জাতীয়

গুরুতর অনিয়ম ছয় পাটকলে

  • বিশেষ প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ৭ ডিসেম্বর, ২০২১

বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় একটি ফসল সোনালি আঁশ পাট। স্বাধীনতার সময় পাটই ছিল দেশের প্রধান রপ্তানি ফসল। কিন্তু নানা অপচেষ্টা ও চক্রান্তে থমকে যায় পাটের অগ্রযাত্রা। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো পরিণত হয় লোকসানি প্রতিষ্ঠানে। একপর্যায়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল তাদের কার্যক্রম। পরে বেশ কিছু পাটকল ছেড়ে দেওয়া হয় বেসরকারি খাতে। এসব পাটকল লাভের মুখ দেখলেও এখনো লোকসান গুনছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল।

এবার বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের অনুসন্ধানে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় পাটকলে ২০১৬-১৭ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ মোট ৭৮ কোটি ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৫৩০ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে—আপ্যায়ন ব্যয়ে নয়ছয়, বিধিবহির্ভূত সম্মানি ভাতা উত্তোলন, বৈদেশিক ভ্রমণ ভাতা বিল করে টাকা তুলে নেওয়াসহ নানা অনিয়ম। পাটকলগুলো হচ্ছে, বাংলাদেশ জুট মিলস লিমিটেড, ইউএমসি জুট মিলস লিমিটেড, জুটো ফাইবার গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ, করিম জুট মিলস লিমিটেড, স্টার জুট মিলস লিমিটেড এবং হাফিজ জুট মিলস লিমিটেড। শুধু এই ছয় পাটকলই নয়, অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে বিজেএমসির প্রধান কার্যালয়েও। বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএমএ) মহাসচিব আবদুল বারিক খান বলেন, বিজেএমসির দুর্নীতির কারণে পাটকলগুলো বন্ধ হয়েছে। তারা চুরি করে খায়। বিজেএমসির কারণেই পাটশিল্পের আজ এ অবস্থা।

তিনি বলেন, এখন এ শিল্পকে বাঁচাতে হলে প্রথমে প্রয়োজন আধুনিক যন্ত্রপাতি। যে যন্ত্রপাতি আছে সেগুলো অনেক পুরোনো। বিজেএমসির অনেক ঋণের সুদ মওকুফ করা হয়েছে। তেমনি পুরো পাট খাতে এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। তার মতে, এ শিল্প বাঁচাতে হলে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বল্পসুদে ঋণ দিতে হবে। বিজিএমইএ গার্মেন্ট শিল্প রক্ষা করতে অনেক পলিসি সাপোর্ট দেয়। পাট খাতে এ ধরনের নীতি সহায়তা দিতে হবে।

এদিকে, অডিট অধিদপ্তর বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন বা বিজেএমসি কার্যালয়ের অনিয়মে ৪০ লাখ ১০ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি পেয়েছে। আপ্যায়ন খাতে প্রকৃত খরচের বদলে বিল ভাউচার ছাড়া খরচ দেখানোর ফলে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি ৮ লাখ ৪৮ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা।

এছাড়া তিন উপদেষ্টাকে বিধিবহির্ভূতভাবে একই সঙ্গে অবসর ভাতা এবং উপদেষ্টা হিসেবে সম্মানী ভাতা দেওয়ায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২৯ লাখ ৩১ হাজার ৪২৯ টাকা। প্রাপ্যের চেয়ে অতিরিক্ত হারে বৈদেশিক ভ্রমণ ভাতা বিল দেয়ায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২ লাখ ৩০ হাজার ৫২৭ টাকা।

জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের মধ্যে বড় অনিয়ম হয়েছে বাংলাদেশ জুট মিলসে। চারটি খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫২ কোটি ৭১ লাখ ৭৫ হাজার ৯৪৭ টাকা। অডিট অধিদপ্তর বলছে, মার্কেটিং ব্যবস্থাপনার গাফিলতির কারণে ক্রেতা সংগ্রহ না করার ফলে মজুত বেড়ে যাওয়ায় আয় কম হয়েছে। ফলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪৫ কোটি ৫২ লাখ ৫৩ হাজার ৯১৩ টাকা। বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন মিলগুলোর কাছ থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের পাওনা আদায় না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির পরিমাণ ৬ কোটি ১২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৬১ টাকা।

বেতনের বিপরীতে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত অগ্রিম অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে ১৩ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৬ টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন কেনার ক্ষেত্রে কেটে নেওয়া ভ্যাট ও আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় দণ্ড সুদসহ সরকারের রাজস্ব ক্ষতি ৯৩ লাখ ৫ হাজার ৮৫৭ টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত ইউএমসি জুট মিলে ১১ কোটি ৭২ লাখ ৬৭ হাজার ৪১৮ টাকার আর্থিক ক্ষতি পেয়েছে বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তর। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পাট বিভাগীয় প্রধান এস এ এইচ মনোয়ার আলী, চুরমুগুরিয়া কেন্দ্রের ইনচার্জ মোজাম্মেল হক, কামারপাড়া কেন্দ্রের ইনচার্জ নুরুল ইসলাম এবং মিলের গোডাউন ইনচার্জ আরিফুল চালান জালিয়াতি করেছেন। বিভিন্ন পাট সরবরাহকারীর বিল পরিশোধ না করে তারা আত্মসাৎ করেছেন ২ কোটি ২৪ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯২ টাকা।

মিলে শ্রমিক হাজিরার বিপরীতে অতিরিক্ত শ্রমিকের মজুরি শোধ করায় ক্ষতি ৭৩ লাখ ৬৮ হাজার ৮০০ টাকা। এ ছাড়া চালু তাঁতের বিপরীতে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বাজেট বরাদ্দ অপেক্ষা অতিরিক্ত ব্যয় করার ফলে প্রতিষ্ঠানের অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৮ টাকা। বিজেএমসি নির্ধারিত হার অপেক্ষা অতিরিক্ত হারে বেলিং বাকেলস খরচ দেখানোর ফলে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৫ লাখ ৮ হাজার ১৪৮ টাকা।

অনিয়ম পাওয়া গেছে জুটো ফাইবার গ্লাস ইন্ডাস্টিজেও। এই পাটকলে ১ কোটি ৪০ লাখ ৮৩ হাজার ১২১ টাকার আর্থিক ক্ষতি পেয়েছে বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তর। ট্রেড ডেবটরস এবং অন্যান্য অগ্রিম বাবদ অর্থ দীর্ঘদিন অনাদায়ী অবস্থায় পড়ে থাকায় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৮৫ লাখ ৮১ হাজার ৩০৭ টাকা। বিভিন্ন অগ্রিম দীর্ঘদিন অনাদায়ী অবস্থায় পড়ে থাকায় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৫৫ লাখ ১ হাজার ৮১৪ টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত করিম জুট মিলস লিমিটেডেও ২ কোটি ৮১ লাখ ২ হাজার ৭৯৮ টাকার আর্থিক ক্ষতি পেয়েছে বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তর। তাদের তিনটি পুকুর বা জলাশয় লিজ দিয়ে ভ্যাট না কাটায় সরকারের ক্ষতি ৩ লাখ ৬০ হাজার ১৫০ টাকা। কলতাপাড়া পাট ক্রয়কেন্দ্রের কেনা পাটের পরিমাণের চেয়ে কম পরিমাণ পাট মিলে গ্রহণ করায় হিসাবের গরমিল ৯৭ লাখ ৫৩ হাজার ৬১৫ টাকা।

এছাড়া প্রাপ্যর অতিরিক্ত হারে বেলিং হুপস ও বেলিং বাকেলস খরচ করায় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৭৩ হাজার ৪৩২ টাকা। সরবরাহকারী ও বিবিধ বিল থেকে কেটে নেওয়া উৎসে আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা না করায় রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ২৭ লাখ ৮৮ হাজার ৫ টাকা।

অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত হারে অধিকাল ভাতা দেওয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৩৯ লাখ ৮ হাজার ২৭ টাকা। এ ছাড়া শ্রমিক হাজিরায় অনুমোদনহীন কর্মচারী নিয়োজিত করায় নিরীক্ষা বর্ষেই প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ ১৯ হাজার ৫৬৯ টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত স্টার জুট মিলস লিমিটেডে আর্থিক ক্ষতি পাওয়া গেছে ৭ কোটি ৭৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪০ টাকার। চালু তাঁতে অনুমোদিত লোকবল অপেক্ষা অনিয়মিতভাবে মোট ৬ হাজার ২০৮ জন অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ এবং মজুরি দেওয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৪ কোটি ৪৮ লাখ ৫২ হাজার ৮০০ টাকা।

বিভিন্ন সরবরাহকারীর বিল ও বিবিধ থেকে কেটে রাখা আয়কর ও ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ৪৮ লাখ ৩৬ হাজার ৮২৫ টাকা। আর বাজেট বরাদ্দ না থাকা সত্ত্বেও মিলের শ্রমিকদের অধিকার ভাতা স্বাভাবিক হাজিরা হিসেবে দেওয়ায় মিলের ক্ষতি হয়েছে ৪৮ লাখ ৫২ হাজার ৮৩৫ টাকা। বিপুল অঙ্কের ব্যাংক ঋণে পরিচালিত মিলের অর্থ থেকে পর্যাপ্ত অগ্রিম দেওয়ার পর দীর্ঘদিনেও সমন্বয় না করায় সুদসহ আদায়যোগ্য টাকার পরিমাণ ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৬ হাজার ৫৮০ টাকা।

অনিয়মের তালিকায় রয়েছে হাফিজ জুট মিলের নামও। তাদের ১ কোটি ১৮ লাখ ২৬ হাজার ২০৬ টাকার আর্থিক ক্ষতি পেয়েছে বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তর। এই পাটকলটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা লঙ্ঘন করে বছরের পর বছর কেটে নেওয়া ভ্যাট, উৎসে আয়কর ও রেভেনিউ স্ট্যাম্প বাবদ প্রাপ্ত সরকারি রাজস্ব কোষাগারে জমা না করায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৬ লাখ ২৩ হাজার ৪৩ টাকা।

আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও বিজেএমসির পাটক্রয় নির্দেশনা পালনে ব্যর্থতায় খানখানাপুর পাটক্রয় কেন্দ্রে পাটের মানজনিত ও পরিমাণজনিত আর্থিক ক্ষতির জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় দুই কর্মকর্তা শংকর চন্দ্র সরকার ও সহকারী পাটক্রয় কর্মকর্তার কাছে পাওনা ১২ লাখ ৩ হাজার ১৬১ টাকা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads