রাজনীতির মাঠ শীতল। সংকুচিত রাজপথ। দলীয় ও জাতীয় ইস্যু নিয়ে মাঠে আছে হাতেগোনা কয়েকটি দল। এ সংখ্যা অর্ধডজনের বেশি নয়। উপরন্তু এসব রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড এখন ঘরকেন্দ্রিক। আর মাঠের রাজনীতি ঘরে ঢোকার কারণে কোন্দল বাড়ছে দলগুলোর ভেতরে। বড় দলগুলোতে দ্বন্দ্বের ছাপ বোঝা যায় না। ছোট ছোট দলগুলোতে কোন্দলের প্রকোপ বেশি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. নুরুল আমিন বেপারীর ভাষ্য, দেশে রাজনীতি নেই। রাজনৈতিক দলের ভিশন নেই। নেতা আছে, নেতার আদর্শ নেই। তারা কেবলই ক্ষমতার দিকে ছাতা ধরেন। মানুষের কথা নিয়ে কর্মসূচিগুলো বিবৃতিনির্ভর হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক দল চাঙ্গা থাকতে হলে দেশে নির্বাচন ও রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকতে হয়। দেশে মাঝেমধ্যে নির্বাচন হয়। কিন্তু তাতেও দলগুলো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। কারণ সংগঠন দুর্বল। ছোট দলে বড় কোন্দল বিরাজ করছে। দলগুলোতে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের আগমন, দলীয় প্রধানের একক সিদ্ধান্ত, পদ-পদবি পাওয়া, না-পাওয়াসহ ছোটখাটো বিষয়েই অস্থিরতা লেগে আছে বলে বিশ্লেষণ এই বিদ্বজনের।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, দেশে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ১২০ বা তারও বেশি। নিবন্ধিত দলগুলো তাদের কার্যক্রমের তথ্য কমিশনকে অবহিত করলেও অনিবন্ধিত দলগুলো সেটা করে না। মাঝেমধ্যে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) অনুসরণ করে নিবন্ধিত দলগুলোকে চিঠিপত্র দেয় কমিশন। গড় চিঠি বা আদেশ জারি করে সবার বেলায়। ফলে সঠিক তথ্যও নির্বাচন কমিশনে নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি থাকায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গড়া মহাজোট ও ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে যে অস্থিরতা তা খুব একটা দৃশ্যমান নয়। তারা রাজপথে নেই, তবে দু-একটা দল খণ্ডিত হয়েছে। তবে তারাও জোট ছাড়েনি। ১৪ দলীয় জোটের শরিক সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর জাসদ খণ্ডিত হয়েছে। একাংশে ইনু-শিরিন, অপরাংশে শরীফ নুরুল আম্বিয়াকে সভাপতি ও নাজমুল হক প্রধানকে সাধারণ সম্পাদক করে পৃথক কমিটি ঘোষণা করা হয়। আম্বিয়ার জাসদের নাম বাংলাদেশ জাসদ। ভেঙেছে রাশেদ খান মেনন এমপির দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। নব গঠিত পার্টির নাম বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী)। এই পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হয়েছেন নুরুল হাসান এবং সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবীর জাহিদ।
মহাজোটের আরেক শরিক বিকল্প ধারা বাংলাদেশও খণ্ডিত হয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর (বি চৌধুরী) নেতৃত্বে আছে একাংশ। আরেক অংশ আছে ড. নুরুল আমিন বেপারীর নেতৃত্বে। বি চৌধুরী আছেন সরকারের শরিক হিসেবে আর নুরুল আমি বেপারী আছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে।
এদিকে বিএনপির নেতৃত্বে গড়া ২০ দলীয় জোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব কোন্দল বিরাজ করছে। দল ভেঙে পাল্টা দল গঠন, এক নেতা আরেক নেতাকে বহিষ্কারসহ ব্যক্তি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে মিথ্যা মামলার আশ্রয়ও নিতে দেখা গেছে।
২০ দলীয় জোটে শরিক সংখ্যা ২০ হলেও তাদের মধ্যে ১২টি দল ভেঙে গেছে। জোট টিকিয়ে রাখতে বিএনপির পরোক্ষ নির্দেশনায় সময় নিয়ে আবার রাতারাতি একই নামে গঠন করা হয়েছে সংগঠন। আবার কোনো দল জোটের প্রধান দলের প্রতি শর্তজুড়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে আছে।
বিএনপির অন্যতম শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে কিছু নেতা বেরিয়ে গেছেন। ‘জন-আকাঙ্ক্ষা’ নামের সংগঠন করে তারা জেলা সফর করছেন। দলের ভেতরেই সংস্কারপন্থি নামে একটি অংশ আছে, তারাও নতুন হিসাব-নিকাশ করছেন। এ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। সংকট মোকাবেলায় তারা আপাতত সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাচ্ছে ধীরগতিতে।
খণ্ডিত হয়েছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে ছেড়ে চলে গেছেন অর্ধশতাধিক নেতা। একই নামে সংগঠন ও কমিটি গঠন করেছেন তারা। এই অংশের সভাপতি আবদুল করিম আব্বাসী ও সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন সেলিম। আসল-নকল এলডিপি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিতর্ক চলমান।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) প্রতিষ্ঠাতা শফিউল আলম প্রধানের মৃত্যুর পর সংগঠনটি খণ্ডিত হয়েছে। একাংশের সভাপতি শফিউল আলম প্রধানের মেয়ে ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান। অপর অংশের সভাপতি হলেন দলটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক খন্দকার লুৎফর রহমান। তবে দুই অংশই জোটের সঙ্গে আছে।
জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম খণ্ডিত হয়েছে অনেক আগেই। এর একপাশে অ্যাডভোকেট আবদুল মবিন অপর পাশে মুফতি ওয়াক্কাস। পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেননি কেউই।
ডেমোক্রেটিক লীগ (ডিএল) প্রতিষ্ঠাতা অলি আহাদ। দলটির শক্ত কোনো কান্ডারি নেই। দলটি পরিচালনা করছেন সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহম্মেদ মনি। অলি আহাদ-কন্যা ব্যারিস্টার রুমিন ফারহান এখন বিএনপির কূটনীতিক কোরের সদস্য এবং দল মনোনয়নে সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য।
বাংলাদেশ লেবার পার্টি খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে দুই অংশের চেয়ারম্যান একে-অপরের বিরুদ্ধে আদর্শহীন এবং নৈতিক চরিত্র স্খলনের অভিযোগ করেছেন।
সর্বশেষ জাতীয় ঐক্য গঠনের জন্য রাজপথে থাকা ড. কামাল হোসেন নিজ দলের ঐক্য নিয়ে মহাসংকটে পড়েছেন। গণফোরামের পাল্টাপাল্টি কমিটি বহিষ্কারের প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছেন ড. কামাল। গতকাল বুধবার সংগঠনের প্যাডে তার স্বাক্ষরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই কথা জানিয়েছেন।
২০১৯ সালের এপ্রিলে ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি ড. রেজা কিবরিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে গণফোরামের ১০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল যা ১০ মাস পর ভেঙে দেওয়া হলো।
এ প্রসঙ্গে ড. কামাল হোসেন বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, সংগঠনের স্থবিরতা দূর করতে গত বছরের ২৬ এপ্রিল গণফোরামের বিশেষ কাউন্সিল হয়। ওই বিশেষ কাউন্সিলের ক্ষমতাবলে গণফোরামের সভাপতি হিসেবে আমি ৫ মে ২০১৯ ঘোষিত কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করছি। পরবর্তী জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত দলের যাবতীয় রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দায়-দায়িত্ব পালন করার জন্য ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি ও ড. রেজা কিবরিয়াকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গণফোরামের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি গঠন করছি। এই কমিটি গণফোরামের গঠনতান্ত্রিক সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করবে।
গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে গণফোরামে অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকট আকার ধারণ করে। পাল্টাপাল্টি বহিষ্কারের ঘটনাও ঘটে। গত সোমবার গণফোরামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোশতাক আহমেদ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে সাংগঠনিক সম্পাদক হেলাল উদ্দিন, লতিফুল বারী হামিম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক খান সিদ্দিকুর রহমান ও প্রবাসীকল্যাণ সম্পাদক আবদুল হাছিব চৌধুরীকে বহিষ্কার করা হয়। পরদিন মঙ্গলবার ওই চারজনের স্বাক্ষরে দলের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া, প্রেসিডিয়াম সদস্য মহসীন রশীদ, শফিকউল্লাহ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোশতাক আহমদেক দল থেকে বহিষ্কার করে গণমাধ্যমে পাল্টা বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। এই দুই বহিষ্কারের বিজ্ঞপ্তিতে ড. কামাল হোসেনের কোনো স্বাক্ষর ছিল না।
গতকাল বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে ড. কামাল হোসেন জানান, কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির অন্যান্য সদস্যের নামের তালিকা চলতি মাসেই ঘোষণা করা হবে। গণফোরামের মহানগর, জেলা, উপজেলা, থানা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটিসমূহ আগের মতো যথারীতি বহাল থাকবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। ২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল বিশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে ড. কামাল হোসেনকে পুনরায় সভাপতি করে তাকে কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এদিকে অনেক আগেই ভেঙেছে আ স ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি। জেএসডি ভেঙে গঠিত নতুন দলের সভাপতি আবদুল মালেক রতন। তার অভিযোগ, জেএসডির নেতৃত্বে একাংশ আজকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, চেতনা, দলের অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতি এবং রাজনীতি আপদ-বিপদ হিসেবে পরিচিত শক্তির বিরুদ্ধে তৃতীয় শক্তি গড়ে তোলার অঙ্গীকার ভুলে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী দল ও গোষ্ঠীর সঙ্গে আঁতাত গড়ে তুলেছেন রব।
এর বাইরে কমবেশি অভ্যন্তরীণ সমস্যায় আছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (খালেকুজ্জামান), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মাহবুব), সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল), শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, বাংলাদেশ গণআজাদী লীগ ও গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি।





