নুরউদ্দীন খান সাগর/ মোহাম্মদ আলী, চট্টগ্রাম থেকে :
চট্টগ্রামের চালের অন্যতম বৃহত্তম পাইকারী বাজার পাহাড়তলী, চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জের চালপট্টিতে উত্তরাঞ্চলে বন্যার অজুহাতে দফায় দফায় চালের দাম বাড়াচ্ছে।এর প্রভাব প্রতিটি খুচরা বাজারে পরিলক্ষিত হচ্ছে কেজি প্রতি বেড়েছে ৫ থেকে ৬ টাকা।
বৃহস্পতিবার চালের দাম বৃদ্ধি যাচাই করতে খাতুনগঞ্জের চালপট্টিতে অভিযান পরিচালনা করেছে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসময় বেশি দামে চাল বিক্রি ,মূল্যতালিকা না টাঙানো, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে ব্যবসা পরিচালনার দায়ে চার ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে এবং চালের দাম না বাড়ানোর জন্য সতর্ক করা হয়। কিন্তু থেমে তবুও নেই চালবা্বাজি!
খাতুনগঞ্জের চালপট্টিতে অভিযান পরিচালনা করা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আলী হাসান তিনি জানান, উত্তরবঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় বন্যার অজুহাত দেখিয়ে চালের দাম বৃদ্ধির অভিযোগ পেয়ে চালপট্টিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি দোকানে বেশি দামে চাল বিক্রি করছে।আবার প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে অনেকে মূল্যতালিকায় দাম কম লিখে বিক্রির সময় বেশি দামে বিক্রি করছে। দামের রশিদে কারচুপি ও দাম বৃদ্ধির কারসাজির প্রমাণ পাওয়া যায়।তাই এসব অভিযোগে চাল ব্যবসায়ী বাবুল ট্রেডার্সকে ১০ হাজার, সাদ ট্রেডার্সকে ১০ হাজার, জাফর ট্রেডার্সকে ৩ হাজার এবং ফরিদ ট্রেডার্সকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
তিনি আরও জানান, দোকানগুলো চালের দাম বাড়িয়ে ৫০ কেজি আতপ ১৮২০, বেতি ১৯০০, ২৫ কেজির পাইজাম ১১৫০, চিনিগুরা ২২০০, জিরাশাইল ২৪৫০ এবং বালাম সিদ্ধ চাল ১৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিলো।
এসব ব্যবসায়িদের জরিমানার পাশাপাশি সতর্ক করা হয়েছে। সেইসাথে কোন অজুহাতে চালের দাম বৃদ্ধির প্রমাষ পেলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।
এদিকে পাইকারি বিক্রেতা ও' চালকল মালিকরা বলছেন, মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের কাছে মজুত থাকা ধানের দাম বাড়তি থাকায় এবং উত্তরাঞ্চলে বন্যার কারণে সরবরাহে সংকট হওয়ায় চালের দাম বাড়ছে।
তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, চালকল মালিক ও পাইকারি বিক্রেতাদের সিন্ডিকেট সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই ঈদুল আজহার পর থেকেই কিছুটা বাড়তি দামে চাল বিক্রি শুরু করেছে এখন বন্যার অজুহাতে আরেক দফা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরীর চালের অন্যতম পাইকারি বাজার চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ ও পাহাড়তলী। এখান থেকেই সরবরাহ হয় পুরো চট্টগ্রাম জুড়ে। আজ শনিবার ২২ আগস্ট চাক্তাই ও পাহাড়তলীর পাইকারী বাজার সুত্রে জানা গেছে, স্বর্ণা সিদ্ধ ৫০ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে ২২৬০ থেকে ২২৬৫ টাকায়। কোরবানির ঈদের আগে এই চালের দাম ছিল দুই হাজার টাকার নিচে। বেতি আতপ বিক্রি হচ্ছে ৫০ কেজির বস্তা ২০০ টাকায়। দাম বেড়েছে ২০০ টাকা। নাজিরশাইল সিদ্ধ ২৫ কেজির বস্তা কোরবানি ঈদের আগে ১২৮০ টাকায় বিক্রি হলেও বৃহস্পতিবার বিক্রি হচ্ছে ১৪৮০ টাকায়। মিনিকেট আতপ ২৫০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২২৫০ টাকায়। দিনাজপুরী পাইজাম ২০০ টাকা বেড়ে ২৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মোটা সিদ্ধ চাল ১৬০০-১৭০০ টাকায় বিক্রি হতো, সেটাও ২০০ টাকা বেড়েছে। চিনিগুড়া চালের বস্তা ৩০০০ টাকা থেকে ৪৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তবে এর দাম বাড়েনি।পাইকারী বাজারের প্রভাবে খুচরা বাজারে বেড়েছে কেজি প্রতি ৫/৬ টাকা দরে।
চাক্তাই চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ওমর আজম জানান, মুলত ঈদের পর থেকেই কিছুটা বাড়তি দামে চাল বিক্রি হচ্ছে।উত্তরাঞ্চলে বন্যার কারণে বাজারে ধানের দাম বাড়তি। কোরবানীর ঈদের আগে যে ধান মণ প্রতি ৯২০ টাকা থেকে ৯২৫ টাকায় বিক্রি হতো, সেটা এখন ১০৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুই মণ ধান প্রসেসিং করে ৫০ কেজি চাল পাওয়া যায়। ফলে ৫০ কেজির একবস্তা চালে বাড়তি পড়ছে ২০০ টাকা।এরপর বন্যার কারণে নিচু অঞ্চল থেকে জেলা সদরে ধান আসতে পারছে না। সেজন্য বাজারে ধানের দাম বাড়ছে।তবে বর্তমানে চট্টগ্রামের বাজারে চালের তেমন কোনো সংকট নেই। ধানের দাম বাড়ার কারণে চালের দামও বাড়ছে।
এদিকে মিল মালিকরা বলছে, বন্যার কারণে ধানের দাম বাড়াতে চালের দামও বেড়েছে।
কিন্তু চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জের চালের পাইকারি বাজারের আড়তদার,পাইকারি ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকদের এসব অজুহাত মানতে নারাজ।তারা বলছে এসব মিল মালিকদের অজুহাত।বন্যার কারণে উত্তরাঞ্চল থেকে চাল সরবরাহে সাময়িক সমস্যা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু চাক্তাই ও পাহাড়তলীর বড় ব্যবসায়ীদের আড়তে যে পরিমান চাল মজুত আছে তাতে নতুন ধান বাজারে আশা পর্যন্ত । মূলত নতুন ধান আসার আগে এই বড় ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট চালের দাম বাড়িয়ে দিয়ে মুনাফা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য করছে চালবাজি।
তবে সচেতন মহল মনে করে, চালকল ,পাইকারী ও খুচরা বাজারের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের নিয়মিত কঠোর নজরদারি ও বাজার মনিটরিং জোড়দার করতে হবে।পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণে চিহ্নিত সিন্ডিকেট এর উপরও কঠোর নজরদারী বাড়াতে হবে।যাতে করে চালের বাজার কোন অজুহাতে অস্থির করতে না পারে।





