বাংলাদেশে এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা হবে না। নিরলস কাজ করে দেশে কৃষি বিপ্লব সাধন করুন কথাটি বলেছেন ইতিহাসের মহানায়ক বাঙালির রাখাল রাজা, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচনসহ সব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। এর মধ্যে তিনি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কৃষি ও শিল্পকে। কৃষি ও শিল্প বিপ্লব ঘটাতে নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের মুক্তির পথপ্রদর্শক। দেশকে এগিয়ে নেয়ার অগ্রনায়ক। তিনি বাঙালি আধুনিক পরিচয়কে বহুমাত্রিক পূর্ণতা নিয়েছেন। তার শোষণহীন সমাজ গঠনের স্বপ্নের জমিনের বড় অংশই জুড়ে ছিল বাংলাদেশের কৃষক। কৃষকদের চাওয়া-পাওয়াকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। স্বাধীনতার পরই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিরলস প্রচেষ্টায় এ দেশে সবুজ বিপ্লবের সূচনা হয়। বঙ্গবন্ধু ছিলেন কৃষি ও কৃষকের অতিপ্রিয় একজন মানুষ, আপনজন। ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদের প্রথম সভায় নিলেন কৃষকদের জনা যুগান্তকারী এক সিদ্ধান্ত। তাদের সমস্ত বকেয়া খাজনা ও সুদ তিনি মওকুফ করে দিলেন। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমি খাজনা চিরতরে মওকুফ করার ঘোষণা দিলেন। সীমাহীন বাধা উপেক্ষা করে জাতির পিতার নির্দেশে তৎকালীন বঙ্গবন্ধুর সরকার পূর্ব জার্মানি থেকে বিমানে করে ৩৮ হাজার সেচ যন্ত্র এবং ফিলিপাইন থেকে আইআর-৮ জাতের ধানের উন্নত বীজ আমদানি করে বিনামূল্যে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করে সাড়া ফেলেছিলেন। সে সময় তিনি কয়েক লাখ কৃষিঋণের সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার, ভূমিহীন কৃষকদের মাঝে খাসজমি বিতরণ এবং চাষিদের জন্য সহজ শর্তে কৃষিঋণ দানের ব্যবস্থা করেছিলেন, যা ছিল সে সময়কার যুগান্তকারী সাহসী পদক্ষেপ। তিনি কৃষি বিপ্লবের লক্ষ্যে একটি যুগোপযোগী ভূমি সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ণের লক্ষ্যে দেশের স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদদের নিয়ে গঠন করলেন প্রথম পরিকল্পনা কমিশন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি হলেন কমিশনের চেয়ারম্যান। সঠিক ও সময়োপযোগী পরিকল্পনা প্রণয়নের তাগিদে তার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চিন্তা থেকে তিনি গঠন করলেন সেন্সাস কমিশন। কৃষি ও কৃষকদের ভালোবেসে তাদের প্রয়োজনের তাগিদে গঙ্গার পানি বণ্টন সমস্যা নিয়ে ভারতের সঙ্গে দেন-দরবার করে তিনি ন্যায্য সমাধান করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দিল্লিতে বৈঠক করে তিনি ফারাক্কা সমস্যার আশু সমাধানের জন্য জোর চাপ দেন। যার প্রেক্ষিতে সেদিন ভারত বাংলাদেশকে শুষ্ক মৌসুমে ৪৪ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি দেওয়ার নিশ্চয়তাসহ চুক্তিতে সই করে ছিল এবং সে অনুযায়ী বাংলাদেশ ন্যায্য পানি পেয়েছিল।
এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে এলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের মহান স্থপতির এই উজ্জ্বল উপস্থিতি সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার চিত্তকে এক অপার আনন্দের বন্যায় ভরিয়ে দিয়েছিল। ওইদিন সংবর্ধনা সভায় বক্তব্য দানকালে তিনি দেশের কৃষি ব্যবস্থায় গতিময়তা সংস্কারের লক্ষ্যে কৃষিবিদদের পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধির ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রদান করেন। এর ফলে কৃষিবিদরা লাভ করেন সরকারি চাকরিতে গৌরবের প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক গৃহীত এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপের ফলেই দেশের সার্বিক কৃষি উৎপাদনসহ কৃষি শিক্ষা ও গবেষণায় ব্যাপক গতিশীলতা সঞ্চারিত হয়। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জাতির পিতার সেই ঐতিহাসিক পদচারণা, কৃষিকে নিয়ে তার জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য নিঃসন্দেহে কৃষি ও কৃষকদের প্রতি তার সীমাহীন ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। বঙ্গবন্ধু সেদিন ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে সহজ সরল ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন তার ঐতিহাসিক অভিব্যক্তি। তিনি বলেছিলেন, এদেশের ৯০ জন কৃষক গ্রামে বাস করে। আমাদের গ্রামের দিকে যেতে হবে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা শিক্ষিত হচ্ছেন আপনাদের সেদিকে বেশি নজর দিতে হবে। এখন ভুলে যান শহরমুখী রাজনীতির কথা। আমরা এখন গ্রামের দিকে যাচ্ছি, তখন আপনাদের দাম অনেক বেড়ে যাবে। শহরের ভদ্রলোকদের দেখে আপনাদের চিন্তার কোনো কারণ নেই, কারণ আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির দিকে যেতে হবে। কৃষককে বাঁচাতে হবে। উৎপাদন করতে হবে। তা না হলে বাংলাকে বাঁচাতে পারবেন না।
