌশল ব্যবহার করে ক্ষতির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব যা সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা যা আইপিএম নামে পরিচিত। কীটনাশক নারীর শরীরের ক্ষতি করে। এতে করে হত্যা করা হচ্ছে ভবিষৎ প্রজন্ম। সরকারকে কীটনাশকের বিজ্ঞাপনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে। কীটনাশকের প্যাকেটের ওপর লেখা থাকতে হবে এটা ব্যবহারের ক্ষতির দিক। ডিলারদের জন্য যে কীটনাশক বিক্রির সঙ্গে ব্যবহারের জন্য কাপড় দিতে হবে। সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগকে দায়িত্ব নিতে হবে কীটনাশকের ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমানো এবং ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে তদারকি করা। তা না হলে নারীর প্রজনন ক্ষমতা হুমকির মুখে পড়বে, বিকলাঙ্গ হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

 

লেখক : সাংবাদিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads