১৯৫৭-৫৮ সময়কালে চা বোর্ডের প্রথম বাঙালি চেয়ারম্যান অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু চা বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন চা চাষাবাদ, কারখানা উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং শ্রমকল্যাণের ক্ষেত্রে চা শিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে চা বোর্ড চায়ের আবাদ ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম আরো বেগবান করতে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান টি লাইসেন্সিং কমিটি বিলুপ্তির জন্য পাকিস্তান টি অ্যাক্ট ১৯৫০-এর ৭ নং ধারায় সংশোধন আনেন এবং কমিটির কার্যক্রম চা বোর্ডে ন্যস্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ১৯৫৭ সালে চা বোর্ডের অধীন পাকিস্তান টি রিসার্চ স্টেশন (বর্তমানে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট) শ্রীমঙ্গলে প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর সরাসরি হস্তক্ষেপ ও তৎপরতায় এ প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়। বঙ্গবন্ধুর সময় চা বাগানের উন্নয়ন ও উন্নত জাতের চা উদ্ভাবনে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। চায়ের উচ্চতর ফলন নিশ্চিতকরণ, সর্বোচ্চ গুণগতমান অর্জন ও রোগবালাই দমনে বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। আর এ লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এবং সিলেটের ভাড়াউড়া চা বাগানে ‘রেসিস্ট্যান্ট ক্লোন’ জাতের চারা লাগানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রথমে ক্লোন এবং পরবর্তী সময়ে ক্লোন থেকে ক্লোনাল সিডবাড়ি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। উল্লেখ্য, ভারতের টোকলাইতে ১৯৪৯ সালে ক্লোন উদ্ভাবন করা হলেও বঙ্গবন্ধুর আগে পাকিস্তানে এ উদ্যোগটি কেউ গ্রহণ করেননি। বঙ্গবন্ধু টি অ্যাক্টে সংশোধনীর মাধ্যমে চা বোর্ডের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য কন্ট্রিবিউটরি প্রভিডেন্ট ফান্ড (ঈচঋ) চালু করেছিলেন, যা এখনো চালু রয়েছে। এছাড়া তার প্রচেষ্টায় বোর্ডে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্র্যাচুইটি প্রদানসহ অন্যান্য সুবিধা চালু হয়। বঙ্গবন্ধু চা শ্রমিকদের কল্যাণেও অত্যন্ত মনোযোগী ছিলেন। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে চা শ্রমিকদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার প্রদান করেছিলেন।
পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর সরকার স্বাধীনতা-উত্তর চা শিল্পের সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য চা বাগানগুলোর পুনর্বাসন, নতুন চা এলাকা সম্প্রসারণ, চা কারখানা আধুনিকীকরণ, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ জোরদার করার লক্ষ্যে সমীক্ষা পরিচালনা এবং চা শিল্পের পুনর্বাসন ও উন্নয়নে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা প্রদানের জন্য কমনওয়েলথ সচিবালয়কে অনুরোধ জানান। চা শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭২-৭৪ সাল পর্যন্ত চা উৎপাদনকারীদের নগদ ভর্তুকি প্রদান করার পাশাপাশি ভর্তুকি মূল্যে সার সরবরাহ করেন। চা কারখানাগুলো পুনর্বাসনের জন্য তিনি ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’ থেকে ৩০ লাখ ভারতীয় মুদ্রা মূল্যের ঋণ নিয়ে চা শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি করেন। বঙ্গবন্ধু চা বাগান মালিকদের ১০০ বিঘা পর্যন্ত জমির মালিকানা সংরক্ষণের অনুমতি প্রদান করেন।
বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট
গবেষণার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো, উৎপাদিত চায়ের গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৫৭ সালে শ্রীমঙ্গলে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট যাত্রা শুরু করে। ইনস্টিটিউট এ যাবৎ উচ্চ ফলনশীল ও গুণগত মান সম্পন্ন ১৮টি ক্লোন উদ্ভাবন, বাই ক্লোনাল ও পলি ক্লোনাল বীজ উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সহায়তায় বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উদ্ভিদ বিজ্ঞানের আওতায় উন্নত ক্লোন জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে অধিক ফলন নিশ্চিত করা। চা শিল্পে দক্ষ কলাকুশলী গড়ে তোলার লক্ষ্যে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাটি আধুনিক মানের এবং উৎপাদিত চা ও প্যাকিংয়ের মান উন্নতমানের।
বাংলাদেশ চা বোর্ড
বাংলাদেশ চা বোর্ডের প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে চা শিল্পের উন্নয়ন তথা চায়ের উৎপাদন, বিপণন ও রফতানি বৃদ্ধির জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, নতুন চা বাগান প্রতিষ্ঠা ও পরিত্যক্ত চা বাগান পুনর্বাসন, বাংলাদেশে উৎপাদিত চায়ের ওপর উপ-কর আরোপ এবং তার সহায়ক অন্যান্য বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ ও সামগ্রিকভাবে চা শিল্পের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা।
চা বোর্ডের তথ্যমতে, দেশে ১৬৬টি টি এস্টেট ও চা বাগানের মধ্যে নিবন্ধনকৃত টি এস্টেট ১২৯টি, স্থায়ী নিবন্ধন প্রাপ্ত চা বাগান ৩০টি এবং অস্থায়ী নিবন্ধনপ্রাপ্ত চা বাগান ৭টি। সব মিলিয়ে চা আবাদ করা মোট জমির পরিমাণ ২ লাখ ৭৯ হাজার ৪৩৯ দশমিক ৬৩ একর। এর মধ্যে মৌলভীবাজারে ১ লাখ ৫৬ হাজার ১৯১ দশমিক ৯৪ একর, হবিগঞ্জে ৫৪ হাজার ১৬৪ দশমিক ১৬ একর, সিলেটে ২৮ হাজার ৯৩৬ দশমিক ৩২ একর, চট্টগ্রামে ৩৪ হাজার ৫৬০ দশমিক ৪৫ একর, রাঙামাটিতে ৭৯৪ দশমিক ৯৪ একর, পঞ্চগড়ে ৪ হাজার ৭৫১ দশমিক ৫ একর, ঠাকুরগাঁওয়ে ৪০ দশমিক ৭৭ একর আবাদযোগ্য জমিতে চা চাষ হচ্ছে। গত এক দশকে চা বোর্ডের নেওয়া সম্প্রসারণ কার্যক্রমের আওতায় পঞ্চগড় ও বান্দরবান জেলাকে চা চাষের আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে পঞ্চগড়ে বাগান ও ক্ষুদ্রায়তন (কৃষিজমিতে চা চাষ বা সর্বোচ্চ ২০ একর জমিতে চা চাষ) চা চাষের ভূমির পরিমাণ ১ হাজার ৫৫৫ হেক্টর। আর পার্বত্য জেলা বান্দরবানে ১২৩ হেক্টর জমি রয়েছে চা চাষের আওতায়।