তিনি ডাক দিলেন, তিনি বললেন- কৃষি উন্নয়নের জন্য তোমরা গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়। বস্তুত তিনি গ্রামকেই উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে দেখে কৃষকদের সংগঠিত করতে চেয়েছিলেন তার সবুজ বিপ্লবের কর্মসূচিতে। বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে সেদিন আরো বলেছিলেন খাদ্য শুধু চাল-আটা নয়- মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, তরকারিও আছে। কৃষিতে এনিমেল হাজবেন্ড্রি বলেন, পোলট্রি বলেন, সবদিকে নজর দিতে হবে। পরিকল্পনা মাফিক আমাদের কাজ করতে হবে।
যেভাবে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন, তাতে বিস্মিত হয়েছিল সারা বিশ্ব। তার ৭ মার্চের ভাষণ যে শুনেছে, তারই শরীরে বয়ে গেছে বিদ্যুৎপ্রবাহ। কী ছিল সে ভাষণে? কোনো অজ্ঞাত তথ্য নয়, কোনো অপ্রত্যাশিত ঘোষণা নয়, ভাষার কোনো কারুকার্য নয়, বলার কোনো পরিশীলিত ভঙ্গি নয়। তাতে ছিল এদেশের সর্বশ্রেণির মানুষের প্রাণের কথা। মানুষের সঙ্গে এই আন্তরিকতার বন্ধন গড়ে উঠেছিল বলেই তা শত্রুদেশে বন্দি থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে তার প্রেরণা ছিল সক্রিয়। স্বাধীনতা লাভের জন্য যেমন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিল সবাই, তেমনি প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল তার নেতৃত্বে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তোলার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন এদেশের মাটি ও মানুষকে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন এদেশের মানুষ মাটির মতোই, বর্ষায় হয় নরম আর চৈত্রে হয়ে ওঠে দারুণ কঠিন। যার প্রমাণ মিলেছে একাত্তরের রণাঙ্গনের দিনগুলোতে। বঙ্গবন্ধুর জাদুকরী অনুপ্রেরণা আর অসীম ভালোবাসা, মমতা ও ত্যাগ আমাদের বেঁধে রেখেছিল এক সূত্রে, এক জাতিতে; অন্যদিকে বিদেশি হানাদারদের প্রতিহত ও বিতাড়ন করার জন্য কঠিন অবস্থান থেকে সংগ্রাম করেছে। তাই এদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে ঐতিহাসিকভাবে সচেতন ও সংগ্রামী বলা যায়। এমন একজন নেতা এদেশে আর জন্মায়নি। তার মতো করে বাংলাকে আর ভালোবাসেনি কেউ; কেউ দেশের মানুষকে তার মতো করে আগলে রাখেনি। হাজারও সালাম এ নেতার প্রতি। তাই তো ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের উক্তিটি মনে পড়ে যায়। তিনি বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে দক্ষিণ এশিয়া অন্যরকম হতো।’ তিনি তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ‘আমি বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শন থেকে অনুপ্রাণিত হই, বাঙালি হিসেবে তাকে নিয়ে গর্ববোধ করি।’ আসলে নিজের জাতিসত্তা সম্পর্কে গর্ববোধ না থাকলে কোনো জাতি বড় হতে পারে না। সেটাই বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে আমার প্রথম শিক্ষা।’
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ আমাদের মাঝে নেই। আছে তার আদর্শ ও দিকনির্দেশনা। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে এই মূলমন্ত্রের প্রতি অবিচল থেকে বর্তমান সরকারের কৃষি উন্নয়নের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। দেশের কৃষি উন্নয়নে বর্তমান সরকারের গৃহীত নীতি ও পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই দেশবাসীর মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। একই ধারায় প্রীত হয়েছে নতুন কৃষিশিক্ষা ও গবেষণা নীতি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণের মাধ্যমেই আমাদের দায়িত্ব হবে দেশকে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করে তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা। তাহলেই তার আত্মা শান্তি পাবে। এটাই হবে ইতিহাসের এ মহান নেতার প্রতি আমাদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন।
অধ্যাপক ড. লুৎফুল হাসান
লেখক : উপাচার্য, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ





